লৌহমানবী মুনিবা মাজারি

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১০:৫১ এএম

সালটা ২০০৮। স্বামী খুররাম শাহজাদার সঙ্গে গাড়িতে করে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিলেন মুনিবা। খুররাম নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে খুররাম তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। ফলাফল ভয়ংকর এক দুর্ঘটনা। খাদে পড়ে যায় তাঁদের গাড়ি।

খুররাম গাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে পারলেও আটকা পড়েন ২১ বছরের মুনিবা। প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় সেখানে অ্যাম্বুলেন্স সহজলভ্য ছিল না। পথচারীরাই জিপে করে মুনিবাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি শেষে হাসপাতালে পৌঁছে জানা যায় দুর্ঘটনায় মুনিবার কোমরের নিচ থেকে পুরোটা অচল হয়ে গেছে, ডানহাতের রেডিয়াস আলনা এবং পাঁজরের হাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফুসফুস এবং লিভার।

পরের আড়াই মাস হাসপাতালই ছিল মুনিবার ঠিকানা। এটি ছিল মুনিবার জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ সময়। এমনও হয়েছে বিষণ্নতায় নিজের চুলে কাঁচি চালিয়েছেন। স্বামী, বাবা সবাই মুখ ফিরিয়ে নেন মুনিবার ওপর থেকে। শুধু মা আর ভাই ছিলেন পাশে। মা-ই মুনিবাকে বলতেন, ‘এই দিন একদিন শেষ হবে। সৃষ্টিকর্তার নিশ্চয়ই তোমাকে নিয়ে আরও বড় কোনো পরিকল্পনা রয়েছে।’

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন মুনিবা মাজারি। ছবি: সংগৃহীতদুই মাস পর যখন বাড়ি ফিরলেন, মুনিবার সঙ্গী হলো হুইলচেয়ার। আর কোনোদিন হাঁটতেই পারবেন না। যন্ত্রণাকাতর মুনিবা দুই বছর বিছানা থেকে উঠতেই পারলেন না।

কিন্তু শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ববরণ করলেও মানসিকভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেন। যেমন আছেন, সেভাবেই নিজেকে মেনে নিতে শুরু করলেন। মুনিবার ভাষায় সেটি ছিল তাঁর পুনর্জন্ম- ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানো।

দুর্ঘটনার পর বিবাহ বিচ্ছেদের ভয় জেঁকে বসেছিল মুনিবার মনে। সেই ভয় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে স্বামীকে নিজেই বিচ্ছেদের নোটিশ পাঠিয়ে দেন।

যেসব কষ্ট, যন্ত্রণা, বিরহ হাসপাতালের লম্বা সাদা করিডরের মাঝে হারিয়ে গিয়েছিল, তা সবার সামনে তুলে ধরতে মুনিবা হাতে তুলে নিলেন তুলি আর রং। ঘরের চার দেয়ালই হলো তাঁর প্রথম ক্যানভাস।

সেই দিনগুলিতে মুনিবা মনে মনে বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার মতো করে জীবনটাকে উপভোগ করবো। আমাকে অন্য কারও জন্য নিখুঁত হতে হবে না। আমার ভয়গুলো আমিই জয় করবো’।

স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন মুনিবা। দুর্ঘটনায় তাঁর হাড় এত খারাপ অবস্থায় ছিল যে, ভারসাম্য বজায় রাখতে মুনিবার পিঠের ভেতর চিকিৎসকরা টাইটানিয়াম স্থাপন করেন। ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় মুনিবা তাই পরিচিতি পান ‘পাকিস্তানের লৌহমানবী’ হিসেবে।

নারীদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন মুনিবা মাজারি। ছবি: সংগৃহীতপ্রতিটি দিন সকাল হলেই মৃত্যু যন্ত্রণা যাকে আঁকড়ে ধরত, সেই মুনিবা মাজারি আজ একইসঙ্গে খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তা, মানবাধিকার কর্মী, মডেল, জাতিসংঘের পাকিস্তানি শুভেচ্ছাদূত এবং পাকিস্তানের প্রথম হুইলচেয়ারে বসা টেলিভিশন উপস্থাপিকা।

নারী অধিকার, লৈঙ্গিক সমতা, শারীরিক বিকলাঙ্গতা এবং শিশুদের ওপর সহিংসতার মতো বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছেন মুনিবা। মুনিবা মাজারির আঁকা বহু ছবি বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ গ্যালারিগুলোতে প্রদর্শিত হয়েছে। অসাধারণ বাগ্মিতার জন্য মুনিবাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সেমিনার, কনফারেন্সের মতো বহু আয়োজনে। মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে মুনিবার কথা শুনেছে। তারা আত্মবিশ্বাসকে শক্তিতে রূপান্তর করার রসদ জুগিয়েছে।

মুনিবা মাজারি নিজের ব্যক্তিগত দুঃখকষ্টের ভেতরে সৌন্দর্য খুঁজে নেন। তাই ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে তুলে ধরা হবে এমন কোনো ক্যাম্পেইনে নিজেকে যুক্ত করতে চান নি।

২০১৫ সালে  ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি প্রকাশিত বিশ্বজুড়ে নানা কাজে আলোচিত ১০০ জন প্রভাবশালী ও অনুপ্রেরণাদায়ী নারীর তালিকায় মুনিবা মাজারির নামও ছিল। ফোর্বসের ‘থার্টি আন্ডার থার্টি’ তালিকায়ও স্থান করে নেন মুনিবা। ‘মুনিবাস ক্যানভাস’ নামে একটি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন মুনিবা, যার স্লোগান ‘রাঙিয়ে দাও তোমার দেয়াল’। মুনিবার দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাস প্রতিদিন শত শত মানুষকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে।

‘হাসপাতালে মানুষ আমাকে যে করুণার চোখে দেখছিল তা আমার সহ্য হয়নি। তারা আমার সঙ্গে রোগীর মতো আচরণ করছিল। আমি লোকজনের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতাম, কারণ তাঁদের চোখে আমার জন্য থাকা করুণা আর সহানুভূতি দেখতে চাইনি। অথচ আজ আমি হলভর্তি অসাধারণ মানুষের সামনে নিজেকে তুলে ধরতে পারছি। কারণ আমার ভয়গুলোকে আমি জয় করেছি,’  টেডেক্সে দেওয়া বক্তব্যে এভাবেই নিজের সম্পর্কে বলেন মুনিবা।    

তথ্যসূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, কালেকটিভ স্পিকারস, মিডিয়াম ডট কম 

হয়তো আপনার পরিচিত কোনো স্কুলপড়ুয়া মেয়ের ফেসবুক আইডি থেকে অদ্ভুত কিছু বার্তা পেলেন। অবাক হবেন না, হয়তো আপনার পরিচিত সেই মেয়েটি সাইবার অপরাধের নির্মম শিকার। এমন ভুয়া আইডি তৈরি করে বিভিন্নজনকে পাঠানো...
দেশে মোট শ্রমশক্তি সাত কোটির বেশি, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি নারী। যা এখন মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে অবদান বাড়লেও মজুরি আর মর্যাদায় এখনো পিছিয়ে নারীরা। কমেনি বৈষম্য। খাত...
গণিত অনেকের কাছেই কঠিন একটি বিষয়। সমীকরণ আর জটিল তত্ত্বে ভরা এই জগৎ অনেক সময় ভয়ও জাগায়। কিন্তু এই কঠিন বিষয়কেই নিজের ভালোবাসা আর মেধা দিয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মরিয়ম মির্জাখানি। তাঁর...
নারীর প্রতি ক্রমশ বাড়তে থাকা নিপীড়নের মধ্যে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যুদ্ধ, মানব পাচার আর সাইবার জগতে নারীর সুরক্ষায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বের...
বাংলাদেশের ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের অধিকার, মর্যাদা ও পেশাগত উন্নয়নের লক্ষ্যে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডি-ফ্যাব) কেন্দ্রীয় সংসদ কর্তৃক “পরিবার পরিকল্পনা শাখা”-এর ২৯...
বিএনপিকে ‘সন্ত্রাসী কার্ড’ দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী।  বুধবার বিকালে কুড়িগ্রাম শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত ‘দেশ গড়তে...
ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের দমন করার ঘটনা সংক্রান্ত পুলিশের যাবতীয় নথিপত্র, সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও চিত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন দিল্লি হাইকোর্ট।
চলতি বছর না হলেও আগামী বছরের শুরুতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বুধবার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর