এইট পাস জয়নালরা যেভাবে আমাদের অপারেশন করে

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:১৮ পিএম

তিনি ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছেন। সেই পড়াশোনা দিয়েই ঢাকায় রোগী দেখেন। কারণ, নিজের পরিচয় তিনি বানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। রাজধানীরই তিনটি হাসপাতালে বসেন তিনি। এভাবেই মাদারীপুরের এইট পাস জয়নাল ঢাকায় এসে বনে গেছেন অর্থোপেডিক সার্জন! আর এর মধ্য দিয়েই বেরিয়ে আসে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক করুণ চিত্র। যেখানে এইট পাস করেও রোগী দেখা যায়, ভুলভাল প্রেসক্রিপশনও দেওয়া যায় দিনের পর দিন।

মূল ঘটনাটি একটু বিস্তারিত জানা যাক। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্লাস এইট পাস মাদারীপুরের জয়নাল ঢাকায় এসে বড় চিকিৎসক হয়ে যান। চেম্বারে বসতেন রাজধানীর তিনটি হাসপাতালে। নিজের নাম বদলে বনে যান ডা. আরিফ হাসান। রোগী দেখতে থাকেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অর্থপেডিক সার্জন হিসেবে। অপারেশন প্রয়োজন আছে কি নেই, জানিয়ে দিচ্ছিলেন রোগীদের, দিতেন প্রেসক্রিপশনও। চিকিৎসক পরিচয়ে বিয়েও করেছেন পাঁচ বছর আগে। স্ত্রীও জানেন না তাঁর আসল নাম।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এনাম মেডিকেলের চিকিৎসক আরিফ হাসানের নাম ও বিএমডিসি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে ডাক্তার সেজেছিলেন জয়নাল। রাজধানীর মাতুয়াইলের ফেইথ হাসপাতালে রোগী দেখছিলেন তিনি। জয়নালের শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি ফেইথ হাসপাতাল। এই ভুয়া ডাক্তার দিয়েই তিন বছর ধরে রোগী দেখানো হচ্ছে সেখানে! পরে এই ভুয়া চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করে ডেমরা থানা পুলিশ।

বুঝুন অবস্থা! তাহলে প্রশ্ন ওঠে, গত তিন বছর রাজধানীর কত শত রোগী ওই তিন হাসপাতালে এইট পাস জয়নালের কাছ থেকে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন? তারা সবাই তো তাহলে ভুল চিকিৎসা পেয়েছেন। কত শত মানুষের জীবন নষ্ট করেছেন এই জয়নাল?

জয়নাল একজন প্রতারক। তিনি প্রতারণা করেই এতদিন চিকিৎসক সেজে মানুষকে প্রতারণা করে গেছেন। নিজে অর্থ কামিয়েছেন। যেসব হাসপাতালে সেবা দিয়েছেন, সেগুলোও কামিয়েছে। এভাবে পুরোপুরি ভাওতা দিয়ে একটা শ্রেণি সাধারণ মানুষের সাথে চিকিৎসা দেওয়ার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রতারণা করে নিজেদের পকেট ভারী করেছে। আর আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সেসব দেখেওনি? নাকি দেখেও দেখেনি?

এই দুই প্রশ্নই কিন্তু ওঠে। প্রথম প্রশ্নটি করার ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসার চেয়ে বিস্ময় বেশি প্রকাশিত হয়। আর দ্বিতীয়টিতে হয় সন্দেহের প্রকাশ। এমন সন্দেহ এমনি এমনি জন্মায় না। করোনা মহামারির সময় থেকেই আমরা স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন অনিয়মের উদাহরণ দেখে আসছি। ওই সব ঘটনায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি স্বাস্থ্যবিভাগ নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় ছিল। আর তার কারণেই ডালপালা মেলেছে অনিয়ম। অথচ সরকারি বিভাগগুলো আছেই এসব অনিয়ম ঠেকানোর নিমিত্তে। তাদের এই নিষ্ক্রিয়তা সাধারণত ইচ্ছাকৃত হয় এবং সেই ইচ্ছা তৈরি হয় অনৈতিক আর্থিক সুবিধা পাওয়াকে কেন্দ্র করেই। আর এভাবেই দুর্নীতির শিকড় বিস্তার লাভ করে।

কথা হলো, একজন এইট পাস লোক চিকিৎসক সেজে মানুষকে প্রতারিত করে যাচ্ছেন–এটি কেন তিন বছর ধরে চলতে পারল? বেসরকারি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষও কেন এটি ধরতে পারল না? কারণ, আমাদের সবারই ধান্দা হচ্ছে যেনতেন উপায়ে কেবলই নিজের পকেট ভারী করা। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও চিকিৎসকের যোগ্যতা‑সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষার প্রয়োজন বোধ করেনি। তারাও চেয়েছে যেকোনো একজন চিকিৎসককে সামনে রেখে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার নামে শুধুই ব্যবসা করতে। রোগীরা কী পেল, না পেল, প্রতারিত হলো কিনা–এসব তাদের কোনো লক্ষ্য‑উদ্দেশ্য নয়। ফলে একজন চিকিৎসক সেজে যখন সেই ব্যবসা করার উপলক্ষ তৈরি করে দিল, তাতেই নাচতে নাচতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মজে গেল। অর্থ উপার্জন–এই একটি সাধারণ উদ্দেশ্য পূরণ করাই যে ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য।

আর স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগের নিষ্ক্রিয়তা এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আরও সুযোগ করে দেয়। যাদের দেখার কথা, পরীক্ষা করার কথা, তারাই যখন চোখ বুজে থাকে, তখন তঞ্চকেরা যে বগল বাজাবে–সেটিই তো স্বাভাবিক! তাই এইট পাস জয়নালরা যখন আমাদের অপারেশন করে, উল্টোপাল্টা ওষুধের নিদান দেয়, তখন তারা এই প্রতারণা করে সমাজ ও দেশের একদল মানুষের (নাকি অমানুষ!) সম্মতি উৎপাদন করেই। এরা অন্যকে মেরেও নিজের পকেট ভরাতে চায় কেবল।

ভিডিও দেখুন:অথচ সঠিক ও উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। একটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্যই এই অধিকার প্রয়োজন। আর আমাদের দেশে সেই খাতই আছে এমন দুরবস্থায়, যেখানে এইট পাস জয়নালরা বছরের পর বছর রোগী দেখে যায়!

এ ধরনের অনিয়ম ঠেকানোর উপায় একটাই। সেটি হলো সরকারি উদ্যোগে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট নিয়ম ও আইনকানুনের সঠিক প্রয়োগ। উপযুক্ত পর্যবেক্ষণ ও নজরদারির মাধ্যমেই এসব দূর করা সম্ভব। কিন্তু সর্ষের মধ্যেই ভূত থাকলে, ভয় পাওয়াই যে একমাত্র ভবিতব্য!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক সকাল। বন্যপ্রাণী দেখার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম ঢাকার উত্তরা, দিয়াবাড়ি, গোড়ানচটবাড়ী, আফতাবনগর ও খিলখেত এলাকায়। গত এক দশক ধরে ঢাকার প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে আমার পরিচয়। এই শহরের...
​সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক এবং পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও...
ভারতে অধিকাংশ যন্ত্রপাতি ও পণ্য স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়, যেখানে ঢাকার এমআরটি প্রকল্পগুলোতে আন্তর্জাতিক মান পূরণকারী দেশ থেকে এসব উপকরণ আমদানি করা হয়। তাই এই ব্যয়ের তুলনা করলেই বাস্তব চিত্র...
ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের একটি বড় অংশের জয়ের বিপরীতে বিরোধী পক্ষগুলোর নানা অভিযোগ রয়েছে খোদ নির্বাচন নিয়েই। কিন্তু এসব অভিযোগের উল্টো দিকে যখন ভিপি-জিএস-এজিএস পদে বিজয়ীর...
সুফল পেয়ে ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাযুক্ত ক্যামেরা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। যান চলাচলের চারটি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দাবি করে, সড়কে আরও দুটি অপরাধ...
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুতায়িত হয়ে শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার বারঘোরিয়া-বাদুরতলায় এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
পার্লামেন্ট অভিমুখে ককরোচ জনতা পার্টি-সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে উত্তাল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে পুলিশ। দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন।
এক বছর আগে মাইলস্টোন স্কুলের যে ভবনটিতে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষন বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে সেই ভবনটির কিছু নির্মাণক্রুটি ছিল। আর পাইলটের উড্ডয়ন ত্রুটি ও তাঁর তদারকি কর্মকর্তার...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর