সকালের শুরুটা কেমন হয়, বলুন তো? হয়তো রান্নাঘরে চা বানাচ্ছেন, কেউ ঘর ঝাড় দিচ্ছেন। কেউ আবার গুছিয়ে রাখছেন কাপড়। প্রতিদিনের কাজগুলোই যেন হয়ে উঠেছে দারুণ এবং দামি কনটেন্ট। আপনার এই প্রতিদিনের কাজের ভিডিওই এখন ব্যবহার করা হচ্ছে ভবিষ্যতের অ্যান্ড্রয়েড রোবটকে প্রশিক্ষণ দিতে। যে রোবট একদিন হয়তো বাড়িতেই কাজ করবে, আপনার জায়গায়।
এটি কোনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনির গল্প নয়, একদম বাস্তব। যেখানে মানুষ নিজেই নিজের বিকল্প তৈরি করছে। এই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এক অদ্ভুত ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি করেছে। যেখানে মানুষের দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজই হয়ে উঠছে রোবটের প্রশিক্ষণের উপকরণ।
আপনি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আপনি সবজি কাটছেন, বাসন মাজছেন, কাপড় ভাঁজ করছেন বা বাগানে পানি দিচ্ছেন। এসব সাধারণ কাজের ভিডিও করছেন কপালে বাঁধা একটা ক্যামেরা দিয়ে। শুধু একটা হেড স্ট্র্যাপ, স্মার্টফোন আর একটা টাস্ক লিস্ট, এটুকুই যথেষ্ট।
এই ভিডিওগুলোই একদিন তৈরি করবে মানুষের মতো দেখতে রোবট বা হিউম্যানয়েড রোবট। যারা ঘরে-বাইরে আপনার হয়ে সব কাজ করে দেবে। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিউম্যানয়েড রোবটকে প্রতিটি বাড়ি, দোকান ও অফিসে পাঠানোর স্বপ্ন এখন এক নতুন ধরনের চাকরির জন্ম দিয়েছে। এই চাকরির নাম হয়েছে ‘রোবোটিক্স জেনারেলিস্ট’।
ঘরের কাজই রোবটের ট্রেনিং ডেটা
হিউম্যানয়েড রোবট এখন হাঁটতে, নাচতে বা জটিল কাজ করতেও পারদর্শী হয়ে উঠছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘জেনারেল-পারপাস’ রোবট তৈরি করা। যে রোবট যেকোনো পরিবেশে নিরাপদে এবং কার্যকরভাবে মানুষের কাজ করে দিতে পারবে। এর জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ (ফাস্ট-পার্সন) ভিডিও ডেটা। যেটা হবে আপনার-আমার ঘরের কাজের সাধারণ ভিডিও।
এই ডেটা হলো মানুষের চোখের দৃষ্টিকোণ থেকে তোলা ভিডিও। যেখানে দেখা যায় হাত কীভাবে জিনিস ধরছে, শরীর কীভাবে ভারসাম্য রাখছে, পা কীভাবে চলছে এবং আশপাশের বাস্তব পরিবেশ কেমন। সাধারণ ইউটিউব ভিডিও (থার্ড-পার্সন) এর জন্য যথেষ্ট নয়।
মাইক্রো১ কোম্পানির রোবোটিক্স ডেটার ভাইস প্রেসিডেন্ট আরিয়ান সাদেঘি বলেন, ‘ম্যানুফ্যাকচারিং, ফ্যাক্টরি, ওয়্যারহাউজ, রিটেইল, নার্সিং হোম, হাসপাতাল প্রতিটি পরিবেশের জন্য এই ধরনের ডেটা দরকার। কারণ প্রতিটি জায়গায় মুভমেন্ট আলাদা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাদের বলি, ‘যদি তুমি চাও রোবট এই কাজটা তোমার হয়ে করুক, তাহলে নিজে রেকর্ড করে দাও।’’
নতুন গিগ ওয়ার্ক: রোবটকে শেখানো
এই নতুন চাকরিতে কর্মীদের দেওয়া হয় একটা হেডগিয়ার (কপালে ক্যামেরা বাঁধার স্ট্র্যাপ), ফিল্মিং নির্দেশনা এবং একটা টাস্ক লিস্ট। টাস্কগুলো হলো রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা, বাগানের কাজ এবং পোষ্যের যত্ন নেওয়া ইত্যাদি।
কর্মীদের সপ্তাহে কমপক্ষে ১০ ঘণ্টার ভিডিও জমা দিতে হয়। কোম্পানিগুলো উৎসাহ দেয় যে, নতুন নতুন জিনিস পরীক্ষা করে রেকর্ড করুন, যাতে রোবট নতুন পরিবেশে দ্রুত অভিযোজিত হতে পারে।
মাইক্রো১ বর্তমানে ৭১টি দেশে প্রায় ৪ হাজার ‘রোবোটিক্স জেনারেলিস্ট’ নিয়োগ করেছে। তারা প্রতি মাসে ১ লাখ ৬০ গাহার ঘণ্টার বেশি ভিডিও পাঠায়। কিন্তু আরিয়ান সাদেঘি বলেন, ‘এটা এখনও যথেষ্ট নয়। শুধু সাধারণ ঘরের কাজের জন্যই সম্ভবত বিলিয়নস অফ আওয়ার্স (শত কোটি ঘণ্টা) দরকার।’
বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানির উদ্যোগ
অবজেক্টওয়েজ কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা রবি রাজালিঙ্গম বলেন, ‘ভারতের রান্নাঘর আমেরিকার রান্নাঘর থেকে একেবারে আলাদা। ভারতের ঝাঁট আর আমেরিকার ঝাঁটও আলাদা। তাই বৈচিত্র্য খুব জরুরি।’ তার কোম্পানি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ডেটা সংগ্রহ করে।
শার্পা কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিসিয়া ভেনেজিয়ানি বলেন, ‘ডেটার ক্ষেত্রে সবসময় কোয়ালিটি আর কোয়ান্টিটির মধ্যে ট্রেড-অফ থাকে।’
চীনে রোবট ট্রেনিং সেন্টারের সংখ্যা ৬০-এর বেশি হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে। টেসলা তার অপটিমাস রোবটকে ক্যালিফর্নিয়া ও টেক্সাসে ট্রেনিং দিচ্ছে। এনভিডিয়া সিমুলেশনের উপর জোর দিচ্ছে।
কত আয় করা যায়?
কর্মীদের ঘণ্টায় ৫ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত দেওয়া হয়। আমেরিকায় এই রেট ভিয়েতনাম বা ভারতের তুলনায় তিনগুণ বেশি হতে পারে। কোম্পানি ক্যামেরা (গোপ্রো, মেটা গ্ল্যাস বা স্মার্টফোন) সরবরাহ করে। তবে জমা দেওয়া ভিডিওর মাত্র অর্ধেকই ব্যবহারযোগ্য হয়।
চ্যালেঞ্জ কোথায়?
রোবট ট্রেনিংয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাস্তবতা। ফ্যাক্টরিতে রোবটের সাফল্যের হার ৯৯.৯ শতাংশ। কিন্তু টি-শার্ট ভাঁজ করার মতো সাধারণ কাজে সাফল্য মাত্র ৭০-৮০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অফ রোবোটিক্সের গবেষণা চেয়ারম্যান অ্যালেকজান্ডার ভার্ল বলেন, ’৭০-৮০ শতাংশ সাফল্য ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।’
আরেকটি বড় ঝুঁকি নিরাপত্তা। রবি রাজালিঙ্গম বলেন, ‘যদি রোবট আমার বাচ্চাকে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। তাহলে মিলিয়ন ডলারের মামলা আসবে।’ এজন্য প্রথমে কুকুরের সাথে পরীক্ষা করা হয়, বাচ্চাদের সাথে নয়।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রুতাভ শাহ বলেন, ‘‘মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি রয়েছে, সেটাই রোবটের সবচেয়ে বড় অভাব। রান্না, পরিষ্কারের মতো ঘরের কাজে রোবটকে সাধারণভাবে ব্যবহারযোগ্য করা হবে অটোমেশনের ‘লাস্ট মাইল’।’’
ভবিষ্যত কেমন হবে?
ডেটা লেবেলিং ইন্ডাস্ট্রি প্রতি বছর ৩০ শতাংশ করে বাড়ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ ১০ বিলিয়ন ডলারের বাজার হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। আর এতে নেতৃত্ব দেবে এশিয়া।
এখন মানুষ রোবটকে শেখাচ্ছে, কিন্তু ভবিষ্যতে সিমুলেশন, এআইয়ের সাহায্যে ইউটিউব ভিডিও কনভার্ট করা বা অন্যান্য পদ্ধতি এই মানুষ সংগৃহীত ডেটার প্রয়োজন কমিয়ে দিতে পারে। তবে পরবর্তী তিন বছর অন্তত এই ‘হিউম্যান ডেটা’ অপরিহার্য বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়া একদিকে নতুন চাকরি তৈরি করছে। অন্যদিকে ভবিষ্যতে ঘরের কাজ, অফিসের কাজ থেকে মানুষকে সরিয়ে দিতে পারে। এটা শুধু প্রযুক্তির গল্প নয়, এটা ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান এবং সমাজের গল্প।
আজ যে ঘরের কাজ আপনি করছেন এবং ভিডিও করছেন। সেটাই হয়তো একদিন আপনার বাড়িতে থাকা অ্যান্ড্রয়েড বাটলারকে শেখাবে। কীভাবে সে আপনার হয়ে সেই কাজগুলো করবে।
সূত্র: সিএনএন



