মাতৃমৃত্যু থামছে না, কারণ কী

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৪, ১১:৩৭ এএম

মানুষের অনেক কারণে মৃত্যু হতে পারে। নানা কারণে মৃত্যু ঠেকাতে কত কী করছে মানুষ! কিন্তু এখনো বিজ্ঞানের এই যুগে এ দেশের বহু নারী গর্ভাবস্থায়, সন্তান প্রসবকালে, বা প্রসব‑পরবর্তী জটিলতায় মারা যাচ্ছেন। একে এক কথায় ‘মাতৃমৃত্যু’ বলা হচ্ছে। সংখ্যাটা কত? ২০২৩ সালে প্রতি লাখ জীবিত শিশুর বিপরীতে মাতৃমৃত্যুহার ছিল ১৩৬। হ্যাঁ, আগের বছরগুলোর তুলনায় কমলেও তা ঠিক যুগের সাথে মানানসই নয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেই এ হার ১০৬। মধ্যম আয়ের দেশের বিচারেও বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি।

প্রথমেই বুঝতে হবে মাতৃমৃত্যু হিসেবে কোন মৃত্যুগুলোকে ধরা হচ্ছে। গর্ভাবস্থায় অথবা প্রসবকালে বা প্রসবের ৪২ দিনের মধ্যে যদি কোনো নারীর মৃত্যু হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘মাতৃমৃত্যু’। গর্ভাবস্থায় মাতৃমৃত্যুতে মা ও সন্তান–উভয়ের জীবনেরই সমাপ্তি ঘটে। আবার প্রসবকালীন বা প্রসবের পর মাতৃমৃত্যুতে কখনো কখনো শুধু মায়ের, ক্ষেত্রবিশেষে নবাগত সন্তান, আবার অনেক সময় মা ও নবজাতক দুজনেরই মৃত্যু হয়। এ অবস্থায় সন্তান যদি বেঁচেও থাকে, তাকে এক ভীষণ কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

মাতৃত্বের সাথে দুটি জীবন জড়িয়ে–মা ও সন্তান। নয় মাসের কম‑বেশি সময় গর্ভে ধারণ করে সন্তানের জন্ম দেন মা। এই সময়টাতে মাকে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হয়। তবে এই দীর্ঘ সময়ের কষ্ট সুখ হয়ে ধরা দেয়, যখন প্রসবের পর মা সন্তানের মুখ দেখেন। 
 
আগে সন্তান জন্মদানকালে অনেক মায়ের মৃত্যু হতো। এখন সে যুগ নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সম্প্রসারণের এই যুগে আগের তুলনায় কমে গেছে মাতৃমৃত্যু। কিন্তু নানা অবহেলায় প্রসবকালীন সময়ে মাতৃমৃত্যুর ঘটনা এখনো ঘটছে।
 
চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জরিপ থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালে  মাতৃমৃত্যু (প্রতি লাখ জীবিত জন্ম শিশুর বিপরীতে) ছিল ১৩৬, ২০২২ সালে ছিল ১৫৩, আবার ২০২১ সালে ছিল ১৬৮ এবং ২০২০ সালে ছিল ১৬৩।
 
দেশে সন্তান জন্মদানকালে অনেক মায়ের মৃত্যু হলেও কিছু কিছু আলোচনায় উঠে আসে। এর মধ্যে একটি গত ঈদুল ফিতরের সময়ে। সে সময় সন্তান প্রসবের পর সাফজয়ী নারী ফুটবলার রাজিয়া সুলতানার মৃত্যু হয়। এই ঘটনা নতুন করে বিষয়টিকে সামনে আনে। কিছু আলোচনা হয় সে সময়। তারপর ঘটনাবহুল এই দেশে বিষয়টি আবার হারিয়ে যায়। কিন্তু রাজিয়ার মতো মায়েদের মৃত্যু তো তাতে থেমে থাকছে না।
 
মাতৃমৃত্যুতে থেমে যায় অনাগত শিশুর জীবন। ছবি: ফ্রিপিকবলা হতেই পারে যে, রাজিয়া নিজেই হাসপাতালে যেতে চাননি। কিন্তু এতে দায়িত্ব এড়ানো যায় না। কারণ, রাজিয়ার এই মৃত্যু কিন্তু মাতৃস্বাস্থ্য সম্পর্কিত অসচেতনতার বার্তাই দিচ্ছে। আমরা কি তবে প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছি না? একটু পেছনে ফিরে দেখি, রাজিয়ার ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল?
 
১৩ মার্চ রাতে নিজের বাড়িতে ধাত্রীর সহযোগিতায় সন্তানের মা হন রাজিয়া। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার পর রাজিয়া হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অন্য উপায় না দেখে একপর্যায়ে রাজিয়াকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু হাসপাতালে শেষ পর্যন্ত তাঁকে নেওয়া যায়নি। কারণ, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই রাজিয়ার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় এক মায়ের প্রাণ প্রদীপ নিভে যায়। মাতৃহারা হয়ে যায় রাজিয়ার সন্তান। জানা যায়, সন্তান প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই মারা যান রাজিয়া। পুরো ঘটনাটি কিন্তু হয়েছিল মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে রাজিয়ার অসচেতনতা ও খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা ও অভাবের কারণে। যেহেতু তিনি ছিলেন পরিবারের উপার্জনের উৎস, সেহেতু তিনি দ্রুত খেলায় ফিরতে চেয়েছিলেন। ভয় ছিল, হাসপাতালে গেলেই স্বাভাবিক প্রসব না হয়ে অস্ত্রোপচার করা হতে পারে, যা তাঁকে মাঠ থেকে দীর্ঘদিনের জন্য দূরে সরিয়ে দেবে। কেন এই শঙ্কা হলো?
 
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে দেশে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শিশু জন্মহার ছিল ৪৯.৩ শতাংশ। আর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু জন্মের হার ছিল ৫০.৭ শতাংশ। যেখানে ২০২২ সালে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জন্মের হার ছিল ৫৮.৬ শতাংশ, আর অস্ত্রোপচারে শিশু জন্মের হার ছিল ৪১.৪ শতাংশ। অর্থাৎ, ক্রমেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু জন্ম বাড়ছে। বর্তমানে অর্ধেকের বেশি শিশু জন্ম নিচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ধারাটি চলছেই। ফলে রাজিয়ার মনে তৈরি হওয়া ভয়ের ভিত বেশ জোরালো বলতে হবে। এটি শুধু রাজিয়ার নয়, বহু পরিবার শুধু অস্ত্রোপচার এড়াতে এখন হাসপাতাল বা প্রাতিষ্ঠানিক সেবা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
 
অথচ গর্ভকালে একজন নারীর নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো থেকে শুরু করে নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত। তা না হলে মা ও সন্তানের স্বাস্থ্যঝুকিঁর আশঙ্কা থাকে। কিন্তু এখনো অনেক পরিবার বাড়িতে প্রসব করাচ্ছে। রাজিয়ার মৃত্যু সেটির বার্তা বহন করে।
 
এ বিষয়ে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক, প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বিলকিস বেগম চৌধুরী ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘গর্ভকাল থেকে প্রসব পূর্ববর্তী ৮ বার চেকআপের প্রয়োজন। সেটা করতে না পারলে অন্তত চারবার চেকআপের প্রয়োজন। এই চারবার কিন্তু উদ্দেশ্যমূলক। গর্ভকালে চারবার চেকআপ করলে ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়। এই চারবারের উদ্দেশ্য হলো, যদি এই সময় কোনো গর্ভবতী মায়ের সমস্যা দেখা দেয়, তবে তা দ্রুত নির্ণয় করা যাবে। পাশাপাশি গর্ভজনিত কোনো জটিলতা দেখা দিলে অবস্থা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। তবে দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে গর্ভকালীন চারবার চেকআপ করেন, এমন সংখ্যা ৬০ শতাংশের নিচে।’
 
বিবিএসের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালে বাসা‑বাড়িতে সন্তান প্রসবের হার ছিল প্রায় ৩২.৭৭ শতাংশ, যা ২০২২ সালে ছিল ৪২.৩১ শতাংশ। একই বছরে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রসবের হার ছিল ২৬. ৪৩ শতাংশ, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রসবের ছিল ৩৯.৭৬ শতাংশ। এ ছাড়া ২০২৩ সালে গর্ভকালীন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে চারবার বা তদূর্ধ্ব পরিচর্যা ও সেবা গ্রহণ করেছেন মাত্র ৩৯.০৮ শতাংশ।
 
নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা না নেওয়াকেই অস্ত্রোপচার বেশি হওয়া এবং মাতৃমৃত্যু বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক বিলকিস বেগম চৌধুরী। তাঁর মতে, ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র প্রসূতি মায়ের ডেলিভারি করা প্রয়োজন। আর সেটা যদি না হয়, তাহলে প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে প্রসবকালে কোনো জটিলতা তৈরি হলে, তদনুসারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে ৫০ ভাগ ডেলিভারি হয় বাড়িতে এবং অদক্ষ হাতে। এদের মধ্যে আবার যারা চিকিৎসাকেন্দ্রে আসেন, তাদের নাজেহাল অবস্থা থাকে। তখন তাদের জন্য আমাদের আর কিছুই করার থাকে না। তাই প্রসবের পরিকল্পনা ও প্রসবের স্থান হতে হবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে।’
 
বাল্যবিবাহের কারণে অনেক সময় মাতৃমৃত্যু ঘটে থাকে। প্রতীকী ছবিএ ক্ষেত্রে বাল্যবিয়েও একটি কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, যাদের ১৮ বছরের নিচে বিয়ে হচ্ছে, তাদের গর্ভকালীন নানা সমস্যা দেখা দেয়।  বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের বাল্যবিবাহ হচ্ছে তাদের গর্ভজনিত উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভাবস্থায় গর্ভপাত, অকাল প্রসব, খিঁচুনির পাশাপাশি প্রসব পথে বাচ্চা আটকে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। আবার অনেকের জরায়ুও ফেটে যায়। তাই তারা নানারকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাতৃমৃত্যুহার কমাতে প্রয়োজন পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিজ্ঞদের দিয়ে গর্ভকালীন চেকআপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র ডেলিভারির ব্যবস্থা করানো প্রয়োজন। তাহলে মায়ের ও শিশুর মৃত্যুহার অনেকাংশে কমে যাবে। এ জন্য গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
হয়তো আপনার পরিচিত কোনো স্কুলপড়ুয়া মেয়ের ফেসবুক আইডি থেকে অদ্ভুত কিছু বার্তা পেলেন। অবাক হবেন না, হয়তো আপনার পরিচিত সেই মেয়েটি সাইবার অপরাধের নির্মম শিকার। এমন ভুয়া আইডি তৈরি করে বিভিন্নজনকে পাঠানো...
দেশে মোট শ্রমশক্তি সাত কোটির বেশি, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি নারী। যা এখন মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে অবদান বাড়লেও মজুরি আর মর্যাদায় এখনো পিছিয়ে নারীরা। কমেনি বৈষম্য। খাত...
গণিত অনেকের কাছেই কঠিন একটি বিষয়। সমীকরণ আর জটিল তত্ত্বে ভরা এই জগৎ অনেক সময় ভয়ও জাগায়। কিন্তু এই কঠিন বিষয়কেই নিজের ভালোবাসা আর মেধা দিয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মরিয়ম মির্জাখানি। তাঁর...
নারীর প্রতি ক্রমশ বাড়তে থাকা নিপীড়নের মধ্যে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যুদ্ধ, মানব পাচার আর সাইবার জগতে নারীর সুরক্ষায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বের...
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ম্যাচ খেলতে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে জাতীয় দলের দায়িত্বের...
গত বছরের ২৭ মে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। আরও গ্রেপ্তার হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ, শ্যুটার আরাফাত ও শরীফ। ২৪ এর ৫ আগস্টের পর একের পর এক হত্যাকাণ্ডে...
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী...
সংবাদ সম্মেলনে মেজর ফারহান মাহমুদ মোক্তাদা জানান, চক্রটি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম-ছবি ব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা আদায়ের অপচেষ্টা চালাচ্ছিল। গ্রেপ্তারকৃতের কাছ থেকে ১টি মাইক্রোবাস, ৭টি মোবাইল...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর