আবির্ভাবে তাঁকে নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো রীতিমতো ‘আহলাদ’ই করেছে। পৃথ্বী শ-র মধ্যে নাকি শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা ও বীরেন্দর শেবাগ- তিনজন কিংবদন্তির মিশ্রণ আছে। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকে ৯৯ বলে সেঞ্চুরি করে শুরুটাও দারুণ করেছিলেন শ।
কিন্তু ১৯ বছর বয়সী পৃথ্বী দুর্দান্ত শুরুটা ধরে রাখতে পারেননি। ২০২১ সালের পর থেকেই জাতীয় দলের বাইরে। ২০২৫ আইপিএলে নিলামে নিজের ভিত্তি মূল্য মাত্র ৭৫ লাখ রুপি রেখেছিলেন এই ওপেনার। কিন্তু দশটি ফ্র্যাঞ্চাইজির মধ্যে একটিও তাঁকে দলে টানার ঝুঁকি নেয়নি।
২৫ বছর বয়সী ক্রিকেটারের সময়টা এমনিতেও ভালোই যাচ্ছে না। কিছুদিন আগেই মুম্বাইয়ের রঞ্জি ট্রফির স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েছেন। এর আগেই দিল্লি ক্যাপিটালস ছেড়ে দিয়েছিল তাঁকে। এই ওপেনারকে দিল্লিতে নেওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিলেন ট্যালেন্ট স্কাউট ও সহকারী কোচ প্রবীণ আমরে। তিনিই বলছেন, অল্প বয়সে বেশি টাকা পেয়ে ‘বখে’ গেছেন পৃথ্বী।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আমরে বলেছেন, ‘তিন বছর আগে আমি ওকে বিনোদ কাম্বলির উদাহরণ দিয়েছিলাম। খুব কাছ থেকে কাম্বলির পতন দেখেছি আমি। এই প্রজন্মকে কিছু জিনিস শেখানো খুব কঠিন।’
শচীন টেন্ডুলকার ও কাম্বলি একই সঙ্গে উঠে এসেছেন। স্কুল ক্রিকেটে দুজনে মিলে জুটির রেকর্ড গড়েছিলেন, সে ইনিংসে কাম্বলিই এগিয়ে ছিলেন। প্রতিভায়ও অনেকের চোখে কাম্বলি ছিলেন এগিয়ে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটাও দারুণ হয়েছিল।
প্রথম চার টেস্টে দুটি ডাবল সেঞ্চুরি, প্রথম যে ছয়টি টেস্টে ব্যাট করতে পেরেছেন তাতে চারটি সেঞ্চুরি। ২১ বছরেই মহাতারকা বনে গিয়েছিলেন কাম্বলি। কিন্তু ২৩ বছরেই নিজের শেষ টেস্ট খেলেছেন কাম্বলি। ঘরোয়া ক্রিকেটেও ২০০৪ সালেই থেমে গেছে। ওদিকে তাঁর বন্ধু সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে গেছেন ২০১২ সাল পর্যন্ত।
আমরের ধারণা, আইপিএলের সুবাদে ২০ পেরোনোর আগেই কোটি টাকা প্রাপ্তি পৃথ্বীকে কাম্বলির পথে নিয়ে গেছেন, ‘দিল্লি ক্যাপিটালের কারণে ২৩ বছরের মধ্যেই ও নির্ঘাত ৩০ থেকে ৪০ কোটি রুপি আয় করে ফেলেছে। একজন আইআইএম (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট) থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীও কি এই প্রমাণ আয় করতে পারে? এত কম বয়সে এত আয় করা শুরু করলে আপনার মনোযোগ সরে যায়। কীভাবে অর্থ সামলাতে হয়, ভালো বন্ধু রাখতে হয় এবং ক্রিকেটকে প্রাধান্য দিতে হয়, এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রথম চার আইপিএলে ১ কোটি ২০ লাখ রুপি পেয়েছিলেন পৃথ্বী। ২০২২ আইপিএলে নিলামে সাড়ে ৭ কোটি রুপি দাম ওঠায় তাঁকে ধরে রেখেছিল দিল্লি। ২০২৩ আইপিএলে সে মূল্য ৮ কোটি রুপিতে উঠে। গত মৌসুমেও তাঁকে দলে রাখে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। কিন্তু ৮ ম্যাচে মাত্র একটা ফিফটিসহ ১৯৮ রান করেছেন।
তাঁর মূল সমস্যাটা সবার জানা, আমরে তাই অকপটে বলতে পেরেছেন, ‘শৃঙ্খলার অভাবই ওর ক্যারিয়ারের বাধা, ফিরে আসা ও ভালো করার ক্ষুধাটা ওর নেই। ওর মতো প্রতিভাকে এভাবে উল্টোদিকে যেতে দেখা খুব হতাশাজনক। মুম্বাইয়ে সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফি খেলতে যাওয়ার জন্য সে নাকি একটি প্রস্তুতি ম্যাচে দারুণ সেঞ্চুরি করেছে, এখন সে আইপিএলে ৩০ বলে ফিফটি করতে পারবে।’
আমরের ধারণা, পৃথ্বীকে উদাহরণ হিসেবে দেখা উচিত অন্যদের, ‘সে হয়তো এত অর্থ আর গ্ল্যামার সামলাতে পারেনি, আইপিএলের মতো টুর্নামেন্টের সাইড-ইফেক্ট এসব। ভারতীয় ক্রিকেটে ও গবেষণার বস্তু হতে পারে। ওর সঙ্গে যা হয়েছে, অন্যদের যেন এমনটা না হয়। শুধু প্রতিভা আপনাকে চূড়ায় নেবে না।’
শুধু আমরে নয়, দিল্লি ক্যাপিটালসে খেলার সময় সৌরভ গাঙ্গুলী ও রিকি পন্টিংয়ের মতো মেন্টরের সংস্পর্শ পেয়েছেন পৃথ্বী। অনূর্ধ্ব-১৯ দলে পেয়েছেন রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গ। এমনকি শচীন টেন্ডুলকারও তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শৃঙ্খলার অভাব মাঠের বাইরের ঘটনাতেই তাঁকে বারবার সংবাদের শিরোনাম করছে।



