বিশ্বের সবচেয়ে দামি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অ্যাপল বর্তমানে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ ১৫ বছর সফলভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীর (সিইও) পদ ছাড়ছেন টিম কুক। সোমবার (২০ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেয় অ্যাপল। বিজ্ঞপ্তিতে টিম কুকের উত্তরসূরির নামও ঘোষণা করা হয়েছে।
অ্যাপল জানিয়েছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিষ্ঠানটির হাল ধরছেন জন টার্নাস, যিনি বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যের এই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্বে এমন পরিবর্তন কেবলমাত্র 'একের প্রস্থানে অন্যের আগমন নয়', বরং অ্যাপলের জন্য এটি হয়ে উঠতে পারে এক যুগসন্ধিক্ষণ। তাঁদের আগামীর পথচলা, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ সামগ্রিক ভবিষ্যতের জন্যই নির্ণায়ক হতে পারে এই পরিবর্তন।
জন টার্নাস: পর্দার পেছনের কারিগর থেকে অ্যাপলের শীর্ষ নেতৃত্বে
অ্যাপল সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন তাদের কাছে জন টার্নাস মোটেই অপরিচিত কেউ নন। তারা জানেন, অ্যাপলের ভেতরেই বেড়ে ওঠা এক পরীক্ষিত সৈনিক তিনি। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়া টার্নাস ২০০১ সালে অ্যাপলের প্রোডাক্ট ডিজাইন টিমে যোগ দেন—যে বছর তৎকালীন প্রধান নির্বাহী (সিইও) স্টিভ জবস প্রথম আইপড বাজারে আনেন।
এরপর গত ২৫ বছরে অ্যাপলের প্রায় প্রতিটি যুগান্তকারী পণ্যে তাঁর অবদান আছে। ২০১৩ সালে জন টার্নাস অ্যাপলের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। পরবর্তীতে ২০২১ সাল থেকে এই বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। মোটা দাগে অ্যাপলে তাঁর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান তিনটি:
অ্যাপলের নিজস্ব সিলিকন চিপ: ম্যাক কম্পিউটারে ইন্টেল চিপের পরিবর্তে অ্যাপলের নিজস্ব 'এম' সিরিজের সিলিকন চিপ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সফলভাবে পরিচালনা করেছেন জন টার্নাস।
আইফোন ও আইপ্যাড: আইফোন ১২ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক আইফোন ১৭ লাইনআপ (বিশেষ করে আইফোন এয়ার), এবং আইপ্যাড প্রো-এর হার্ডওয়্যার উন্নয়নের নেপথ্যেও তিনিই ছিলেন।
নতুন উদ্ভাবন: অ্যাপলের মিক্সড-রিয়েলিটি হেডসেট অ্যাপল ভিশন প্রো; আইফোন এয়ার- যেটি সবচেয়ে পাতলা (স্লিম) আইফোন হিসেবে পরিচিত; এবং এ বছর বাজারে আসা সাশ্রয়ী মূল্যের ম্যাকবুক নিও— এই সব নতুন প্রজন্মের অ্যাপল পণ্যে জন টার্নাস নিজের উদ্ভাবনী ও প্রকৌশলী সত্ত্বার স্পষ্ট ছাপ রেখেছেন।
স্টিভ জবস এবং টিম কুকের যোগ্য উত্তরসূরি?
জন টার্নাস এমন এক চেয়ারে বসতে যাচ্ছেন যেখানে তাঁর আগে বসেছিলেন স্টিভ জবস এবং টিম কুকের মতো প্রযুক্তি দুনিয়ার দুই কিংবদন্তি। তাঁদের উত্তরসূরি হওয়ার চ্যালেঞ্জ যে আকাশচুম্বী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
স্টিভ জবস ছিলেন উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার প্রতীক। তিনি প্রযুক্তি পণ্যকে মানুষের আবেগের জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আইপড থেকে শুরু করে আইফোন- এমন সব প্রযুক্তি পণ্য তিনি উপহার দিয়েছেন যেগুলো বাজারে নতুন মানদণ্ড (স্ট্যান্ডার্ড) তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, টিম কুক পরিচিত তাঁর ব্যবসায়িক ধীশক্তি ও ব্যবসা পরিচালনায় মুন্সিয়ানার জন্য। সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেন) থেকে শুরু করে বিক্রয় ব্যবস্থাপনা (সেলস ম্যানেজমেন্ট)- সবটাতেই তিনি সিদ্ধহস্ত। তিনি অ্যাপলকে একটি শক্তিশালী সাপ্লাই চেন ও পরিষেবা-নির্ভর ব্যবসায়িক মডেলে রূপান্তর করেছেন।
কুকের সময়ে অ্যাপলের বাজারমূল্য ২০১১ সালে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালে (এপ্রিলে) ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, ১৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য বেড়েছে ১১ গুণেরও বেশি। সার্বিক দিক বিবেচনায়, জবসের শক্তিমত্তা যেখানে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, কুকের ক্ষেত্রে সেটাই বাজার কৌশল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জন টার্নাসের নেতৃত্ব কেমন হবে? টার্নাস এখানে স্টিভ জবস ও টিম কুকের একটি যোগসূত্র হিসেবে কাজ করতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি কুকের মতো শান্ত ও সুশৃঙ্খল, আবার জবসের মতো পণ্যের গভীরে ডুব দিতেও পছন্দ করেন।
সার্বিকভাবে জন টার্নাস হয়তো এমন একজন নেতা হবেন, যিনি ‘স্ট্র্যাটেজিক ইঞ্জিনিয়ারিং’-কে গুরুত্ব দেবেন। টিম কুক যেখানে আইফোন বিক্রির পাশাপাশি অ্যাপল মিউজিক বা আইক্লাউডের মতো সার্ভিস বা সেবার মাধ্যমে আয় বাড়িয়েছেন, টার্নাস সেখানে হার্ডওয়্যার উদ্ভাবনকে আবারও সামনে নিয়ে আসতে পারেন। তিনি কেবলই একজন দক্ষ ম্যানেজার নন, একজন দক্ষ নির্মাতাও বটে।
তাই অনেকেরই ধারণা, কুকের ব্যবসায়িক বিচক্ষণতা এবং জবসের পণ্য-কেন্দ্রিক উদ্ভাবনের এক জটিল কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ রসায়ন তৈরিতে সমর্থ হবেন জন টার্নাস।
টার্নাসের নেতৃত্বে অ্যাপলে কেমন হবে এআই এবং আগামীর উদ্ভাবন
বর্তমানে অ্যাপলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রতিযোগিতায় তারা কতটা এগোবে, এবং সেটা কীভাবে?
টিম কুকের সময়ে এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অ্যাপল অনেকটাই রক্ষণশীল ছিল। বিশেষ করে আইফোন-আইপ্যাডের মতো জনপ্রিয় অ্যাপল পণ্যে বিভিন্ন এআই ফিচার অফার করার ক্ষেত্রে অ্যাপল মূলত গুগল বা ওপেনএআই-এর সাথে অংশীদারিত্বের ওপর-ই নির্ভর করে আসছিল। তবে টার্নাস দায়িত্ব নেওয়ার পর এই কৌশলে পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রথমত, টার্নাসের নেতৃত্বে অ্যাপল হার্ডওয়্যার-নির্ভর এআই'র দিকে ঝুঁকতে পারে। তিনি মনে করেন, এআই প্রযুক্তি কেবল সফটওয়্যারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বরং আইফোনে এবং ম্যাক কম্পিউটারে এমন চিপ বসাতে চান, যার কল্যাণে ইন্টারনেট ছাড়াই দ্রুততার সাথে গ্রাহক তার ইচ্ছেমতো (পার্সোনালাইজড) এআই সেবা পেয়ে যাবেন।
দ্বিতীয়ত, টার্নাসের অধীনে সিরি-চালিত স্মার্ট গ্লাস, ক্যামেরাযুক্ত এয়ারপড, কিংবা ফোল্ডেবল আইফোনের মতো উদ্ভাবনী সব পণ্য বাজারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে অ্যাপলপ্রেমীদের জন্য এআই অভিজ্ঞতা আরও সহজ হয়ে উঠবে।
আসন্ন চ্যালেঞ্জ ও টার্নাসের সক্ষমতা
তবে প্রধান নির্বাহী বা সিইও হিসেবে জন টার্নাসের পথচলা খুব বেশি মসৃণ না-ও হতে পারে। দায়িত্ব নিয়ে বেশ ক’টি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারেন তিনি।
অ্যাপল সিইও হিসেবে টার্নাসের প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে আইফোন-নির্ভরতা কমানো। এখনও অ্যাপলের মোট বার্ষিক আয়ের ৫০ শতাংশ আসে আইফোন থেকে। এক্ষেত্রে টার্নাসকে নতুন কোনো ‘হিট’ পণ্য (যেমন: অ্যাপল রিং বা পার্সোনাল রোবটিক্স) উপহার দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তাঁকে ভূ-রাজনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থাও সামাল দিতে জানতে হবে। বিশেষ করে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারতসহ অন্যান্য দেশে উৎপাদন বাড়ানো এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির সাথে খাপ খাইয়ে চলা, তাঁর জন্য বড় এক পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
তৃতীয়ত, আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখিও হতে পারেন তিনি, যেমনটা বেশ ক'বার হতে হয়েছে টিম কুককে এবং কুক সেগুলো বেশ সাফল্যের সাথেই সামলেছেন। অ্যাপল অ্যাপস্টোর নিয়ে ভারত এবং আমেরিকায় যে বিশাল আইনি জটিলতা ও জরিমানার হুমকি রয়েছে, তা সামলানোর চ্যালেঞ্জও নিতে হতে পারে এই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারকে।
এতসব চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও অ্যাপল সিলিকন প্রজেক্টের মতো জটিল কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করায় বিনিয়োগকারীরা তাকেই টিম কুকের পর ‘সবচেয়ে নিরাপদ এবং সেরা বাজি’ বলে মনে করছেন।
অ্যাপল ভক্তরা কী আশা করতে পারেন?
জন টার্নাসের অধীনে অ্যাপল ব্যবহারকারীরা আরও উদ্ভাবনী ও সাহসী হার্ডওয়্যার ডিজাইন আশা করতে পারেন। তাঁর নেতৃত্বে অ্যাপল পণ্যে কেবলমাত্র গতিই বাড়বে না, বরং এগুলো হবে আরও পাতলা, টেকসই এবং বুদ্ধিবৃত্তিক।
সার্বিকভাবে দেখলে, টিম কুক যখন এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে কূটনৈতিক দিকগুলো সামলাবেন, জন টার্নাস হয়তো তখন ল্যাবে মনোযোগ দেবেন—যাতে অ্যাপল আবারও তার ‘থিংক ডিফারেন্ট’ (ভিন্ন কিছু ভাবার) সত্তা নিয়ে বিশ্বকে চমকে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: অ্যাপল ডট কম, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান, টেকক্রাঞ্চ,



