চীন‑মার্কিন দ্বন্দ্ব তবে বিরল খনিজ নিয়ে?

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৫, ০৫:২৪ পিএম

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে দীর্ঘদিন ধরে। বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক, ভূরাজনৈতিক–সবগুলো ক্ষেত্রেই এই দুই দেশ বৈশ্বিক নেতৃত্ব দখল ও রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত। দুই দেশের মধ্যে নানা সমীকরণ উপস্থিত। এই বহুমাত্রিক দ্বন্দ্বের অন্যতম বড় ক্ষেত্র বিরল খনিজের মালিকানা।

এই ধারাবাহিকের আগের দুই পর্বেই বলা হয়েছে যে, কেন বিরল খনিজ ভবিষ্যতের বিশ্বের জন্য এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য বলা যায়, বিশ্বে নিত্য ব্যবহার্য হয়ে ওঠা নানা প্রযুক্তি পণ্য তো বটেই, টেকসই জ্বালানি বা ইলেকট্রিক ভেহিকল, চিকিৎসা ও সামরিক সরঞ্জাম, এমনকি মহাকাশ গবেষণা-সম্পর্কিত প্রযুক্তি পর্যন্ত এই খনিজের ব্যবহার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই এই বিরল খনিজ এবং এর পরিসরকে আরও বাড়িয়ে ‘অতিজরুরি খনিজ’ বা ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেলস’‑এর মজুত প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখন পর্যন্ত দেশে দেশে থাকা বিরল খনিজের মজুতের যে হিসাব আমাদের সামনে আছে, তাতে এটা পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই বিশ্বের বাকি সব দেশ থেকেই চীন বহু এগিয়ে। চীনে বিরল খনিজের মজুত রয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্রাজিলে এ মজুতের পরিমাণ চীনের অর্ধেকের চেয়ে কম। আর তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সপ্তম।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিরল খনিজ থেকে চুম্বক তৈরিতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল চীন। ছবি: রয়টার্স   মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) দেওয়া তথ্যমতে, চীনে বিরল খনিজের মজুত আছে ৪ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন। উৎপাদনের বিচারেও দেশটি সবার ওপরে। ব্রাজিলে বিরল খনিজের মজুতের পরিমাণ ২ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। ভারতে বিরল খনিজের মজুতের পরিমাণ ৬৯ লাখ মেট্রিক টন। রাশিয়ায় এ মজুতের পরিমাণ ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। যদিও এর আগের তথ্যমতে, রাশিয়াতে এই মজুতের পরিমাণ ছিল ১ কোটি মেট্রিক টন। কিন্তু ২০২৪ সালে দেশটির সরকার ও দেশটিতে সক্রিয় বিভিন্ন কোম্পানি এই মজুতের পরিমাণ পুনঃনিরীক্ষা করে জানায়, এ মজুত ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজের মজুতের পরিমাণ ১৯ লাখ মেট্রিক টন বলে জানিয়েছে ইউএসজিএস। তবে দেশটি এ তুলনায় বেশ ভালোই উৎপাদন করে। অস্ট্রেলিয়ায় বিরল খনিজের মজুত আছে ৫৭ লাখ মেট্রিক টন, যা বিশ্বে চতুর্থ। ভিয়েতনামে বিরল খনিজের মজুত আছে ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। দেশটির উত্তর‑পশ্চিমাঞ্চলীয় চীন সীমান্তে এবং পূর্বের উপকূল অঞ্চলে একাধিক খনি আছে। তবে দেশটিতে ২ কোটি ২০ লাখ টনের মজুত আছে বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড পপুলেশন সার্ভে। যদিও এই মজুতের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক আছে। দেশটির মজুত এই মানের হলে তালিকায় দেশটির অবস্থান দ্বিতীয়তে উঠে আসবে। গ্রিনল্যান্ডে ১৫ লাখ মেট্রিক টন মজুত রয়েছে।

এবার আসা যাক উৎপাদনের হিসাবে। চীন ২০২৪ সালে দেশটি ২ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন বিরল খনিজ উৎপাদন করেছে। পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ আমদানিও করছে দেশটি। কার কাছ থেকে? এখানেই চলে আসে মিয়ানমার প্রসঙ্গটি। বিরল খনিজ উৎপাদনে দ্বিতীয় শীর্ষ দেশটি তার উৎপাদনের পুরোটাই রপ্তানি করে চীনে। ব্রাজিল উৎপাদনে পিছিয়ে থাকলেও ২০২৬ সাল নাগাদ দেশটির উৎপাদন বছরে ৫ হাজার মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে। ২০২৪ সালে ভারত ২ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন বিরল খনিজ উৎপাদন করেছে। গত বছর রাশিয়া আড়াই হাজার মেট্রিক টন বিরল খনিজ উৎপাদন করেছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ৪৫ হাজার মেট্রিক টন বিরল খনিজ উৎপাদন করেছে। উৎপাদনে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান চতুর্থ। গত বছর দেশটি ১৩ হাজার মেট্রিক টন বিরল খনিজ উৎপাদন করে। প্রতি বছর ভিয়েতনাম ৩০০ মেট্রিক টনের মতো বিরল খনিজ উৎপাদন করে। এদিকে ১৫ লাখ টনের মজুত থাকলেও গ্রিনল্যান্ড এখনো বিরল খনিজের উৎপাদনে যায়নি। তৎপরতা শুরু হয়েছে কেবল।

শীর্ষ এই আট দেশের বাইরে উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্য রয়েছে–তানজানিয়া ৮ লাখ ৯০ হাজার, কানাডা ৮ লাখ ৩০ হাজার ও দক্ষিণ আফ্রিকা ৭ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন।

ইউরোপের কোনো দেশে বিরল খনিজের কোনো মজুতের নিশ্চিত তথ্য হাতে নেই। তবে ২০২৩ সালে সুইডেনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি এলকেএবি জানায়, তারা দেশটিতে একটি বড় খনির হদিস পেয়েছে, যেখানে বিরল খনিজের মজুতের পরিমাণ ১০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডের ভূমির গঠনের কাছাকাছি হওয়ায় সুইডেনের পাশাপাশি নর্ডিক দেশগুলোতেও বিরল খনিজের মজুত আছে বলে মনে করা হয়।

ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে ন্যাটো জোটে এই নর্ডিক দেশগুলোকে যুক্ত করার প্রবণতার সঙ্গে এই মজুত বা তার সম্ভাবনার সম্পর্ক যে রয়েছে, তাতে কোনো সংশয় অন্তত নেই। কারণ, এই অঞ্চলগুলোর বাইরে ইউরোপে এই বিরল খনিজের মজুত সে অর্থে নেই। আর এই না থাকাটা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের শেষ ধাপে এসে গোটা অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পরিত্যায্য করে তুলেছে।

এবার একটু হিসাব কষা যাক। চীনের নেতৃত্বাধীন জোট ব্রিকসকে আমলে নিলে দেখা যায়, শীর্ষ আট দেশের তালিকাভুক্ত চার দেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকা মিলিয়ে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোতে বিরল খনিজের মজুত রয়েছে ৭ কোটি ৬৪ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদনের হিসাব করলে দেখা যায় এই জোটভুক্ত দেশগুলো মিলে উৎপাদন করে ২ লাখ ৮০ হাজার টনের বেশি। এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার মজুত ১ কোটি মেট্রিক টন ধরলে ব্রিকস জোটের সম্মিলিত সামর্থ্য আরও ৬২ লাখ মেট্রিক টন বেড়ে যাবে।

বিপরীতে ব্রিকসের প্রতিদ্বন্দ্বী জোট হিসেবে গত কয়েক বছরে আবির্ভূত হওয়া কোয়াড জোটকে আমলে নেওয়া যায়, যেখানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান। এর মধ্যে জাপানের মজুত বা উৎপাদন সম্পর্কিত কোনো তথ্য নেই। বাকি তিন দেশের সম্মিলিত উৎপাদন ৬০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। এর সাথে ভিয়েতনামকে জুড়ে দিলেও এ উৎপাদন সর্বোচ্চ ৬১ হাজার ২০০ মেট্রিক টনে পৌঁছায়।

আবার ভারত চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও জোট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রেরও প্রতিদ্বন্দ্বী। উভয় দিক থেকেই তাকে ছেঁটে ফেললে উৎপাদন বিচারে খুব বড় হেরফের হয় না। কিন্তু মজুত বিচারে বড় হেরফের হয়ে যায়। এ কারণে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা বিচারে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যাবতীয় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট সত্ত্বেও ভারতকে কাছছাড়া করতে চায় না। কারণ তার মজুত ৬৯ লাখ মেট্রিক টন। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে নিজের দিকে টানতে পারলে তার ১৯ লাখের মজুতের সাথে এই মজুত জুড়ে যাবে। সাথে অস্ট্রেলিয়া, গ্রিনল্যান্ড ও কানাডার হিসাব যুক্ত হলে চীনের সমান‑সমান না হলেও যুক্তরাষ্ট্র কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: রয়টার্সএদিকে আরও দুটি অঞ্চলের কথা বলতেই হয়। প্রথমটি অবশ্যই ইউক্রেন, যার সাথে এই খনিজ সম্পর্কিত একটি চুক্তি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে বেশ উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে এই কিছুদিন আগেই। দ্বিতীয় দেশটি হচ্ছে মিয়ানমার, যার মজুত সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া না গেলেও দেশটি উৎপাদন বিচারে চীনের পরই অবস্থান করছে। এই উৎপাদন আবার পুরোটাই যাচ্ছে চীনে।

খেয়াল করলেই দেখবেন যে, এই দুই দেশই কিন্তু সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একটি গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত এবং অন্যটি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। মিয়ানমার নিয়ে আলাদা করে কথা বলাটা জরুরি। এখানে শুধু এটুকু বলে রাখা যাক যে, মিয়ানমারের কাচিনসহ যেসব অঞ্চলে বিরল খনিজের খনি রয়েছে, তার নিয়ন্ত্রণ মিয়ানমার সেনাবাহিনী বা বিদ্রোহী যে গোষ্ঠীর হাতেই থাকুক না কেন, তারা আসলে চীনের নিয়ন্ত্রণে। স্যাটেলাইট ইমেজে এমনকি তাদের খনিগুলো থেকে চীনে খনিজ রপ্তানির রুটটিও দেখা যায়।

ইউক্রেনের ক্ষেত্রে বিরল খনিজের মজুতের পরিমাণ একইভাবে জানা যায় না। তবে দেশটিতে লিথিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ বহু খনিজের খনি রয়েছে। দেশটির বিরল খনিজের খনিগুলো যেসব অঞ্চলে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, তার একটি বড় অংশই এখন রাশিয়ার দখলে।

এমনিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চিহ্নিত ৩৪টি ক্রিটিক্যাল মিনারেলসের মধ্যে ইউক্রেনে ২২টিই রয়েছে। এর মধ্যে বিরল খনিজের খনি কতটি, সে সম্পর্কে জানা না গেলেও এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য অঞ্চল হিসেবে যে কয়েকটি চিহ্নিত, তার প্রায় সবকটিই রাশিয়ার দখলে রয়েছে। আর এই দখল হয়েছে ২০২২ সালে চালানো সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে। বাকি যে অংশ থাকছে, তাতে ভাগ বসাচ্ছে আবার যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির চুক্তির মূল কথাই হচ্ছে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সহায়তা ও নিরাপত্তা সহায়তার জন্য দেওয়া আর্থিক সাহায্যের বিনিময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ৫০ শতাংশ ওয়াশিংটনের পকেটে ঢুকবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সইউক্রেনে থাকা ক্রিটিক্যাল মিনারেলসের মজুত কেমন? বিশ্বের মোট মজুতের ৫ শতাংশ। ছোটখাটো নয় কিন্তু। এর মধ্যে টাইটেনিয়াম, জিরকোনিয়াম, গ্রাফাইট ও লিথিয়াম উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে ইউরোপের সবচেয়ে বড় লিথিয়ামের মজুত রয়েছে দেশটিতে।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের (সিআইআরএসডি) তথ্যমতে, এই খনিজের একটা বড় অংশই রয়েছে লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, জাপরোঝিয়া, নিত্রোপেত্রোভস্ক, করভোরাদ, পলটোভা ও খারকিভে। বিবিসির প্রতিবেদনে আবার ক্রিমিয়ার কথাও বলা হয়েছে। কিছু কিছু নাম চেনা লাগছে নিশ্চয়? হ্যাঁ, এই অঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, জাপরোঝিয়া, খারকিভ ও ক্রিমিয়ার ৭০ থেকে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ এখন রাশিয়ার হাতে।

ফলে এসব যুদ্ধবিগ্রহের সঙ্গে ন্যাটো জোটের সম্প্রসারণ যেমন রয়েছে, তেমনি এসব প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানার জটিল হিসাব‑নিকাশও রয়েছে। ঠিক যেমন মিয়ানমারে বহুজাতিক প্রণোদনায় চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে এ হিসাব রয়েছে। একটা ইঙ্গিত এখানে দিয়ে রাখা যেতে পারে যে, ভারতে থাকা বিরল খনিজের মোট মজুতের ৩৫ শতাংশের উপস্থিতি পাওয়া গেছে সমুদ্র সৈকতের বালুতে। ফলে সমরূপ ভূ‑গঠনের হওয়ার কারণে নর্ডিক দেশগুলোকে যেমন এ মজুতের সম্ভাবনা বিবেচনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তেমনি এই অঞ্চলের মিয়ানমার এমনকি বাংলাদেশকেও একই বিবেচনায় গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।

বলে রাখা ভালো যে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের দুই বিজ্ঞানী সেলিনা ইয়াসমিন ও এম এম মাহফুজ সিরাজের করা গবেষণায় দেখা গেছে, কক্সবাজারের ইনানি, হিমছড়িসহ বেশ কয়েকটি সৈকত ও তার সংলগ্ন এলাকায় উচ্চ মাত্রার খনিজের উপস্থিতি রয়েছে। ভূগঠন বিবেচনায় নিলে মিয়ানমারের রাখাইনকে ঠিক বাদের খাতায় রাখা যায় কি? এ প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীরা দিতে পারবেন হয়তো। হয়তো তখন আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব যে, রাখাইন এতদিন ধরে উত্তাল থাকার পেছনের কারণটি আসলে কী? কেনই‑বা অঞ্চলটি থেকে রোহিঙ্গা অধিবাসীদের তাড়িয়ে তা ফাঁকা করার চেষ্টা করা হলো? শুধু কি ধর্ম বা জাতিগত সংঘাত, শুধু কি ভূ‑রাজনৈতিক অবস্থানগত গুরুত্ব, নাকি বিরল বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের উপস্থিতি?

বিরল খনিজ ইস্যুতে চীন এ বিষয়ে অনেক আগে থেকেই সতর্ক। ১৯৮৭ সালে চীনের তৎকালীন নেতা দেং শিয়াও পিং বলেছিলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের আছে জ্বালানি তেল। চীনের আছে বিরল খনিজ।’ যুক্তরাষ্ট্রসহ বাকি বিশ্ব সতর্ক হলেও মজুত কম থাকায় করার তেমন কিছু ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের এ সম্পর্কিত প্রযুক্তির উন্নয়ন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এ বাবদে চীনের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল বললেও কম বলা হবে।

প্রতীকী ছবি। রয়টার্স থেকে নেওয়াএই নির্ভরতাই কমাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। আর এ কারণে গ্রিনল্যান্ড, মিয়ানমার, অস্ট্রেলিয়া, ইউক্রেন, রাশিয়া, ভারত ইত্যাদি নানা দেশে সে নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে নানা তৎপরতা চালাচ্ছে। ‘নয়া বিশ্ব’ শীর্ষক ধারাবাহিকে সভ্যতাকেন্দ্রিক নয়া সংকটের কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি মুদ্রা রাজনীতিসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই যে মুদ্রা, এর শক্তিটি মূলত নির্ভর করে অর্থনৈতিক শক্তির ওপর। আর এই অর্থনৈতিক শক্তিটি আসে জ্বালানি থেকে। ফলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জ্বালানি নিয়ে দ্বৈরথ চলছে।

রুশ‑ইউক্রেন যুদ্ধের ‘গ্রহণযোগ্য মীমাংসা’ করার চেষ্টা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদি রাশিয়ার সঙ্গে বিরল খনিজ নিয়ে বড় চুক্তিতে পৌঁছায় ওয়াশিংটন, তবে রাশিয়ার অধিকৃত ইউক্রেনের অঞ্চল রাশিয়ার হাতেই থাকবে। আর যদি তার চেয়ে ভালো চুক্তি ইউক্রেন করে, তবে সীমানা‑বিবাদ এখানেই থামবে না।

ছোট শক্তির দেশগুলো কিন্তু এই বিরল খনিজ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ (ক্রিটিক্যাল) খনিজের মজুত ও উৎপাদনের ঘোষণা নিয়েও বিপদে আছে। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের উদাহরণ সামনে আনা যায়। প্রকাশিত হিসাবে তার অবস্থান সারির নিচের দিকে হলেও ইউএসজিএস ও ওয়ার্ল্ড পপুলেশন সার্ভের হিসাবমতে, দেশটিতে ২ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টনের মজুত রয়েছে। এ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিরল খনিজের উৎপাদন ২০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে ঘোষণা দিয়ে চাকরি খুইয়েছেন এ সম্পর্কিত সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা। ফলে এ নিয়ে খর্বশক্তির দেশগুলো এক ধরনের লুকোছাপা করে, কিছুটা নিজের স্বার্থ বিচারে এবং সম্ভবত অনেকটাই মিত্র গোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা বিচারে।

বিরল খনিজের মজুত নিয়ে এক ধরনের অনিরাপত্তায় ভুগছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের বিপরীতে লড়তে তার এর মজুত যেমন দরকার, তেমনি দরকার এর উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনও। দুই ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে। এ কারণেই ২০২৫ সালে ক্ষমতায় বসতে না বসতেই ডেনমার্কের আওতাধীন স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। যদিও ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড উভয়ের পক্ষ থেকেই এ প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নাছোড়বান্দা। না হওয়ার কোনো কারণও নেই।

একটা হিসাবের দিকে তাকানো যাক। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মুকুটের অন্যতম মণিটি হলো এফ‑৩৫ যুদ্ধবিমান, যা দেশটির ১৪টি মিত্র দেশের সমরাস্ত্রের অন্যতম শোভা। এই যুদ্ধবিমান তৈরিতে অন্তত ৯২০ পাউন্ড বিরল খনিজ লাগে। শঙ্কাটি কি বোঝা গেল? এই বিরল খনিজের প্রাপ্যতার ওপর শুধু বাণিজ্য নয়, সমরাস্ত্র থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুই নির্ভর করছে। ফলে চীন‑মার্কিন দ্বন্দ্বের নেপথ্য চালিকাশক্তির অন্যতম যে এই ১৭ মৌলের জোট বিরল খনিজ, তাতে আর সন্দেহ কী?

আগামীকাল পড়ুন: মিয়ানমারকে ধ্বংস করছে কি এই বিরল খনিজ?

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

চীনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ–সম্পৃক্ততা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সীমা ছাড়িয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সফর ছিল...
​সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক এবং পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও...
আমি বলছি না যে সাক্ষাৎকার নেওয়া সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমগুলো ঘুষ খেয়েছে। কিন্তু যে জনসংযোগ–লবিং প্রতিষ্ঠান এত নিখুঁতভাবে এই প্রচার অভিযান সাজিয়েছে, বর্ণনা নিয়ন্ত্রণ করেছে, তারা নিশ্চয়ই মোটা...
ভারতের সঙ্গে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগাভাগি এ অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ন্যায্য পানি–অধিকারের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপড়েন, ক্ষমতার অসমতা এবং...
রাজধানীর ভাটারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দ্রুতগামী অজ্ঞাত এক গাড়ির ধাক্কায় সেকান্দার আলী নামে এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
খাবার আর ওষুধসহ নানা খাতে ব্যয় বৃদ্ধিতে বিপাকে বগুড়ার মুরগির খামার ও হ্যাচারি ব্যবসায়ীরা। জেলার ৫ হাজারেরও বেশি খামার ও হ্যাচারি মধ্যে, গত ৩ বছরে বন্ধ হয়ে গেছে সাড়ে ৪ হাজার প্রতিষ্ঠান। এতে বেকার...
১১ কর্মকর্তার দায়িত্ব একজনের হাতে!
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। অফিসের করণিক,...
খাগড়াছড়িতে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলার এলজিইডি নিয়ন্ত্রণাধীন ২৮টি সড়কের ২১ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহালছড়ির মুবাছড়ি ও পানছড়ির নালকাটায়...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর