যুদ্ধের ধারণা বদলে দিতে আসছে এআই আর্মি, পেছনে কারা?

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:২১ পিএম

সাধারণভাবে যুদ্ধ বলতে আমরা বুঝি ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও কামানের মতো ভারী সরঞ্জাম মোতায়েন করা। এগুলো মূলত তৈরি হয় সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে থাকা হাতে গোনা কয়েকটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সরাসরি রণাঙ্গনে সৈন্য পাঠানো হয়। এই ধারণা একেবারে মুছে না গেলেও, যুদ্ধের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে এখন চলে এসেছে নানা সফটওয়্যার। এখন রণাঙ্গনের চেয়ে বেশি স্ক্রিনের সামনে বসেই যুদ্ধ পরিচালনা করছেন সেনাসদস্যরা।

সামরিক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন ক্লাউড কম্পিউটিং থেকে শুরু করে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারা ড্রোন এবং সফটওয়্যারের মতো প্রতিটি খাতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিবর্তনের সূচনা ২০০০ ও ২০১০-এর দশকে মার্কিন ড্রোন কর্মসূচির মাধ্যমে। এর মাধ্যমে দূর থেকে হত্যা বা ধ্বংসযজ্ঞ চালানো আধুনিক যুদ্ধকৌশলের একটি নিয়মিত উপাদানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক খাতের এআই রূপান্তরের নেতৃত্ব গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে। এ খাতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ হচ্ছে।

এআই রূপান্তরের কারিগর কারা?

গত ১০ জুলাই যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রেইথন ইউকের নেতৃত্বাধীন ওমনিয়া ট্রেনিং কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ২ বিলিয়ন পাউন্ডের ১৫ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি করে। এর উদ্দেশ্য হলো এআই ব্যবহার করে প্রতি বছর ৬০ হাজার ব্রিটিশ সেনাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি বাহিনী গড়ে তোলা। এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ন্যাটো তাদের এনহ্যান্সড এয়ার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ডেটা প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার চুক্তি করেছে মার্কিন ল্যাটিস এআই, প্যালানটির এবং ফরাসি প্রতিষ্ঠান এসএএসের সঙ্গে।

অবশ্য প্রতিরক্ষা খাতে এআই সরঞ্জাম ক্রয় নতুন কিছু নয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের ২০১৪ সালের থার্ড অফসেট স্ট্র্যাটেজি স্পষ্টভাবেই বলছে, এআই-ই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের যুদ্ধের গতিপথ।

ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত চলতে থাকা যুদ্ধের ফলে এ ধরনের চুক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এআই শিল্প নিজেও সময়ের সঙ্গে দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র নির্মাতা এবং নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—উভয়ই এই বাজারের অংশীদারত্ব দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এই পরিবর্তনশীল দৃশ্যপট বোঝার একটি উপায় হলো কোম্পানিগুলোর বিজনেস মডেল বা পরিচালনা পদ্ধতির ভিত্তিতে তাদের অবস্থান মূল্যায়ন করা।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা সামরিক এআই শিল্পের একটি রূপরেখা তৈরি করেছেন, যেখানে কোম্পানিগুলোকে চারটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে:

১. ডিফেন্স প্রাইমস: ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান।

২. নিওপ্রাইমস বা ডিফেন্স স্টার্টআপস: সামরিক শিল্পের জন্য সফটওয়্যার তৈরিতে বিশেষায়িত নতুন কোম্পানি।

৩. বিগ টেক: বিশাল ক্লাউড ও কম্পিউটিং ক্ষমতার অধিকারী টেক জায়ান্ট।

৪. ফাউন্ডেশনাল মডেল প্রোভাইডার: ফ্রন্টিয়ার এআই ল্যাব, যারা উন্নত এআই মডেল তৈরি করে।

নিচে সিপ্রি-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী প্রতিটি বিভাগের কাজ এবং কোন কোম্পানিগুলো এর অন্তর্ভুক্ত তা তুলে ধরা হলো:

ডিফেন্স প্রাইমস

এ প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র প্রস্তুত করে সামরিক বাহিনীকে সরবরাহ করে আসছে। বর্তমানে তারা কর্মযজ্ঞের নানা স্তরে এআই যুক্ত করেছে। এই ধরনের বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে লকহিড মার্টিন, আরটিএক্স, নর্থরপ গ্রুম্যান, বিএই সিস্টেমস এবং জেনারেল ডাইনামিকস। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সূচনার পর এই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে লকহিড মার্টিন ঘোষণা দেয়, তারা তাদের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের জন্য একটি এআই টুলের পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালনা করছে, যা পাইলটদের শত্রুভাবাপন্ন বিমান দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করবে। আরেক মার্কিন সামরিক প্রতিষ্ঠান এলথ্রিহারিস তাদের ক্যামেরা সিস্টেমে রিয়েল-টাইম টার্গেটিংয়ের জন্য সরাসরি এআই যুক্ত করেছে। এটি শত্রু ড্রোন শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

নিওপ্রাইমস বা ডিফেন্স স্টার্টআপস

সফটওয়্যারকেন্দ্রিক এই নতুন শ্রেণির কোম্পানিগুলো অস্ত্রের পাশাপাশি পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর কাছে বিশেষায়িত ডেটা পণ্য বিক্রি করে। এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্যালানটির সবচেয়ে পরিচিত নাম। পেন্টাগনের ফ্ল্যাগশিপ এআই প্রোগ্রাম প্রজেক্ট মেভেনে তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধের ময়দানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নির্মিত এই সিস্টেমটি স্যাটেলাইট ইমেজ, ড্রোন ভিডিও এবং সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে এআই ও মেশিন লার্নিংয়ের ওপর নির্ভর করে। ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এই সিস্টেম ব্যবহৃত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মেভেন ১ হাজার লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করেছিল। মেভেনের সরাসরি প্রতিযোগী হলো অ্যান্ডুরিলের ল্যাটিস। এটি মার্কিন সেনাবাহিনী ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে।

বিগ টেক

গুগল, মেটা এবং আমাজনের মতো কোম্পানিগুলো বিশ্বব্যাপী ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচারের প্রায় ৬৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এরা ডিফেন্স কন্ট্রাক্টরদের মাধ্যমে ক্রমশ সামরিক ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। মে মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর আটটি প্রযুক্তি ও এআই কোম্পানির সঙ্গে নতুন চুক্তির কথা ঘোষণা করেছে, যাতে তাদের প্রযুক্তি সংবেদনশীল নেটওয়ার্কে ব্যবহার করা যায়। স্পেসএক্স, ওপেনএআই, গুগল, এনভিডিয়া, রিফ্লেকশন, মাইক্রোসফট, ওরাকল এবং এডব্লিউএসের সঙ্গে এই চুক্তিগুলো সম্পন্ন হয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে একটি "এআই-ফার্স্ট" বাহিনীতে পরিণত করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে।

ফাউন্ডেশনাল মডেল প্রোভাইডার

সর্বশেষ বিভাগটি হলো সেই সব প্রতিষ্ঠান, যারা মূল এআই মডেলগুলো তৈরি করে—যেগুলো অন্য কোম্পানিগুলো তাদের সামরিক টুলে যুক্ত করে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিক এবং ইউরোপের মিস্ট্রাল এআই। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চীনা গবেষকেরা ২০২০-এর দশকের শুরু থেকেই সামরিক ব্যবহারের জন্য এআই মডেল তৈরি করছেন। এর মধ্যে মেটার ল্লামা মডেলকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে চ্যাটবিট নামের একটি টুল তৈরি করেছে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি। এটিকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, চীন তাদের সামরিক এআই খাতে মার্কিন বাজেটের সমপরিমাণ—অর্থাৎ বার্ষিক প্রায় ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করছে।

২০২১ সালের সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড এমার্জিং টেকনোলজির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাইদু, আলিবাবা এবং টেনসেন্টের প্রাক্তন কর্মীদের সঙ্গে যুক্ত ছোট চীনা এআই কোম্পানিগুলো সামরিক বাহিনীর জন্য টার্গেটিং, নজরদারি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের টুল তৈরি করছে। যদিও প্রথম দিকে এই ফ্রন্টিয়ার এআই ল্যাবগুলোর অনেকেই সামরিক খাতে নিজেদের পণ্য ব্যবহারে ইচ্ছুক ছিল না, তবে ২০২৪ সালে ওপেনএআই তাদের সামরিক ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। একই বছর প্যালানটির এবং অ্যানথ্রোপিক চুক্তি করে, যা পরবর্তীতে মার্কিন সামরিক বাহিনীতে এআই মডেল ক্লডের ব্যবহার নিয়ে আইনি জটিলতায় রূপ নেয়।

যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষ তৈরি করেছিল কাজ সহজ করার জন্য, সেই প্রযুক্তিই যদি একদিন মানুষের নির্দেশ অমান্য করে নিজেই ইন্টারনেটে ঢুকে সাইবার হামলা চালায়?
বর্তমান সময়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) শুরু হয়েছে সাত দিনব্যাপী এক...
আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির আলোচনা করছে প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ইনফরমেশন। প্রতিবেদন...
ফুসফুসের ক্যান্সার শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বড় সাফল্য পেয়েছে ভারত। দেশটির দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় রাজ্য গোয়ায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে...
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাফল্যের খবর যেন পরদিনের পত্রিকার শিরোনাম ও...
কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ঢুকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক এক কর্মীসহ তিন শিক্ষার্থীকে বেধড়ক পেটানোর অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও...
সড়ক পরিষ্কার রাখা, গাছ লাগানো ও পশুপাখির যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে শিশু-কিশোরদের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে খেলাধুলা ও পড়াশোনায় সমান গুরুত্ব দেওয়ার...
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ৬ দিন ধরে অচল থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। গ্যাসের চাপ...
লোডিং...

এলাকার খবর