জাতীয় পর্যায়ের অগ্রগতিতে নারীর অবদান থাকলেও নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না। নারীরা শিক্ষায়, কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নারীরা এখনো প্রান্তিক অবস্থায় এবং সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে নানা আলোচনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছেনা। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সারাবিশ্বের নারীদের একত্রিত হতে হবে। এ ছাড়া নারীর মানবাধিকার পরিস্থিতির সঠিক জাতীয় গুণগত ও সংখ্যাগত উপাত্ত থাকতে হবে। বাল্যবিয়ে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে এ বিষয়টি অন্যান্য দেশ স্বীকার করলেও বাংলাদেশ স্বীকার করেনি। বাল্যবিয়ে ও সহিংসতা বন্ধ নারীদের শিক্ষায় সুযোগ তৈরি সহ জীবনমান উন্নয়নে সরকারকে নীতিগত কর্মকৌশলের পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি অংশীদারিত্ব ও সমঅধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে, পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
মহিলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত ‘নারীর মানবাধিকার: বাস্তবতা ও করণীয়’ বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ৮ অক্টোবর মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম মুনিরা খান মিলনায়তনে এই গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষে মূল প্রবন্ধ (সংযুক্ত) উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহ-সভাপতি রেখা চৌধুরী।
গোলটেবিল বৈঠকে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান, মানবাধিকারকর্মী শীপা হাফিজা, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরা শামসাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কনসালটেন্ট ও বহ্নিশিখার স্ট্রেনথদেনিং ইন্টার জেনারেশনাল উইমেন্স মুভমেন্ট ইন বাংলাদেশ প্রোগ্রামের ডিরেক্টর সামিনা ইয়াসমিন, ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. তানভির ইসলাম।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের আদিবাসী শিক্ষার্থী রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা, শেকল ভাঙার পদযাত্রার সংগঠক ইসাবা শুহরাত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রাফিয়া রেহনুমা হৃদি, অ্যাকশন এইডের ম্যানেজার (উইমেন রাইটস এন্ড জেন্ডার ইকুয়িটি) মরিয়ম নেসা। গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক জনা গোস্বামী।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বর্তমান সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা, নারীর স্বাধীনভাবে চলাচলে বাধা, নারীর নিরাপত্তাহীনতা, নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপরে সহিংসতার সংবাদ মূলধারার গণমাধ্যমে আরো দৃশ্যমান এবং সংবেদনশীল করার প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সমাজের ভিন্ন লিঙ্গের মানুষের উপর দল ভিত্তিক উচ্ছৃঙ্খল আচরণের প্রতিকার দরকার। সভায় নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সময়ের পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করে নারী আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ ও বেগবান করার আহ্বান জানানো হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে দৈনিক প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, ‘নারীকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। এজন্য পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। এখানে পুরুষকে মানবিক হওয়া দরকার। এখন নারীর স্বাধীনভাবে চলাফেরায় শঙ্কা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তা দূর করার পরিকল্পনা নিতে হবে। সংসদে এক তৃতীয়াংশ সরাসরি ভোটে নারীদের আসতে হবে এবং বৈষম্যমূলক আইনসমূহ পরিবর্তন করতে হবে।’
গোলটেবিল বৈঠকে অন্যান্য আলোচকবৃন্দ বলেন, আদিবাসী নারীদের প্রতি নির্যাতনের চিত্র গণমাধ্যমে আরো দৃশ্যমান হতে হবে। নারীর পোশাকে ও চলাফেরায় স্বাধীনতা থাকতে হবে, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ও তাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাজের স্বাধীনতা ও চলাফেরায় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে জোরালো অ্যাডভোকেসি করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘তৃণমূলের নারী, পেশাজীবী নারী, তরুণীসহ সকল শ্রেণীর নারীদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে নারী আন্দোলনকে বিস্তৃত করতে মহিলা পরিষদ কাজ করছে। ১৯৪৮ সালের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদে, সিডও সনদে এবং বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না। তাই নারীদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়ন জরুরি।


সংবিধান অনুসারে সকল নাগরিকের অধিকার সমান: মহিলা পরিষদ
সেপ্টেম্বরে ২০৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে: এমএসএফ
