জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের সাথে পাল্লা দিচ্ছে ভারতে তৈরি একটি অ্যাপ। নাম ‘আরাত্তাই’। গত সপ্তাহে সাত দিনে সাত লক্ষবার ডাউনলোড করা হয়েছে অ্যাপটি। এমনটিই জানিয়েছে অ্যাপটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জোহো, যারা মূলত ক্লাউড প্রযুক্তিভিত্তিক বিজনেস সফটওয়্যার তৈরি করে থাকে। ‘আরাত্তাই’ একটি তামিল শব্দ, যার বাংলা অর্থ হচ্ছে হাস্যরসাত্মক বা বিনোদনমূলক আড্ডা।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্সর টাওয়ার-এর দেওয়া তথ্য বলছে, গেল আগস্টেও ‘আরাত্তাই’ অ্যাপটি ডাউনলোডের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারের নীচে। সেখান থেকে সংখ্যাটা ৭ দিনে ৭ লাখে পৌঁছাবে, তা কোনো কারণ ছাড়া হতে পারে না।
এক মাস আগেও খোদ ভারতের বাজারে যে ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং অ্যাপটির নাম-ও শোনেননি অনেকে, সপ্তাহের ব্যবধানে সেই অ্যাপটি-ই এখন রীতিমতো ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে উঠেছে। অবশ্যই এর একটি প্রেক্ষাপট আছে। ভারতীয়দের মাঝে ‘আরাত্তাই’ অ্যাপটি ব্যবহারের হিড়িক পড়েছে মূলত জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে।
সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার ভারতীয়দেরকে আমেরিকান পণ্যের পরিবর্তে দেশি পণ্য ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করে। বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশবাসীর উদ্দেশে মোদিসহ ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীপরিষদ ‘মেক ইন ইন্ডিয়া এন্ড স্পেন্ড ইন ইন্ডিয়া’- অর্থাৎ, ভারতে তৈরি করো এবং ভারতেই খরচ করো- বার্তা প্রচার করতে শুরু করে। তাতে সাড়াও মিলেছে বেশ।
এই প্রেক্ষাপটেই সামনে চলে আসে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান জোহো’র তৈরি মেসেজিং অ্যাপ ‘আরাত্তাই’। ২০২১ সালে নিরবে নিভৃতে উন্মোচিত এই অ্যাপটি হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। তবে তাতেও হাত ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের।
সপ্তাহ দুয়েক আগে এক্স প্ল্যাটফর্মে ‘আরাত্তাই’ অ্যাপ সম্পর্কে একটি পোস্ট করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান, যেখানে তিনি ভারতে তৈরি এই অ্যাপটি ব্যবহারের আহ্বান জানান। এরপর মোদি সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও ব্যবসায়িক নেতা এই অ্যাপটি ব্যবহার করতে ভারতীয়দের উৎসাহিত করেন। আর এখান থেকেই উত্থান এই ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং অ্যাপটির।
‘আরাত্তাই’ অ্যাপটি ডাউনলোডের সংখ্যায় এই আকস্মিক বৃদ্ধির পেছনে সরকারের অবদানের বিষয়টি অবশ্য স্বীকারও করেছে অ্যাপটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জোহো।
জোহো’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মানি ভেমবু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি-কে বলেছে, ‘মাত্র তিন দিনের মধ্যে আমাদের দৈনিক সাইন-আপের সংখ্যা ৩ হাজার থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজারে উন্নীত হয়েছে। আমাদের সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০০ গুণ বেড়েছে এবং এটা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
নিঃসন্দেহে ভারতীয়দের মাঝে দারুন সাড়া ফেলেছে ‘আরাত্তাই’ অ্যাপটি। কিন্তু মেটা’র মালিকানাধীন হোয়াটসঅ্যাপকে টেক্কা দিতে এখনও অনেক দূর যেতে হবে জোহো’র মালিকানাধীন অ্যাপটিকে।
উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহারকারী সংখ্যা ৩০০ কোটি, যার মধ্যে ভারতেই আছে অ্যাপটির ৫০ কোটি ব্যবহারকারী। বোঝাই যাচ্ছে ভারতে দারুন জনপ্রিয় হোয়াটসঅ্যাপ। ব্যক্তিগত কাজের পাশাপাশি পেশাগত কাজেও অ্যাপটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন ভারতীয়রা।
‘আরাত্তাই’ অ্যাপটিতে হোয়াটসঅ্যাপের অনুরূপ কিছু ফিচার রয়েছে। জোহো’র অ্যাপটি ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক মেসেজ আদানপ্রদানের পাশাপাশি এতে ভয়েজ ও ভিডিও কলেরও সুবিধা রয়েছে। কিন্তু ভয়েজ ও ভিডিও কলে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন সুবিধা থাকলেও মেসেজ আদানপ্রদানে এখনও এই ফিচারটি যুক্ত করতে পারেনি ‘আরাত্তাই’। তবে মানি ভেমবু জানিয়েছে যে, তাঁরা অচিরেই এই ফিচারটি মেসেজেও যুক্ত করতে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, হোয়াটসঅ্যাপের জনপ্রিয়তার পেছনে অন্যতম বড় কারণগুলোর একটি হচ্ছে এই এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন ফিচার।
তবে আরাত্তাই-এর ইউজার ইন্টারফেস এবং ডিজাইনের প্রশংসা করেছেন ব্যবহারকারীদের অনেকে। বেশ কয়েকটি বিজনেস টুলসও অফার করছে অ্যাপটি। আরেকটি সুবিধা হচ্ছে, স্বল্পমূল্যের স্মার্টফোন এবং তুলনামূলক নিম্নগতির ইন্টারনেট সংযোগেও অ্যাপটি সহজে ব্যবহার করা যায়।
কু, মোজ, শেয়ারচ্যাট-এর মতো ভারতীয় অ্যাপ ইতোপূর্বে এক্স, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েও শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারেনি। এবারে ‘আরাত্তাই’ কি পারবে দীর্ঘমেয়াদে ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং অ্যাপের বাজারে হোয়াটসঅ্যাপের শেয়ারে ভাগ বসাতে।
এক্ষেত্রে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ অবশ্য রয়েছে। নতুন ব্যবহারকারী বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যবহারকারীদেরকে ধরে রাখতে হবে আরাত্তাই-কে। বিষয়টি বেশ কঠিন। কারণ মেটা’র বিশাল ইকোসিস্টেমে অভ্যস্ত একজন ব্যবহারকারী শুধুমাত্র জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে দীর্ঘমেয়াদে আরাত্তাই ব্যবহার করবে হোয়াইটসঅ্যাপের পরিবর্তে- এমনটাই বাস্তবসম্মত নয় বলেই মত প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের।
আরাত্তাই-এর জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় হচ্ছে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ভারত সরকার ব্যবহারকারীদের ডেটা শেয়ার করার নির্দেশ দিলে তার বিরুদ্ধে এক্স, টিকটক, মেটা’র মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা দৃঢ়তার সাথে আইনি লড়াই লড়তে সক্ষম, ততটা কি পারবে আরাত্তাই?
এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে ‘আরাত্তাই’ প্রসঙ্গে ভারতীয়দের জাতীয়তাবাদী চেতনা কতটা দীর্ঘায়িত হবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি



