প্রায় এক দশক আগে, আমি একদল ভারতীয় এবং পাকিস্তানিদের সাথে ব্রাসেলস ও বার্লিনে গিয়েছিলাম ভাগ করে নেওয়া সার্বভৌম এলাকার বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)–এর প্রতিষ্ঠানগুলো দেখতে এবং জার্মানদের অভিজ্ঞতা শুনতে। বার্লিনে একটি মধ্যাহ্নভোজে, একজন জ্যেষ্ঠ জার্মান কর্মকর্তা শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বেশ পরিপাটি ও বুদ্ধিমানের মতো কথা বলেছিলেন।
ওই কর্মকর্তা বলেছিলেন, কয়েক দশক ধরে, এমনকি ১৮৭০–৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-জার্মান যুদ্ধের আগে, জার্মানি ও ফ্রান্সের প্রতিটি প্রজন্ম জানত যে তাদের পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। এবং তা করতেও হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তি চুক্তির মাধ্যমেই এর অবসান ঘটে। এই ইতিহাসের শিক্ষা থেকে তিনি বলেছিলেন, ভারতীয় ও পাকিস্তানিদের জন্য বলার মতো তাঁর কিছুই ছিল না। তবে তিনি আশা করেন, ভারতীয় ও পাকিস্তানিরা ইউরোপীয়দের চেয়ে চৌকস হবে এবং দ্রুত শান্তির পথ খুঁজে পাবে।
এর আরও কয়েক বছর পরে, আবার বার্লিনে, একজন ইসরায়েলি সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন যে কীভাবে তিনি ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের একটি গ্রুপে ছিলেন, যারা জেরুজালেমের জটিল সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিল। এটি সুশীল সমাজের একটা অংশ ছিল, যারা পর্দার আড়ালে আলোচনার অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর অংশ ছিল। ওই সাংবাদিক বলেছিলেন, এত গভীর মেরুকরণের মধ্যে এমন একটি অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর আলোচনায় ফলপ্রসূ কিছু হবে কিনা, তা নিয়ে তিনি খুব সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু তিন দিনের দীর্ঘ আলোচনার পর, তারা প্রস্তাব করেন, যা বেশ কার্যকর বলেই মনে হয়েছিল।
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং জিম্মি বিনিময়ের সাম্প্রতিক প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে আমি এই ঘটনার উল্লেখ করছি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু এমন কিছু বিষয় তুলে ধরছেন যাতে বেশিরভাগ ভাষ্যকার মনে করছেন, এই যুদ্ধের শেষ অনেক দূরে। এমনকি শান্তির কোনো সম্ভাবনা থাকলেও দুরস্ত। যদিও এই সত্য আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে শান্তি অধরা হওয়ার কারণ এই নয় যে এটি অসম্ভব।
শান্তি সব সময় সম্ভব। এমনকি সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলো সমাধান করা যেতে পারে। এখানে একমাত্র ও আসল প্রশ্ন হল যে প্রধান রাজনৈতিক নেতারা শান্তির দিকে কাজ করতে আসলে আন্তরিকভাবে কতটা ইচ্ছুক। একটি বাস্তবসম্মত, সম্মানজনক ও টেকসই শান্তির প্রয়োজনীয় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে তাঁরা ইচ্ছুক কিনা। তবে একবার এটি হয়ে গেলে, এমনকি সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোও পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়, মনে হয় যেন আদৌ কোনো কালো কোনো শত্রুতা ছিল না।
১৮৭০–-৭১ সালে ফ্রাঙ্কো-জার্মান যুদ্ধের প্রধান উপজীব্য ছিল আলসেস-লরেনের অঞ্চল নিয়ে বিরোধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এ বিরোধ অব্যাহত ছিল। আর এই বিরোধের জন্য জার্মানি ও ফ্রান্স অগণিত মানুষের জীবন শেষ করছে। বিশ্বকে নিয়ে গেছে যুদ্ধের প্রান্তে। এখন উভয় দেশের মধ্যে সীমানা এতই খোলামেলা যে, এটা কেউ বুঝতেই পারে না যে, এখানে কোনো সমস্যা ছিল।
মানুষ স্নায়ুযুদ্ধ, নাৎসি শাসনের উত্থান, পতন ও ভয়াবহতা এবং সেইসাথে দীর্ঘ শান্তির জন্য প্রেরণাদায়ক কারণ হিসেবে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞকে স্মরণ করিয়ে দেবে। আবার, এটিও সত্য যে, এমন কোনো কারণ ছিল না যে জার্মান ও ফরাসিরা এত কিছু ঘটনা ঘটার আগে এই বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করতে পারত না। এর জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল সাত দশক এবং লাখ লাখ প্রাণহানির জন্য। এক টুকরো জমির জন্য এত দীর্ঘ সময় নষ্ট করা এবং এত জীবনের অপব্যয় যুক্তি যুক্ত নয়।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিনে, সেইসাথে বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় যে-সব সংঘাতে চলছে, সেখানকার মানুষজন কী অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এটা এই কারণে ঘটছে যে, কিছু মানুষ বা পক্ষ এমন অপরাধ করে চলেছেন যা বলা যাচ্ছে না। আবার যা শান্তি প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে তুলেছে। এটি আরও যুদ্ধের, আরও দুর্দশার জন্য একটি অজুহাত মাত্র। আসলে এই অপরাধের কারণেই সাধারণ মানুষকে চড়া মূল্য দিতে হয়। তারা শুধু চায়, এ ধরনের বর্বরতা যেন আর কখনো না ঘটে।
যুদ্ধ কেউ বেছে নেয় এবং প্রায়ই একটি যুদ্ধ আরও যুদ্ধের দিকে মানুষকে ধাবিত করে। আসুন আমরা রাজনৈতিক নেতাদের অজুহাতগুলো খুঁজি, যা দেখিয়ে বা শুনিয়ে তারা দাবি করেন, শান্তি অসম্ভব। তাঁদের এ কথা কিন্তু একেবারেই ঠিক না।
ওমাইর আহমদ: ভারতীয় লেখক। লেখাটি ভারতীয় অনলাইন পোর্টাল দ্য ওয়্যারের সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।


বাইডেন কি নেতানিয়াহুকে সামলাতে পারবেন
ফিলিস্তিনে ইসরায়েল ও তার বন্ধুদের আসল উদ্দেশ্য
গাজা পরিস্থিতি নিয়ে ৫ প্রশ্ন
