বাইডেন কি নেতানিয়াহুকে সামলাতে পারবেন

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:০৬ পিএম

ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যেকার রক্তাক্ত সংঘাতের ছয় সপ্তাহ পর আমাকে বারবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কেন এখনো এতটা কট্টর ইসরায়েলপন্থী রয়েছেন। কেন তিনি নেতানিয়াহু সরকারকে সংযত করতে এবং গাজায় মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় আরও কিছু করছেন না?

ইসরায়েল ও আমেরিকা একই লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। লক্ষ্যটি হচ্ছে, গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দুঃখজনক, অমানবিক ও নির্বিচার সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে হামাসের সামরিক সংগঠনকে নির্মূল করা। ফিলিস্তিনিদের বিপুল সংখ্যক মৃত্যু এবং গাজায় মানবিক সাহায্য পৌঁছানো নিয়ে আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে মতভিন্নতা আছে। এখন এ প্রশ্ন উঠেছে, ইসরায়েলের এই অভিযান কবে শেষ হবে। এ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে উত্তেজনা অবশ্যই বাড়ছে।

তারপরেও দুজনে মুখে কুলুপ মেরে আছেন এই ভেবে যে, কখন এই খারাপ সময়টা পার হয়ে যাবে। প্রয়োজনে গত সপ্তাহের শেষে দিকে ওয়াশিংটন পোস্টে বাইডেনের লেখা নিবন্ধটি পড়ে নিতে পারেন। নিবন্ধটি পড়লে পরিস্কার বোঝা যায়, তিনি যুদ্ধের শুরু থেকে ইসরায়েলের পক্ষে কট্টর অবস্থান নিয়েছেন। সেই অবস্থানের পরিবর্তনেরও কোনো ইঙ্গিত তিনি তাঁর লেখায় দেননি। প্রকৃতপক্ষে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ব্যক্তিত্ব, রাজনীতি ও নীতির সঙ্গে এটি যায় না।

আসলে ইসরায়েল ও আমেরিকা দুটি খুব ভিন্ন সময়সূচী নিয়ে কাজ করছে, তাতে সন্দেহ নেই। এবং এই দুটি ঘড়ি ক্রমে বদলে যাচ্ছে। ইসরায়েল হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে এবং গাজায় হামাসের শাসন শেষ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই ঘোষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাদের কোনো তাড়াহুড়ো নেই বলে মনে হচ্ছে।

ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এখনো উত্তর গাজার অনেক জায়গায় হামাস যোদ্ধাদের মোকাবিলা করতে শুরু করেনি বা মাটির নিচের মাইলের পর মাইল সুড়ঙ্গের কাঠামো খুব একটা ভেঙে দেয়নি। এরপর আছে দক্ষিণ গাজা। সেখানে হামাস নিঃসন্দেহে তাদের সবকিছু সরিয়ে নিয়েছে। তারা আসলে শেষ হয়ে যাওয়ার মতো কোনো পর্যায়ে নেই। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এখন মাসের পর মাস ধরে এ নিয়ে প্রচারণার কথা বলেছেন।

আরও একটি বিষয় স্পষ্ট যে, আমেরিকার ঘড়িটি অনেক দ্রুত ছুটছে। তার ইউরোপীয় মিত্র, আরব সহযোগী এবং গভীরভাবে বিভক্ত ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে বাইডেনের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ বাড়ছে। সব চাপই বাড়ছে একটি যুদ্ধবিরতির আহ্বানের জন্য। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের নির্বিচার প্রাণহানির মুখে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার বিরোধিতা রয়েছে। এই ধরনের প্রাণহানি বিগত দশকগুলোতে নজিরবিহীন। প্রকৃতপক্ষে, বাইডেন নিজেই প্রায় নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পেরেছেন যে, তিনি ইসরায়েল সম্পর্কে যতটা চিন্তিত, গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ এবং ফিলিস্তিনিদের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ তাঁর আরও মনোযোগের দাবি রাখে।

প্রেসিডেন্ট থেকে ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তারা হাসপাতালসহ বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে কথা বলেছেন। তাঁরা গাজায় আরও মানবিক সহায়তার অনুমতি দেওয়ার জন্য ইসরায়েলকে চাপ দিচ্ছেন। গাজার ঘটনার পর দিন থেকে একটা সীমারেখা টেনে দিয়েছেন। বলেছেন, বেসামরিক লোকদের জোর করে বাস্তুচ্যুত করা যাবে না। গাজার আয়তন কমানো যাবে না। ইসরায়েল কোনোকিছু পুনর্দখল করতে পারবে না।

মানবিক কারণে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আনা প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিল আমেরিকা। তবে তারাই অবশেষে মানবিক বিরতির আহ্বান জানিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

চাপ থাকা সত্ত্বেও এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই যে. প্রেসিডেন্ট বাইডেন কোনো যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব সমর্থন করতে পারেন এবং গাজায় সামরিক অভিযান শেষ করার জন্য ইসরায়েলকে একটি সময়সীমা বেধে দেবেন। ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা তাঁর কথাগুলো আপাতত কার্যকর বলেই মনে হচ্ছে।

ইসরায়েল–হামাসের সংঘাত দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। ছবি: রয়টার্স
অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসরাইলকে সমর্থন অব্যাহত রাখতে ইচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে। আল-শিফা হাসপাতালে ইসরায়েলি সেনার অভিযান গাজার সবচেয়ে বড় একটি ঘটনা। মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলের এই দাবি সমর্থন করেছে যে হাসপাতাল কমপ্লেক্সটি হামাস সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছিল। যদিও এই দাবির সপক্ষে তেমন কোনো প্রমাণ তারা দিতে পারেনি।
আল-শিফা হাসপাতালে হামাসের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র রয়েছে কিনা তা নিয়ে উত্তর দিতে চাপাচাপি করা হলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ইসরায়েলের ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি; বরং হাসপাতালের একটি এমআরআই মেশিনের পিছনে অস্ত্র পাওয়া গেছে, এ নিয়ে নিজের আতঙ্কের কথা তুলে ধরেন।

বোঝাই যায়, বাইডেন কেন হতাশ হবেন? নেতানিয়াহু সরকার যাই করুক না কেন, তা নিয়ে তাঁর মাথাব্যাথা নেই। বরং তিনি এ ব্যাপারে অনেকটাই গা ছাড়া ভাব নিয়ে আছেন। অবস্থান তো বদলাতে পারে না। কারণ যুদ্ধকালীন কৌশল তো ইসরায়েলের প্রতি ভালবাসা থেকে উদ্ভূত। (যদিও এটা তাঁর সাবেক বস প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিপরীতে)।

এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও বাইডেনের প্রাথমিক ইচ্ছাই ছিল নেতানিয়াহুর সঙ্গে কোনো ধরনের ঝামেলায় না জড়ানো। বরং সম্ভাব্য জায়গাগুলো খুঁজে বের করা যেখানে কোথায় কোথায় ইসরায়েলকে সাহায্য করা যায়। বিশেষত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, পশ্চিম তীরের নাম ব্যতীত সব কিছুতে সংযুক্ত করার জন্য পরিকল্পনা নেতানিয়াহু করলেও সে ব্যাপারে কঠোর কোনো অবস্থান নিতে বাইডেন ইচ্ছুক ছিলেন না।

বাইডেন রাজনীতিতে নবিশ বলাটা অবিচারই হবে। তিনি জানেন, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এ নিয়ে বিভক্তি বাড়ছে। এখনো বড় সংখ্যায় তারা দৃঢ়ভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন করছে ঠিকই, তবে দলের প্রগতিশীলরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। একই সময়ে, বাইডেন রিপাবলিকানদেরও চাপে আছেন। তিনি যদি এখন ইসরায়েলকে চাপ দেন, তাহলে রিপাবলিকানরা তাঁকে হাতুড়ি পেটা করবে। এই পরিস্থিতিতে বাইডেন রিপাবলিকান ও মূলধারার ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনার কোনো সুযোগ খোলা রাখতে চান না।

যদিও মার্কিন প্রশাসন, ডেমোক্র্যাটদের একাংশ, আরব সহযোগী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে মানবিক যুদ্ধ বিরতির ধারণাটিকে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে, একটি সরাসরি যুদ্ধবিরতি স্পষ্টভাবে হামাসকে বিজয়ী করে তুলবে। এটি একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে একটি বড় ব্যবধান তৈরি করবে যেখানে সব জিম্মিকে দেশে ফিরিয়ে আনার বা গাজার মানবিক বিপর্যয়ের সমাধানের সম্ভাবনা নেই।

দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজায় আমেরিকা ও ইসরায়েলি ঘড়ি ভিন্ন পথে চলতে পারে। কারণ আমরিকা ইতিমধ্যে নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার বিপরীতে একটি দুই-রাষ্ট্রের সমাধান এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে গাজার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বাইডেন ওয়াশিংটন পোস্টে লিখেছেন, তিনি সহিংসতায় জড়িত চরমপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করতে প্রস্তুত। এটা একেবারেই অসম্ভব নয় যে, হঠাৎ কোনো এক সময়ে বাইডেন ফোন তুলে নেতানিয়াহুকে বলবেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে!’ কিন্তু গাজায় মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ ইতিমধ্যে যদি যথেষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে আরও কী পরিবর্তন করতে হবে তা কল্পনা করা কঠিন।

লেখক: মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর পিসের সিনিয়র ফেলো।

লেখাটি সিএনএন-এর সৌজন্যে এবং ঈষৎ সংক্ষেপিত

​সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক এবং পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও...
আরেকটি সাধারণ আশঙ্কা হলো–এআই দিয়ে তৈরি লেখা, ছবি ও কণ্ঠস্বর জনমত ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারকারী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এই উদ্বেগগুলো যৌক্তিক। তবুও এসব উদ্বেগ আদতে আরও অস্বস্তিকর ও মৌলিক...
একদিক থেকে দেখলে একে যুদ্ধ বলা যায় কি না, তা-ই প্রশ্নসাপেক্ষ। আক্রমণ যেখানে বলতে গেলে একপাক্ষিক, সে তো যুদ্ধের চেয়ে বরং নিপীড়িতের ওপর নিপীড়কের আগ্রাসনের সংজ্ঞায় পড়ে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের...
গাজা যুদ্ধের দুই বছর হতে চলল। জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সামনে রেখে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডার মতো জি৭ জোটভুক্ত তিন দেশ ও অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। এই ঘোষণা...
বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে এবার বড় রহস্যের জন্ম দিয়েছে লিওনেল মেসির দেওয়া একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। বিশ্বকাপের ফাইনালে মাঠে নামার আগে সতীর্থদের উদ্দেশে মেসির দেওয়া সেই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এখন সামাজিক...
ফেসবুকে এক নারীর সঙ্গে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিবৃতি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এতে দাবি করা হয়েছে, দলের পক্ষ থেকে প্রকৃত ঘটনা...
জীবনের কঠিন অধ্যায় পার করছেন প্রবীণ অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন। গুরুতর অসুস্থ তিনি। সম্প্রতি মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে তাঁর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। এরপর ক’দিন তাঁকে আইসিইউতেও থাকতে হয়। এখন কেমন আছেন, সেই...
নীলফামারীর তিস্তা পাড়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে কোটি টাকা মূল্যের তিনটি রেসকিউ বোট। বন্যা ও দুর্যোগে চরাঞ্চলে উদ্ধার কাজের জন্য কেনা নৌযানগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেহাল। স্থানীয়দের অভিযোগ,...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর