বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের রাউন্ড অব ৩২-তে শনিবার ভোর ৪টায় মাঠে নামছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষ আফ্রিকার লড়াকু দল নবাগত কেপ ভার্দে। খাতায়-কলমে আলবিসেলেস্তেরা ফেবারিট হলেও, কেপ ভার্দেকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। গ্রুপ পর্বে স্পেন, উরুগুয়ের মতো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রুখে দেওয়া দলটি দেখিয়েছে ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলেও কীভাবে র্যাংকিংয়ের সামনের সারির দলগুলোকে আটকে দিতে হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, কেপ ভার্দে কি শুধুই ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলে? চলুন সে আলোচনাতেই যাওয়া যাক।
কেপ ভার্দে কি কেবলই ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলে?
ম্যাচের আগে বড় প্রশ্ন, কেপ ভার্দের ফুটবলের ধরণটা আসলে কেমন? তারা কি আর্জেন্টিনার সামনে শুধুই ‘বাস পার্ক’ করে বসে থাকবে? আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হতে পারে, কিন্তু ডেটা বলছে ভিন্ন কথা। গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে তাঁরা লো-ডিফেন্সিভ ব্লকে 'পার্ক দ্য বাস’ ফুটবল খেলে ইউরোপ চ্যাম্পিয়নদের গোল করতে দেয়নি। অথচ ম্যাচে স্পেন গোলে শট নিয়েছে ২৭টি।
অন্যদিকে স্পেন ম্যাচে কেপ ভার্দের বল পজেশন ছিল মাত্র ২৬ শতাংশ। কিন্তু তা সত্ত্বেও কাউন্টার অ্যাটাকে তাঁরা ওপরে উঠেছে এবং গোলে শট নিয়েছে ৬ বার। পরের ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে তাঁদের বল পজেশন ছিল ৩৫ শতাংশ। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেপ ভার্দে ১২ বার গোলে শট নিয়ে ২টি গোল আদায় করে নিয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য যে, সৌদি আরবের বিপক্ষে কিন্তু কেপ ভার্দে রক্ষণাত্মক ছিল না, ম্যাচের প্রায় অর্ধেক সময়, অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ বল পজেশন ধরে রেখে তাঁরা সমানে সমানে লড়াই করেছে। এ ম্যাচে তাঁরা গোলে শট নিয়েছে ১৫টি। সৌদির গোলরক্ষক বাধা হয়ে না দাঁড়ালে, গোলও পেয়ে যেত তাঁরা। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষ বুঝেই কৌশল বদলানোর ক্ষমতা রাখে এই দলটি।
কেপ ভার্দের বাস পার্কিংটা কেমন?
এটা ঠিক যে, স্পেনের মতো বড় দলের বিপক্ষে কেপ ভার্দে 'পার্ক দ্য বাস' ডিফেন্স অনুসরণ করে থাকে। কিন্তু এটা কি শুধুই রক্ষণের সামনে 'বাস পার্ক' করে রাখা? অর্থাৎ, গোলকিপারের সামনে ১০ জন খেলোয়াড়কে থেমে থাকা বাসের মতো দাঁড় করিয়ে দেওয়া। এক্ষেত্রে কেপ ভার্দের কৌশলটা একটু আলাদা। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে মাঠে তাঁদের খেলোয়াড়দের অ্যাভারেজ পজিশন দেখলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠে।
৪-১-৪-১ ফরমেশনে খেলা কেপ ভার্দের লো-ব্লক ডিফেন্সের কৌশলটা হচ্ছে, তাঁরা ওয়াইড এরিয়াকে ফোকাস না করে মূলত হাফস্পেস ও সেন্টারস্পেসকে ব্লক করে রাখার চেষ্টা করে। ডিফেন্সের ক্ষেত্রে তাঁদের দুই ফুলব্যাক ওয়াইড এরিয়া থেকে হাফস্পেসে চলে আসে। অন্যদিকে, দুই সেন্টারব্যাক পিকো ও ডিনি বোর্হেসের মাঝখানে অনেকটা সুইপার রোলে অপারেট করেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কেভিন লেনিনি, যেমনটা স্পেনের বিপক্ষে দেখা গেছে।
স্পেন ম্যাচে তাঁদের চার মিডফিল্ডারকে দুই দিকের হাফস্পেস ও সেন্টারস্পেস ব্লক করে রাখতে দেখা গেছে। ফলে দ্বিস্তর বিশিষ্ট দুর্ভেদ্য এক প্রাচীর তৈরি করতে পেরেছে তাঁরা। উরুগুয়ের বিপক্ষে তাঁরা রক্ষণ সামলে কাউন্টার-অ্যাটাকে ওপরে উঠেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব ম্যাচে তাঁরা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই হাইলাইন ডিফেন্স নিয়ে খেলেছে।
তাঁদের ডিফেন্সের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁরা ডিফেন্সিভ ইউনিট হিসেবে একসাথে মুভ করে। এর পাশাপাশি জোন ১৪ বা পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ছাড়া তাঁরা হাই প্রেস করে খুব একটা ফাইনাল ট্যাকেলে যায় না। ফলে ডিফেন্সিভ খেললেও কেপ ভার্দে কিন্তু ফাউল কমিট করে অনেক কম। স্পেন ম্যাচের কথাই ধরা যাক। পুরো ম্যাচে স্পেনের ১০টি ফাউলের বিপরীতে কেপ ভার্দে ফাউল করেছে মাত্র ১টি। ফাইনাল ট্যাকেলের পরিবর্তে তাঁরা বরং প্রতিপক্ষকে ট্র্যাক করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ্যবোধ করে। বিশেষ করে যার পায়ে বল তার পরিবর্তে সেকেন্ড ম্যানকে ট্র্যাক করে তাঁর পাস রিসিভ করার সুযোগটা নষ্ট করে দেওয়াই এখানে মূল লক্ষ্য।
কেপ ভার্দের হাই ওয়ার্ক রেট
কেপ ভার্দের শক্তিমত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হচ্ছে তাঁদের অবিশ্বাস্য 'ওয়ার্ক রেট' বা ক্লান্তিহীন দৌড়ানোর ক্ষমতা। একটু পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যাক। গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের ফুটবলাররা মাঠে দৌড়েছেন মোট ১০৬.১ কিলোমিটার। অন্যদিকে, উরুগুয়ের বিপক্ষে ৯৭.৫ কিলোমিটার এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে ১০৩.২ কিলোমিটার। অর্থাৎ, মাঠের প্রতিটি ইঞ্চির জন্য তারা নিজেদের সেরাটা দিয়ে লড়াই করে এবং নিজেদের এরিয়ায় প্রতিপক্ষকে সবসময় চাপের মধ্যে রাখে।
কম দৌড়েও বাজিমাত?
মজার ব্যাপার হলো, আর্জেন্টিনা কিন্তু কেপ ভার্দের চেয়ে মাঠে বেশ কম দৌড়ায়। আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা ডিসটেন্স কাভার করেছে ৮৭.২ কিলোমিটার, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৮২.৩ কিলোমিটার এবং জর্ডানের বিপক্ষে ৯৪ কিলোমিটার। অর্থাৎ, কেপ ভার্দের চেয়ে আর্জেন্টাইনরা গড়ে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার কম ডিসটেন্স কাভার করেছে। শুধু তাই নয়, তিন ম্যাচেই প্রতিপক্ষের তুলনায় আলবিসেলেস্তেদের ডিসটেন্স কাভারিং কম ছিল।
কিন্তু তাই বলে আক্রমণে আর্জেন্টিনার ধার এতটুকুও কমেনি। আর এখানেই আর্জেন্টিনার খেলার ধরণের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আর্জেন্টিনা বলের পেছনে দৌড়ায় না, বরং বলের পজেশন ধরে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে। ট্যাকটিকাল ভাষায় একে বলে 'ইকোনমি অব মুভমেন্ট'।
আর্জেন্টিনার পজেশন গেম
লিওনেল স্কালোনির দল মাঠ জুড়ে অবিরাম দৌড়ানোর চেয়ে বলের পজেশন ধরে রেখে খেলতেই বেশি পছন্দ করে। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচের ডেটা অন্তত সেটাই বলে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বল পজেশন ছিল ৪৮ শতাংশ, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৫৪ শতাংশ, আর জর্ডানের বিপক্ষে তো তারা ৭৩ শতাংশ সময় বল নিজেদের পায়ে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে।
আর এর ফলাফল কী ছিল? গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে আর্জেন্টিনা গোলে শট নিয়েছে ৩৪টি এবং গোল করেছে ৮টি। বিপরীতে গোল হজম করেছে মাত্র ১টি, শেষ ম্যাচে জর্ডানের বিপক্ষে।
উচ্চতায় কে এগিয়ে?
কেপ ভার্দের জমাট ডিফেন্স ভাঙতে তবে কি বক্সের ভেতরে ক্রস বাড়ানোই হবে মূল কৌশল? ঠিক যেমনটা কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল করে দেখিয়েছে জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে উচ্চতা। কেপ ভার্দের দুই সেন্টার ব্যাক পিকো ও ডিনি বোর্হেস এবং গোলকিপার ভোজিনিয়ার উচ্চতা ৬ ফুটের ওপরে। তাঁদের পুরো দলের গড় উচ্চতাও ৫ ফুট ৯ ইঞ্চির ওপরে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের গড় উচ্চতা ৫ ফুট সাড়ে ৮ ইঞ্চির মতো হলেও সমস্যা হচ্ছে, তাঁদের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের উচ্চতা। ফরোয়ার্ড লাইনে মেসি, আলভারেজ, লাওতারো মার্টিনেজ, থিয়াগো আলমাদাদের উচ্চতা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি থেকে ৫ ফুট ৭ ইঞ্চির মধ্যে। তাঁদের পক্ষে বক্সের মধ্যে ৬ ফুট উচ্চতার দুই সেন্টারব্যাক ও গোলরক্ষকের সাথে অ্যারিয়াল লড়াই জেতা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ হবে।
উল্লেখ্য, স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনিয়া ৭টি সেভ দিয়েছেন। আর দুই সেন্টারব্যাক পিকো ও ডিনি বোর্হেস বল ক্লিয়ার করেছেন ১৯ বার, ইনটারসেপ্ট করেছেন ৪ বার, আর শট ব্লক করেছেন ৬টি। গোলকিপার আর দুই সেন্টারব্যাকই হলো কেপ ভার্দের ডিফেন্সের মূল স্তম্ভ।
ভাঙবে কি কেপ ভার্দের 'বাস'?
তাহলে কেপ ভার্দের এই 'পার্ক করা বাস' ভাঙার উপায় কী? দুই উইং ব্যবহার করে ডিফেন্সকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা নিশ্চয়ই করবে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা। তবে কেপ ভার্দেও ওয়াইড এরিয়ার পরিবর্তে হাফস্পেস ও সেন্টারস্পেসেই তাঁদের ফোকাস ধরে রাখতে চেষ্টা করবে, যাতে করে ডিফেন্স লাইন নিটোল, নিখুঁত ও আঁটসাঁট রাখা যায়। এছাড়া মেসিকে আলাদা করে ‘ম্যান মার্কিং’ করার মাধ্যমে অন্যদের জন্য স্পেস তৈরি করা থেকেও বিরত থাকবে বলেই জানিয়েছে কেপ ভার্দে।
এক্ষেত্রে কেপ ভার্দের ডিফেন্স ভাঙতে দুই উইং থেকে, অর্থাৎ দুই পাশের ওয়াইড এরিয়া থেকে, বক্সে ক্রস বাড়ানোটাও কতটা যৌক্তিক হবে, সেটাও নিশ্চয় ভেবে দেখবেন স্কালোনির শিষ্যরা। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের বক্সের ভেতরে আর্জেন্টাইন অ্যাটাকের উচ্চতাজনিত অসুবিধার বিষয়টিও এক্ষেত্রে বিবেচনায় থাকবে বলেই আশা করা যায়।
আর তাই বক্সের ভেতরে ক্রস করার পরিবর্তে বরং ওয়ান-টাচ কুইক পাসিং আর বক্সের বাইরে থেকে জোরালো লং শটের দিকেই হয়তো বেশি করে ঝুঁকবে মেসি, মার্টিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজরা। এক্ষেত্রে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দেবেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
তবে অ্যাটাকের পাশাপাশি আর্জেন্টিনাকে এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, অ্যাটাকিং থার্ডে বলের পজেশন হারালে কেপ ভার্দে যাতে ট্রানজিশনে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক করতে না পারে। কাউন্টার প্রেসিংটাও তাই ঠিকঠাক করতে হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের।
বোঝাই যাচ্ছে, লড়াইটা হবে কেপ ভার্দের ‘পার্ক করে রাখা বাস’ বনাম আর্জেন্টিনার শৈল্পিক ওয়ান-টাচ পাসিং ফুটবলের। কেপ ভার্দে চাইবে কম পজেশন নিয়ে, মাঠজুড়ে অবিরাম দৌড়ে আর্জেন্টিনার পাসিং লেনগুলো ব্লক করে দিতে। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা চাইবে বল পজেশন ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করতে এবং কেপ ভার্দের ডিফেন্সিভ লাইনে ফাটল ধরাতে।
বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের পজেশন গেমের কাছে কেপ ভার্দের এই ডিফেন্সিভ ‘বাস পার্কিং’ কি পরাস্ত হবে, নাকি আফ্রিকার এই দলটির ওয়ার্ক রেটের কাছে আটকে যাবে আর্জেন্টিনা? উত্তরটা মিলবে শনিবার সকালেই।



