আইএমএফ বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল তাদের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে ১১৫ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী বোর্ডের সভায় বিষয়টি অনুমোদন পেলেই তবে ঋণ পাবে বাংলাদেশ। অর্থাৎ, সদস্য দেশগুলো চাইলেই হবে না। তাকে যেমন আইএমএফের কঠোর শর্ত মানতে হবে, তেমনি প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড সভায় চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখা হবে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য এর মাধ্যমে কতটা পাকা হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিষয়টি এভাবেই চলছে। আর গলদটাও সেখানে। আসলে কি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইএমএফ ভালো আছে? নাকি পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষা করতে করতে সদস্য দেশগুলোর কাছে সংস্থাটি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে? লন্ডনভিত্তিক বহুল সমাদৃত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক-বিষয়ক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট তাদের সম্পাদকীয়তে লিখছে, আইএমএম আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছে। তাও জন্মের ৮০ বছর পর।
১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের ক্যারোল শহরের ব্রেটন উডস এলাকায় মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলে জন্ম হয়েছিল আইএমএফের। ওই বৈঠকে ৪৪টি সহযোগী দেশের ৭৩০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তালিকায় জার্মানি ও জাপান ছিল, যারা কিনা যুদ্ধে শত্রুপক্ষ হিসেবে ইউরোপ-আমেরিকা ও তাদের মিত্রদের সাথে সে সময় ভয়াবহ লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল।
এই বৈঠকে শুধু আইএমএফের জন্ম হয়নি। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিওর মতো সংগঠন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু দেখুন, বিশ্বব্যাংক পুরোপুরি আমেরিকার কবজায়। ডব্লিউটিও আমেরিকানদের অবহেলার কারণে অথর্ব হয়ে পড়েছে। আগামী বছর সংস্থাটি ৩০-এ পা দেবে। এর মোদ্দা কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা যে লিবারেল বা উদার বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বপ্ন সারা দুনিয়াকে দেখিয়েছিল, এসব সংগঠন ছিল তার রূপকার। সেই আমেরিকা এখন চীনের সস্তা পণ্যের কাছে ঘা খেয়ে আবার ন্যাশনালিস্টিক বা জাতীয়তাবাদী অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, এ ব্যাপারে বাইডেন বা ট্রাম্পের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যে সরবরাহ চেইন গত ৩০ বছর ধরে গড়ে উঠেছে তার আর প্রয়োজন নেই ওয়াশিংটনের কর্তাদের। ফলে এর সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।
ইকোনমিস্টের প্রশ্ন, নতুন একটি বৈশ্বিক আর্থিক ধারা তৈরি না করে আমেরিকানরা এসব করছে কেন? শুধু আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও নয়। জাতিসংঘ ও এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একেবারে খেলো করে ফেলছে তারা। কিছুদিন আগে মার্কিন সিনেটের রিপাবলিকান দলের নেতা মিচ ম্যাকওনেল চিঠি দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসকে হুমকি দিয়েছেন যে, কোনো ইসরায়েলি নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। কী বিস্ময়কর ব্যাপার! গাজায় সাত মাসে যাদের হামলায় ৩৫ হাজার মানুষ খুন হলো, তাদের বিরুদ্ধে এই আন্তর্জাতিক আদালত কিছু করতে পারবে না? হ্যাঁ, পারবে; ততটুকুই, যতটা মার্কিনিরা চাইবে। যেমনটা তাদের ইচ্ছায়, একই আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ঘুরছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
এর আগে জাতিসংঘের নিরাপত্তার পরিষদ ও সাধারণ সভায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস হলেও আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কারণে তা কখনো আশা জাগাতে পারেনি বিশ্ববাসীর মনে। অথচ গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে—এই মিথ্যা অভিযোগ এনে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস করিয়ে ইরাকের মতো একটা সমৃদ্ধ দেশ শুধু ধ্বংসই করা হয়নি, দশ লাখের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান এখন বিশ্বের সচেতন মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য ও অপ্রাসঙ্গিক। পশ্চিমা পুঁজির ধামাধারী ইকোনমিস্ট পর্যন্ত লিখতে বাধ্য হয়েছে, ‘এটা সত্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, তা আদপে হুবহু আমেরিকার আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও কৌশলগত স্বার্থের অনুকূলে।’
