এখনো চলছে বসন্ত। চলছে ফাগুন মাস। এই সময় বেশ নাতিশীতোষ্ণ একটি আবহাওয়া থাকে আমাদের দেশে। না ঠান্ডা, না গরমের এই সময়টা শরীরের জন্য বেশ আরামদায়ক। আর এই সময়টাতেই শুরু হয়েছে রমজান মাস। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা স্বস্তিতে রোজা রাখার আশা করাই যেত। কিন্তু এক বাজারের আগুনেই সর্বসাধারণের পুড়ে কয়লা হওয়ার জোগাড়!
সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, রোজা শুরুর খবরেই নিত্যপণ্যের পুরো বাজার অস্থির হয়ে গেছে। লেবুর হালি কখনো কিনতে হচ্ছে ৮০ বা ১০০ টাকায়। আবার কখনো তরমুজের দাম বেড়ে আকাশ ছুঁতে চাইছে। রমজানের প্রথমদিনই লেবু, শশা, টমেটোর দাম লাফিয়ে বাড়ছে। শশার কেজি ছাড়িয়েছে ১০০ টাকা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে একদিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি শশার দাম ৪০ টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি চিচিঙ্গা ৮০ ও টমেটো ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচের কেজিও ৮০ টাকা। এ তো গেল শাকসবজির হিসাব। এদিকে কয়েক দিনের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। লেয়ার মুরগির দাম কেজিপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ৩২০ টাকা। আর তেল ও চিনির বাজার আগে থেকেই চড়া।
দাম কেন বাড়ছে? এই প্রশ্নটি স্বাভাবিক হলেও, এর উত্তর নয়। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ ঠিক থাকলেও আড়তে বেশি দামের কারণে বাড়তি দরে বিক্রি করছেন তাঁরা। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে যে, আড়তে এসে দাম বেড়ে যাচ্ছে। এরপর সেই বাড়তি দাম ছড়িয়ে পড়ছে পুরো দেশে। এ থেকে এই অভিযোগমূলক প্রশ্ন মনের ভেতরে দানা বাঁধতেই পারে যে—আড়তে কি তবে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে?
সমালোচকেরা বলছেন, রোজা সামনে রেখে অতি মুনাফার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে বাজারে। অভিযোগের আঙুল একতরফাভাবে উঠছে ব্যবসায়ীদের দিকেই। সেটি আপনি বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গেই কথা বলুন, আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম স্ক্রল করুন না কেন, ক্ষোভের একমুখী উদ্গীরণ টের পাবেনই।

কিন্তু কেন এভাবে কাঠগড়ায় উঠছে ব্যবসায়ীরা? শুধু কি ব্যবসায়ীরাই এ ক্ষেত্রে দায়ী? নাকি সাধারণ মানুষেরও কিছু দায় আছে?
বর্তমানে রোজা সামনে রেখে বাজারের যে হালচাল আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেখানে এক ধরনের শোষণমূলক কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয়। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, এটা অনেকটা সাধারণ মানুষের গলায় পা দিয়ে পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা বের করে নেওয়ার মতো। একে রাহাজানি বললেও অত্যুক্তি হয় না। ছিনতাই–রাহাজানি তো এভাবেই হয়। মার্কিন মুলুকের বিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির দর্শন বিভাগ সমাজে বিদ্যমান শোষণের এক ধরনের সংজ্ঞা দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, শোষণ প্রক্রিয়ার অর্থ হলো একজন ব্যক্তির কাছ থেকে অন্যায্যভাবে সুবিধা আদায় করে নেওয়া। অর্থাৎ, এক ব্যক্তির কিছু দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অন্য ব্যক্তি লাভবান হয়।
এ ক্ষেত্রে এই ধরনের যুক্তি দেওয়াই যায় যে, সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট–এর দর্শনকে মোক্ষ হিসেবে মেনে নেওয়া এই দুনিয়ায় কে অন্যের দুর্বলতাকে কাজে লাগায় না? হ্যাঁ, তা লাগায় বটে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা নৈতিকভাবে ভুলও হয়তো নয়। কিন্তু তাই বলে গলায় ছুরি ধরলে ভয় পাওয়া কোনো ব্যক্তিকে যদি ওইটি করেই আপনি তার পকেট খসিয়ে নেন, তবে সেটি নৈতিকভাবেও ভুল তো অবশ্যই। ধরুন, ১০ টাকা দামের একটি জিনিস না হলে আপনার বেঁচে থাকাটাই হয়তো কঠিন হয়ে পড়ে। এখন বিক্রেতা যদি আপনার সেই প্রয়োজনকে ছুরি বানিয়ে আপনারই গলায় ঠেকিয়ে বলে যে—‘কিনলে ৩০ টাকাই দিতে হইব’, তখন আপনার দুর্বলতাকে যেভাবে লাভের অঙ্ক বাড়ানোর কাজে লাগানো হয়, সেটি আসলে শোষণ।
এ দেশে নিত্যপণ্যের বাজারে এখন সেই শোষণমূলক কাঠামোই রাজ করছে। শৃঙ্খলা বলতে কিছু আর নেই। নইলে কথায় কথায় দাম বাড়ানো নিশ্চয়ই সম্ভব হতো না। আর রোজার মাস এলেই যখন এটি নিয়মিত করা হয়, তখন বুঝতে হবে নিয়তে আসলেই ঘাপলা আছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সংবাদমাধ্যমের খবরে উঠে আসা কিছু বিক্রেতার সরল স্বীকারোক্তিতেও। সম্প্রতি প্রকাশিত এমন একটি সংবাদে শোনা গেছে এমনই এক বক্তব্য। সংকট নেই, তবে কেন এত দাম লেবুর—প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে বিক্রেতার সাফ জবাব, ‘রোজায় সবাই চায় একটু বেশি মুনাফা করতে!’

এমন মনোভাবের প্রতিক্রিয়ায় সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা অভিযান চালাচ্ছে নিয়মিত। খেজুরের দাম বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। তেল–চিনির বাজারও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু অভিযান তো আর সার্বক্ষণিক চালানো সম্ভব নয়। এটা কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়, যদি না আমরা নিজেদের স্বভাব ঠিক করি!
এই স্বভাব প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে আজকের লেখার সমাপ্তি টানা যাক। প্রথম রোজার ঠিক আগের দিন সন্ধ্যার ঘটনা। মাত্রই তারাবিহ নামাজের মধ্য দিয়ে রোজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। প্রতিদিন বাস থেকে নেমে যে স্থান থেকে রিকশা নিয়ে বাসায় পৌঁছাতে হয়, বরাবরের মতো সেখানে যাওয়া হলো। রোজা শুরুর ঘোষণা তখনো মাথায় গমগম করছে। পথচলতি মানুষের হাবভাবেও তা স্পষ্ট। গর্জন শোনা যাচ্ছিল বাজারেও। ঠিক সেই সময়ই এক রিকশাচালক ভাইকে গন্তব্য বলে ভাড়া ঠিক করতে গিয়েই যেন বাজারের গর্জনের প্রতিধ্বনি শোনা গেল। সেদিন সকালেই যে দূরত্ব ৩০ টাকায় পাড়ি দিলাম, সেটি রোজা শুরুর ঘোষণাতেই হয়ে গেল ৫০। এবং একজনের দেখাদেখি আশপাশে থাকা সব রিকশাচালক ভাই–ই ৫০ টাকা চাইতে লাগলেন! কেউই নামতে রাজি না। মনে হলো, বাজারে গেলে নিয়মিত শোনা যায় সিন্ডিকেটের গল্প। এখানেই–বা বাদ যাবে কেন?
শেষে পদযুগলের ওপর ভরসা করেই নির্ধারিত দূরত্ব পাড়ি দিতে হয়েছিল সেদিন। না, বিষয়টি এমন না যে বাড়তি ২০ টাকা পকেটে ছিল না। ছিল। কিন্তু যেভাবে আমার হাঁটার কষ্টকে পুঁজি হিসেবে নিয়ে খানিকটা জোরের ওপর পকেট থেকে বাড়তি ২০ টাকা খসানোর দাবি তোলা হয়েছিল, তাতে নিজেকে ব্ল্যাকমেইলের শিকার বলে মনে হচ্ছিল বারবার। উপায় থাকতে কে আর সেই শিকার বনতে চায়, বলুন?

সমস্যা তাই আমাদের স্বভাবের অস্থিমজ্জায়। শোষণ আমাদের রক্তে। কখনো শোষিত হই, সুযোগ পেলে আবার শোষণ করতেও ছাড়ি না। সমাজের সর্বস্তরেই এই প্রবণতা আজ শিকড় ছড়িয়েছে। যতদিন এর পরিবর্তন না হবে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যে দেওয়া মূল্যছাড়ের গল্প আমাদের কাছে স্রেফ একটা ফেসবুক পোস্ট হয়েই থেকে যাবে। ওতে লাইক–কমেন্ট আসবে ঠিকই। কিন্তু আসবে না কেবল—‘বোধ’! সেটি আমরা আর চাই কিনা, তাও অবশ্য ভাবনার বিষয়।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


রোজার শুরুতেই অস্থির নিত্যপণ্যের বাজার
রোজায় সরবরাহ পর্যাপ্ত, তবুও পণ্যের দাম বাড়তি 
