১৯২১ থেকে ১৯৭১। এই টানা ৫০ বছর নারীদের ফুটবল খেলা নিষিদ্ধ করে রেখেছিল ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। তারা বলত, খেলা বিষয়টি নারীদের সঙ্গে যায় না। কিংবা নারীরা খেলার জন্য উপযুক্ত নয়।
তাদের বক্তব্য যে কতটা অসাড় ছিল, তা মনে হয় এখন আর হলফ করে বলার প্রয়োজন নেই। মাত্রই কদিন আগে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে নারীদের ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানে গত ২০ আগস্ট ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিলেন স্পেন ও ইংল্যান্ডের নারী ফু্টবলাররা। ফলাফল ইতিমধ্যে সবার জানা হয়ে গেছে। স্পেন জিতে নিয়েছে শিরোপা।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনেমিস্ট বলছে, ইংল্যান্ড ও স্পেনের ফাইনাল ম্যাচের টিকিট বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি। এর আগে ২০১৫ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত খেলায় টিকিট বিক্রি হয়েছিল ১ কোটি ৩০ লাখ। ইংল্যান্ড ও স্পেনের খেলাটি টেলিভিশনে দেখেছে অন্তত ১০০ কোটি দর্শক। অর্থাৎ আগের রেকর্ডকে সব দিক থেকেই ছাড়িয়ে গেছে এবারের নারী বিশ্বকাপ।
নারী ফুটবলের এই উত্থানকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ এর সঙ্গে নারীদের লড়াইয়ের প্রসঙ্গটি জড়িত। এটি শুধু নিছক খেলাই নয়, পুরুষদের সঙ্গে নারীদের সমতারও লড়াই বটে।
তবে নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়া ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের বিচারে যদি বিষয়টিকে দেখা হয়, তবে বলতে হবে, নারীদের এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। যদিও আগের বিশ্বকাপের তুলনায় এবারের বিশ্বকাপে নারী ফুটবলারদের পুরস্কারের অর্থ তিন গুণেরও বেশি বাড়ানো হয়েছে। তবুও তা পুরুষদের পাওয়া পুরস্কারের অর্থমূ্ল্যের মাত্র ২৫ শতাংশ।
ফুটবল ক্লাবগুলোতে খেলোয়াড়দের যে বেতন দেওয়া হয়, তাতেও ভয়াবহ বৈষম্য রয়েছে। এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, টেলিভিশনগুলোতে নারীদের খেলার প্রচার না দেওয়া। ২০২২ সালে ব্রিটেনের টেলিভিশনগুলোতে নারীদের খেলা দেখানো হয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশ। এর আগে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশনগুলো নারীদের খেলা দেখিয়েছিল মাত্র ৫ শতাংশ।
এর পেছনে কারণ কী, কে জানে! মাঠের ফুটবলে নারী কিংবা পুরুষদের খেলায় কোনো পার্থক্য নেই। পুরুষেরা যে আকারের মাঠ, যে আকারের ফুটবল ও যে ধরনের নিয়ম মেনে খেলেন - নারীরাও একই আকারের মাঠ, ফুটবল ও নিয়ম মেনে খেলেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, খেলাধুলায় এ ধরনের সমতা যে সব সময় ভালো, তা কিন্তু নয়। কেন ভালো নয়, সেই ব্যাখ্যার দিকে এবার একটু নজর দেওয়া যাক।
নারীবাদীরা দীর্ঘদিন বলে আসছেন, নারী মানে শুধু লম্বা চুলওয়ালা পুরুষ নন। কিন্তু আমাদের এ জগৎ সংসারে তেমনটাই ভাবা হয়। ফলে মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে এয়ারব্যাগ পর্যন্ত সব কিছুই এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা মোটেও নারীবান্ধব নয়। বরং বিপদজনক বলা যায়।
একই ধরনের যুক্তি খেলাধুলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নারীদের খেলাধুলার একটি ‘আলাদা ক্যাটাগরি’ রয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, নারীরা গড়ে পুরুষদের চেয়ে শারীরিকভাবে একটু খর্ব। এ কারণে একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, নারীদের খেলার পিচ, গোলবার ও বল একটু ছোট ও হালকা হওয়া উচিত।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, আঘাতের ঝুঁকি। নারীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ফুটবলের বুট তৈরি করা হয়নি। শুধু গোলাপি রঙ করা ছাড়া নারী ও পুরুষদের বুটের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যারা এসব তৈরি করে তারা কখনোই মনে করে না যে, নারীদের পায়ের গঠন ও আকৃতি ভিন্ন। তারা আরও ভাবে না যে, পুরুষের ওজন বিবেচনায় নিয়ে ডিজাইন করা বুটগুলো নারীদের জন্য বেশি যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। পুরুষদের বুট নারীদের হাঁটুতে আঘাতের ঝুঁকি যে বাড়াতে পারে, সেটি নিয়েও কেউ ভাবে না।
আঘাতের ঝুঁকি কেবল হাঁটুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তা কিন্তু নয়। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বারবার ফুটবলে হেড করা পুরুষদের তুলনায় নারীদের মস্তিষ্ক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ও রাগবি খেলোয়ারদের মস্তিষ্কের এ ধরনের ক্ষতি দেখে দেশটির ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ নারীদের খেলার মাঠে হালকা বল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
এ ধরনের পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের জন্ম দেবে। দিচ্ছেও। রাগবি ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড রাগবি’ সম্প্রতি নারীদের ছোট হাত বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ছোট আকৃতির বল দিয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে স্বয়ং খেলোয়াড়েরাই সহজভাবে নিতে পারছেন না। কেউ কেউ এ সিদ্ধান্তকে বাধা হিসেবে দেখেছেন, কেউ কেউ আবার স্বাগত জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, এ ধরনের সিদ্বান্ত নারীদের খেলার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করবে।
সমালোচনা থাকবেই। এটাই বাস্তবতা। এটাকে মেনে নিয়েই খেলাধুলায় লৈঙ্গিক পার্থক্য মিটমাট করা উচিত বলে মনে করেন বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা। অ্যাথলেটিক্সে নারীদের বাধা কম এবং আলোচনা-সমালোচনাও কম। বাস্কেটবলে ছোট বল ব্যবহার করা হয়। ভলিবলের ক্ষেত্রে নিচু আকৃতির নেট ব্যবহার করা হয়। এসব ক্ষেত্রে তাই সমালোচনা কম।
তারপরও অনেকেই মনে করেন, খেলাধুলার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান আচরণের ব্যবস্থা থাকা উচিত, যেমনটি জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে রয়েছে। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা উচিত, নারী ও পুরুষ শারীরিকভাবে এক নন। তারা যে নারী, এটি জাহির করার জন্য কোনো পক্ষপাতিত্বেরও দরকার নেই।
দ্য ইকোনেমিস্ট থেকে অনুদিত