তবে ডলার যতই তেজিভাব ধরে রাখুক, আমেরিকা যে ক্রমে দুর্বল হচ্ছে, তা কেউই অস্বীকার করে না। এখানেই খেলাটা। পুরো বিষয়টি আর ওয়াশিংটনের হাতে নেই। এমনকি রাশিয়া বা চীনের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে তারা আর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, সারা বিশ্বই গভীরভাবে একটি পরিবর্তন দেখছে। আর সেটা হলো নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উত্থানের ইঙ্গিত। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার সাথে জড়িয়ে আছে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ক্রমপরিবর্তনশীল সামাজিক মূল্যবোধ। প্রথাগত অর্থনৈতিক কাঠামোগুলো আর কাজে আসছে না। কারণ, তারা এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে পারছে না। পারছেন না এই অর্থনীতির পরিচলনাকারী ব্যক্তিরাও।
এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি। ডিজিটাল বিপ্লব, ইন্টারনেটের অকল্পনীয় বিস্তার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অটোমেশন শিল্প ও শ্রমের বাজারকে নতুন আকার দিচ্ছে। এআই এবং মেশিন লার্নিং (এমএল) জটিল কাজগুলোকে শুধু সহজ করছে না, দক্ষতাকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। এতে কাজের বাজার ছোট হয়ে আসার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। এর সাথে খাপ খাওয়াতে হবে আগামীকে।
গিগ অর্থনীতির উত্থান, উবার, আপওয়ার্ক এবং এয়ারবিএনবি-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো কাজকে আরও নমনীয় ও সহজতর করেছে। প্রচলিত কাজের ধারার সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। (গিগ বা জিআইজি বলতে বোঝানো হয় গড ইজ গুড।) তদুপরি, ব্লকচেইন প্রযুক্তি এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলো প্রথাগত আর্থিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ডিজিটাল মুদ্রা আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠলে সব দেশকেই আর্থিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে।
নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উত্থানে ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপজুড়ে অবকাঠামো বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রভাব সম্প্রসারিত করার কৌশলের উদাহরণ একেবারে অনন্য। এসব উদ্যোগই চীনকে নতুন ব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রীয় খেলোয়াড় হিসেবে স্থান করে দিচ্ছে।
একই সাথে, আমেরিকা তার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কৌশল নতুন করে লিখতে চাইছে, যা অনেকটা জাতীয়তাবাদী ধাঁচের। ইউরোপ, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কী করবে, তা নিয়ে দোটানায় আছে। তারা আমেরিকাকেও ছাড়তে পারে না। আবার চীন-রাশিয়াকে ধরবে, সে সাহসও নেই। ফলে পশ্চিমা জগতে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি বিরাজমান।
ক্রমবর্ধমান সামাজিক মূল্যবোধও নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে চালিত করছে। টেকসই উন্নয়ন এবং করপোরেট জগতের সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি বাড়ছে। ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত, সামাজিক এবং সুশাসনের মানদণ্ডকে বেশি করে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই পরিবর্তন কোম্পানিগুলোকে আরও টেকসই নৈতিক অনুশীলনে বাধ্য করছে। এর পেছনে করোনা অতিমারির একটা বড় ভূমিকা আছে। সে সময় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের অসংবেদনশীল রূপ তাদের কর্মীরা প্রত্যক্ষ করেছে, যা একেবারেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। ফলে সংবেদনশীল ও ইতিবাচক অনেক মূল্যবোধ অর্থনীতির নতুন ধারাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে প্রভাবিত করবে।
নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি একদিকে যেমন সুযোগ, তেমনি অন্যদিকে চ্যালেঞ্জও বটে। একদিকে, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন অব্যাহত রাখা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করার কাজ চালিয়ে যেতে হবে। অন্যদিকে ভবিষ্যতের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতায় সমৃদ্ধ কর্মীবাহিনীকে গড়ে তুলতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন। ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা এবং বিভক্তি বাড়াতে পারে। হতে পারে নতুন জোট এবং অংশীদারত্বের সুযোগ। যেসব দেশ এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে এবং সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারবে, তারাই নতুন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মানচিত্রে ভালো অবস্থানে থাকবে।
সেজন্য একটাই প্রশ্ন, আমরা কি প্রস্তুত?
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



