মানবজাতির মানসিক বৈকল্যের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটে যুদ্ধের ভেতর দিয়ে। প্রাণীকুলের ভেতরে শুধু মানুষই গণহত্যা করতে সক্ষম। সেই হিসাবে মানুষের থেকে হিংস্র প্রতিশোধপরায়ণ অন্য কোনো প্রাণী নেই। যুদ্ধ মানুষের হিংস্রতার সর্বোচ্চ উপসর্গের প্রকাশ মাত্র, যেখানে একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে হত্যা করার বিদ্যা এবং পারদর্শিতা প্রদর্শন করে।
মানবতা এবং দানবতার হিসাব পৃথিবীতে সবসময়ই খুব স্বার্থকেন্দ্রিক। শাসক শ্রেণীর বিপক্ষে যখন শোষিত জনগণ রুখে দাঁড়ায়, তখন শাসক শ্রেণির কাছে সেটি হয়ে দাঁড়ায় সন্ত্রাস। আর যদি জয় লাভ করে, তা হয়ে ওঠে বিপ্লব, আর সেই সন্ত্রাসীরা হয়ে যায় বিপ্লবী।
হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধে কে মানব, আর কে দানব—তা নিয়েও পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত। পৃথিবীর এই বিভক্ত মানুষেরা কে সঠিক, কে বেঠিক—এই নিয়ে চলছে বাগ্যুদ্ধ। দুই বিপরীত চিন্তার মানুষ একই সাথে যৌক্তিকভাবে সঠিক হতে পারে না। সঠিকতা নির্ভর করে কার এখানে কী স্বার্থ রয়েছে, তার ওপর। স্বার্থ নির্ধারণ করে মানবিকতার সংজ্ঞা। এ কারণেই যখন দুটি দেশের যুদ্ধ হয়, দুই দেশের সৈন্যরাই দেশপ্রেমিক এবং বীর হিসেবে খেতাব পায়।
ফিলিস্তিন ছিল অটোম্যান সাম্রাজ্যের অংশ। মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা এ অঞ্চলে সব সময়ই পাশাপাশি সম্প্রীতির সাথে বসবাস করে এসেছে। কিন্তু অবস্থা বদলাতে থাকে যখন ইউরোপে ১৮৯৬ সালের দিকে থিওডর হারজেলের হাত ধরে ‘জায়নিজম’ নামে একটি আন্দোলনের জন্ম নেয়। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিন অঞ্চলে একটি স্বাধীন ইহুদি–রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই আন্দোলনের কারণে ইহুদিরা ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে আসতে শুরু করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতন হলে ফিলিস্তিন ব্রিটিশ শাসনের আওতায় চলে আসে। ১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজ ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমর্থন দেয়। ইহুদিরা এই সমর্থন পেয়ে আরও বেশি মাত্রায় ফিলিস্তিনে আসতে থাকলে মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে ব্রিটিশ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয় যে, ইহুদি ও মুসলিমদের দুটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। আর জেরুজালেমে শান্তি বজায় রাখার জন্য জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। প্রস্তাব মেনে নিয়ে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
জন্ম নেওয়ার সাথে সাথে ইসরায়েল অংশে বসবাস করা ৭ লাখ ৫০ হাজার মুসলিমকে জায়নবাদীরা জোর করে উচ্ছেদ করে। ফলে তারা ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থীতে পরিণত হয়। ইতিহাসের ভয়ংকর এই ঘটনা আল-নাকবা নামে পরিচিত। প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এই বর্বরতার প্রতিবাদ করলে ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধ লেগে যায়। প্রথম আরব-ইসরায়েল নামের এই যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হয়। যুদ্ধের পর ৭৮ শতাংশ ফিলিস্তিনি এলাকা ইসরায়েলের দখলে চলে আসে।
চলমান প্রচণ্ড বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার বাস্তবতায় পুনরায় ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়। ছয় দিনের সেই যুদ্ধেও ইসরায়েল জয়লাভ করে এবং ফিলিস্তিন পুরোটাই দখল করে নেয়। যুদ্ধের পর অধিকার রক্ষার শপথ নিয়ে জন্ম হয় পিএলও নামের প্রতিষ্ঠানটি। উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনকে মুক্ত করা।
পিএলও বারবার জাতিসংঘের দেশভাগ মেনে নিয়ে একটি রফা করার আহ্বান জানালেও ইসরায়েল তার আগ্রাসন চালিয়ে যেতে থাকে, এবং আরও বেশি করে জায়নবাদীরা এসে অধিকৃত ফিলিস্তিন অংশে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। বিশ্ব এই আগ্রাসনকে অবৈধ ঘোষণা করলেও সমস্যা সমাধানের জন্যে ফিলিস্তিনের পাশে কোনো বড় শক্তি দাঁড়ায়নি।
অন্যদিকে আমেরিকা এবং ব্রিটেন সরাসরি ইসরায়েলকে সমর্থন এবং শক্তি যুগিয়ে এসেছে। উন্নত বিশ্ব ইসরায়েলকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সকল সুবিধা দিয়েছে ও দিচ্ছে। এসব পেয়ে দেশটি একটি বেপরোয়া সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ এবং বিশ্বের তাবৎ মানুষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে। জাতিসংঘের প্রচেষ্টা অসহায় দর্শকের মিনমিনে কণ্ঠের কিছু বিবৃতিতে এসে সীমাবদ্ধ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আত্মরক্ষার সংকল্প নিয়ে হামাস নামের সংগঠনটির জন্ম হয়।
ফিলিস্তিনবাসীর শেষ আশ্রয়স্থল গাজা নিয়ে হামলা–পাল্টা হামলার জন্ম নিলে ১৯৯৩ সালে ফিলিস্তিন, আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রথম অসলো চুক্তি নামে একটি চুক্তি হয়। চুক্তিটি ফলপ্রসূ না হওয়ায় পরে আবার ১৯৯৬ সালে আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী গাজাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়—‘এ’, ‘বি’ এবং ‘সি’। বলা হলো এর মধ্যে ‘এ’ অঞ্চলে শুধু ফিলিস্তিনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ‘বি’ অঞ্চল থাকবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের যৌথ নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানায়। আর ‘সি’ অঞ্চলটি শুধু ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে। বাস্তবে দেখা গেল, ‘বি’ অঞ্চলে ফিলিস্তিনের হাতে শুধু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং ইসরায়েলের হাতে ছিল নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ। আবার ‘সি’ অঞ্চলটিতেই রয়েছে সব কৃষি ও সেচ ব্যবস্থা, খনিজ সম্পদ।
এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য বারবার ইসরায়েলের সাথে আলোচনা করা হলেও কোনো ফল মেলেনি। উপরন্তু ২০০০ সালে ইসরায়েল সেখানে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করতে শুরু করে। নির্মাণ করা হয় অনেক ওয়াচ টাওয়ার, আর বসানো হয় শক্তিশালী ‘গার্ড সিস্টেম’, যাতে ফিলিস্তিনিরা সেখানে দিয়ে চলাফেরা না করতে পারে। ২০১৭ সালে ইসরায়েল গাজাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। ওই সময়েই আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তারা। ঘটনা সেখানেই থেমে থাকেনি। বিভিন্ন সময় ইসরায়েল ফিলিস্তিনের ওপর, গাজার ওপর সামরিক হামলা করে যেতে থাকে। ২০০৮, ২০১২, ২০১৪ ও ২০২১ সালে ইসরায়েল গাজার ওপর ভয়ংকর সামরিক হামলা করেছে। শুধু ২০২২ সালেই প্রায় ২২০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে ৪৮ শিশুও রয়েছে। এ হামলা ২০২৩ সালেও জারি ছিল। তার ভেতরে সব থেকে ভয়াবহ আক্রমণ হয় জেনিনে।
দীর্ঘ শোষণ ও বঞ্চনায় ফিলিস্তিন যখন নির্মূল হয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে, তখন গত ৭ অক্টোবর হামাসের এই আক্রমণ পৃথিবীর তথাকথিত অনেক সভ্য দেশের কাছে একটি সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। হামাসকে মানবতার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বের ক্ষমতাধর, বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলো। তারা ইসরায়েলকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এসেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গাজার ছোট্ট একটি অঞ্চলে ইসরায়েল নির্বিচারে বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এবং হামাসকে একটি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করে চলেছে ফক্স নিউজের নিউজ প্রেজেন্টার, খবর উপস্থাপনের সময় কান্নায় ভেঙেও পড়ছেন। আমেরিকার বিভিন্ন মহল হামাসের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে শিউরে শিউরে উঠছে। তথাকথিত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন সভ্যতার ধ্বজাধারী এসব দেশের মানুষকে মানবিক ও ন্যায়পরায়ণ করতে পারেনি। এদিকে তাদের ভণ্ডামি ও কপটতায় বিশ্বের বিবেকবান মানুষেরা শিউরে উঠছে। প্রশ্ন উঠছে—এই ধরনের লোকদের হাতে বিশ্ব নেতৃত্ব কতটা নিরাপদ?
লেখক: মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক


ইসরায়েলের সামনে সমঝোতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই
ইসরায়েল–হামাস সংঘাতে টান পড়বে পকেট ও পেটে
