সম্প্রতি প্রখ্যাত তার্কিক উপস্থাপক মেহদি হাসানকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এমএসএনবিসি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। জানা যায়, তার মূল কারণ একটি অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর উপদেষ্টা মার্ক রেগেভ শিশু হত্যাকে হামাসের প্রোপাগান্ডা বলে চালিয়ে দিচ্ছিলেন, সে সময়ে তথ্য–উপাত্ত দিয়ে মেহেদি হাসান তাঁর মিথ্যাচার প্রমাণ করে দিয়েছেন। এই অপরাধে তাঁকে চাকরি থেকে অপসারণ করার পরে অনেকেই এমএসএনবিসির চরিত্র বুঝতে পারে এবং তাদের ফলো করা বন্ধ করে।
আমরা বাংলাদেশে অনেক সময় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক কথা বলি। আসলে ক্ষমতাধরদের স্বার্থহানী হলে কোনো সংবাদমাধ্যমই স্বাধীন নয়। তথাকথিত উন্নত বিশ্বের এই হলো চিত্র। বিশ্বে জায়নবাদীরা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা বিশ্ব সম্পদের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনী দিন দিন পরাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তাদের রয়েছে বিরাট দখল। এবারের হামাস-ইসরায়েল সংঘর্ষে বিশ্ববিবেক দেখতে পেল মানবতার ভিন্ন রূপ।
এবারের ইসরায়েল–হামস সংঘাতে অ্যান্টি–সেমেটিজম এবং অ্যান্টি–জায়নবাদী দুটি শব্দ নিয়ে বেশ চর্চা হচ্ছে। আমেরিকায় এ সম্পর্কে কিছু জরিপ হয়েছে। তাতে দেখা যায়, একটি বড় অংশের মানুষই এর পার্থক্য বোঝে না।
জায়নবাদীরা অ্যান্টি-জায়নিজম শব্দটি ব্যবহার করে না। তারা অ্যান্টি-সেমেটিজম বলতে পছন্দ করে। আর আমরা অনেকেই না জেনে-বুঝে তাদের এই অপপ্রচারে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে আসছি। বিশেষত মুসলিমদের একাংশের ঢালাও ইহুদিবিদ্বেষ জায়ানবাদীদের দারুন সুবিধা করে দিচ্ছে। এই আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের জানা দরকার জায়নবাদ ও সেমেটিজম—এর ভেতরে পার্থক্য ও সম্পর্ক কোথায়।
সহজ কথায় জায়নবাদ হলো—ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ইহুদিদের একাংশের একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী ধারণা। তারা ইসরায়েলকে ইহুদিদের জন্যে সৃষ্টিকর্তার নির্দেশিত স্থান বলে প্রচার করে। ১৯ শতকে এই স্থানের ওপরে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য থিওডর হারজেল একটি আন্দোলন শুরু করেন, যা জায়নবাদ নামে প্রচার ও প্রসার পায়। ‘Zion’ একটি হিব্রু শব্দ, যার অর্থ জেরুজালেম বা তার গিরিখাত, মরুভূমি, নগর ইত্যাদি।
এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নিয়ে বিশ্ববাসীর তেমন কোনো মাথাব্যথা ছিল না। বিশ্বের সকল ইহুদি এতে নৈতিক সমর্থনও দিয়েছিল। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন তারা অভিবাসী হয়ে ইসরায়েল আসে এবং সেখানে তাদের আশ্রয়দানকারী ফিলিস্তিনিদের নির্মমভাবে উৎখাত করতে শুরু করে। ইসরায়েলের বাইরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা অন্য ইহুদিদের বেশির ভাগই এই অন্যায় সমর্থন করেনি। এবারের ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধেও এই ইহুদিদের একটি বড় অংশ জায়নবাদীদের বিরোধিতা করেছে, এবং বিশ্বের তাবৎ রাষ্ট্র ও অন্যন্য ধর্মাবলম্বীদের তুলনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
জায়নবাদীরা বলে—জায়নবাদ বিরোধিতা মানেই হলো ইহুদিদের বিরোধিতা করা। কিন্তু এই ধারণার সাথে অন্য ইহুদিরা একমত নন। বরং তাঁরা মনে করেন—তাঁদের নাম ভাঙিয়ে জায়নবাদীরা এসব অন্যায়–অত্যাচার গ্রহণযোগ্য করতে চাইছে।
যখন ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ হয়, আর আমাদের অনেকেই জায়নবাদের বাংলা করি ইহুদিবাদ, তখন প্রকৃতপক্ষে আমরা জায়নবাদী শক্তিকেই সহায়তা করি। তারা ঠিক এই কথাটাই প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। অনেকে বিভিন্ন বক্তৃতায়, সভায়, আলোচনায় ঢালাওভাবে ইহুদিদের বিরুদ্ধের বিষোদ্গার করায় জায়নবাদিরা এর আড়ালে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। তারা আঙুল তুলে সারা বিশ্বকে দেখাতে পারছে—‘দেখ, এই হলো প্রমাণ’।
ইসলাম সম্পর্কে ইহুদিদের অনেক ভুল ধারণা ছিল। যেমন তারা মনে করত ইসলাম মূর্তি উপাসক। কিন্তু বিভিন্ন কারণে ইসলাম সম্পর্কে তাদের ভুল ধারণা কাটতে শুরু করেছে। তারা ইসলাম ও ইহুদি ধর্মের মিল খুঁজে পাচ্ছে। বুঝতে পারছে এই দুই ধর্ম আসলে সব থেকে কাছাকাছি। বরং সেই তুলনায় খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা অনেক আলাদা এবং নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যক্তি এবং মূর্তি উপাসক। এই উপলব্ধির ফলে তারা দিন দিন মুসলিমদের বিষয়ে সহনশীল ও মানবিক হয়ে উঠছে। শুনলে অবাক হতে হয় যে, অনেক ইসরায়েলি জায়নিজমকে সমর্থন করে না।
তাহলে প্রশ্ন আসে—অ্যান্টি-সেমেটিজম বলতে আসলে কী বোঝায়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-ধর্মীয়-রাজনৈতিক সংস্কারে প্রভাবিত হয়ে ইহুদিদের বিরুদ্ধে শুধু ইহুদি হওয়ার কারণে কেউ যখন জাতিগত বৈষম্য, বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করে, তখন তাকে অ্যান্টি-সেমেটিক বলা যায়। এই বৈষম্য জাতিগত, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক অথবা অন্য কোনো রূপে দেখা যেতে পারে। এর প্রকাশ হতে পারে আক্রমণাত্মক আচরণে বা কথায়, শারীরিক, মানসিক কিংবা বিদ্বেষমূলক প্রচারে। আরেকটি প্রকাশ ঘটে বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত ও কার্যকলাপের মাধ্যমে।
আমাদের বুঝতে হবে সকল মুসলিম যেমন আল কায়েদা বা আইএস নয়, তেমনি সকল ইহুদি জায়নবাদী নয়।
লেখক: মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ



