বিবাহবিচ্ছেদে দোষারোপ নয়

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৩:০৯ পিএম

শুরুতেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনের তারকা দম্পতির দিকে তাকানো যাক। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ও তাঁর স্ত্রী সোফি কিছুদিন আগে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। এ সম্পর্কিত আইনি নথিতে সইয়ের মধ্য দিয়ে অবসান হয় ট্রুডো–সোফি দম্পতির দেড় যুগের বিবাহিত জীবনের। এমন বিচ্ছেদ তো হামেশাই হচ্ছে। এই যেমন চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই সময়ের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেই শুধু ৪ হাজারের বেশি বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। এসব নিয়ে ওই মানুষের পারিবারিক গণ্ডিতে আলোচনা হলেও জনপরিসরে হয়নি। তবে ট্রুডোর মতো তারকা দম্পতি হলে তা নিয়ে চলে বিস্তর আলোচনা। চলে দোষারোপ, যার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর, বিশেষত উত্তর প্রজন্মের ওপর, যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়।

আবার ট্রুডো দম্পতির দিকে তাকানো যাক। তাঁদের ভক্তকুল নানামাত্রিক আলোচনায় ঢুকলেও তাঁরা কিন্তু সে পথে হাঁটেননি। জাস্টিন ট্রুডো ও সোফির রয়েছে তিন সন্তান। তাঁদের বিচ্ছেদ নিয়ে ট্রুডোর কার্যালয়ের বিবৃতি থেকে জানা যায়, তাঁরা দুজন পরিবারের মতো হয়েই থাকবেন। যাতে তাঁদের সন্তানেরা নিরাপদে থাকতে পারেন। সম্প্রতি বিচ্ছেদের পরপরই পরিবার নিয়ে ১০ দিনের ছুটি কাটান ট্রুডো। জাস্টিন–সোফি দম্পতির কাছ থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো-তাঁরা বিবাহবিচ্ছেদের পরও সন্তানদের নিয়ে ভাবছেন। তাঁদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেননি সন্তানদের। কিন্তু এমনটা বিশেষত এই দেশে খুব কমই হয়।

বিচ্ছেদের দায় চাপানো
তারকা দম্পতি থেকে এবার চোখ ফেরানো যাক দেশের দিকে। ঢাকায় বিচ্ছেদ হওয়া এক কর্মজীবী নারীর সঙ্গে কথা হয় সম্প্রতি। তাঁর নাম মেঘলা (ছদ্মনাম)। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মেঘলার সাথে কথা হয় তাঁর বিচ্ছেদ নিয়ে। একটা সময় পর্যন্ত তিনি মনে করতেন, বিচ্ছেদের কারণ তিনি নিজেই।  কথা বলতে বলতে বোঝা গেল বিচ্ছেদটা তিনি চাননি৷

মেঘলা জানান, দুই বছর প্রেমের পর বিয়ে করেন তিনি, যার স্থায়িত্বকাল ছিল পাঁচ বছর। প্রথমদিকে ভালোই চলছিল সংসার। সে সংসারে ছিলেন শ্বশুর-শাশুড়ি। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছর পর বদলে যেতে থাকে সবকিছু। সবকিছুতেই খুঁত ধরতেন তাঁর স্বামী। বিয়ের আগের সেই পুরুষটি বিয়ের পর অন্যরকম হয়ে যান৷ কম বেতনের চাকরি নিয়েও কথা শুনতে হতো মেঘলাকে। এ ছাড়া সাংসারিক বিষয়ে অভিযোগের কমতি ছিল না। এক সময় কথা বলাও বন্ধ হয়ে যায়। একদিন স্বামীই মেঘলাকে সমঝোতার মাধ্যমে বিচ্ছেদ করার প্রস্তাব দেন।  এ কথা শুনে মেঘলা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, যার প্রভাব পড়ে তাঁর নিত্যদিনের কাজকর্মে। শেষে বিচ্ছেদই বাস্তব হয়ে ওঠে। ফিরে যান মা-বাবার কাছে। নিয়ম মেনেই নথিতে সই করে দুই পক্ষ বিচ্ছেদ সম্পন্ন করেন।

বিচ্ছেদের ঠিক ছয় মাস পর মেঘলা জানতে পারেন সাবেক সহকর্মীকে বিয়ে করেছেন তাঁর সাবেক স্বামী। মেঘলা দুঃখ করে বলেন, ‘আমার স্বামী তো বলতে পারত, সে অন্য কাউকে পছন্দ করে। তাহলে তার সঙ্গে থাকার আর এত চেষ্টা করতাম না।’

ঠিক তাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমন ঘটনাই ঘটে। সম্পর্ক ভাঙার ক্ষেত্রে সরাসরি আলোচনার বদলে বেশির ভাগ সময়ই পারস্পরিক দোষারোপের পথ বেছে নিতে দেখা যায়। আবার এই দোষারোপের খেলায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী হতে হয় নারীদেরই, যা শুরু হয় বিচ্ছেদের ঢের আগে, চলে অনেক দিন।

বিবাহবিচ্ছেদে বড় ভূমিকা পালন করছে সামাজিক অস্থিরতা। প্রতীকী ছবিআত্মসম্মান থেকে মুক্তি
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বিবাহবিচ্ছেদের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা তালাকের আবেদন বেশি জমা দিচ্ছেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তান্ইয়া নাহার মনে করেন, বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ার পেছনে সামাজিক অস্থিরতার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। মানুষ যেন কোনো কিছুতেই ঠিক স্থির হতে পারছে না। না কর্মজীবনে, না পড়াশোনায়, না সামাজিকতায় বা কোনো সম্পর্কে। সার্বিক এই অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। এ কথা ঠিক যে, বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার যে কারও থাকলেও আগের দিনে নারীরা বিচ্ছেদের দিকে যেতে চাইতেন না। এর মূল কারণটাই ছিল সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিকভাবে বিষয়টি সামাল দিতে না পারার সম্ভাবনা। আর এই কারণে স্বামীর পরকীয়া, ভরণপোষণে অবহেলা, শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার ও অসহযোগিতা, স্বামী কর্তৃক মারধর, অযৌক্তিক আচরণ ও খবরদারি, অক্ষমতা, জীবননাশের হুমকি স্ত্রীরা মুখ বুজে সহ্য করে সংসার করে গেছেন। আর এই মুখ বুজে থাকতেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বাহবা দিয়ে আসছে বহুকাল আগে থেকেই।

বর্তমান আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় নারীর মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করার দিন শেষ। দেশে এখন নারীবান্ধব আইন তৈরি হচ্ছে। নারীরা এখন নিজের সম্মান রক্ষার্থে সাহসী ভূমিকা পালন করছেন। অসুস্থ দাম্পত্য জীবন থেকে বের হয়ে বিচ্ছেদের দিকে হাঁটছেন। এটাকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ নারীরা নিজের ব্যক্তিজীবনকে বিষময় করে তুলবেন না, এই হলো মূল বিষয়। এমনটি মনে করেন আইনজীবী তান্ইয়া নাহার। তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে পুরুষদের ও তাদের পরিবারগুলোর করণীয় হলো নিজেদের মানোন্নয়ন। পুরুষতান্ত্রিক অত্যাচার ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বের হয়ে এসে নারীকে তার পূ্র্ণ মর্যাদাদান। অমন যারা পারেন, নিশ্চয়ই তাদের থেকে নারীরা বিচ্ছেদ চান না।’

অর্থনৈতিক ভিত্তি
নারীর জীবনে অর্থনৈতিক মুক্তি অনেক বড় একটি বিষয়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রতিকূল পরিবেশে নারীকে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে শেখায়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, অর্থনৈতিক মুক্তি নারীকে সাহস জোগায়। এই বিষয়টাকে অনেকে আবার ভাবতে পারেন, নারীরা স্বাধীন হয়েছে বলে দাম্পত্য জীবনের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা করছেন। বিষয়টা কিন্তু তা নয়। নারীরা আগে মুখ বুজে যে অত্যাচার সহ্য করতেন, এখন সেই অত্যাচার সহ্য করছেন না। এই অর্জন নারীদের ধীরে ধীরে হয়েছে। এটি সমাজের ইতিবাচক দিক। তবে এ ক্ষেত্রে নেতিবাচক দিক হলো সমাজের যে কারণগুলো নারীকে অবমাননা, অধস্তন করে রাখে সেই মন-মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। এ কারণে দুটি সাংঘর্ষিক বিষয় পাশাপাশি চলতে থাকার ফলে বিবাহবিচ্ছেদের হার বাড়ছে।

নারী-পুরুষের সম্পর্ক নির্ধারিত হয় ক্ষমতার অংশীদারত্ব থেকে। যেখানে ক্ষমতার অংশীদারত্ব পুরোটাই থাকে পুরুষের হাতে, সেখান থেকে সমাজের আইন, নিয়মকানুন তৈরি হচ্ছে। সে নিয়নকানুনের পথ ধরে নারীকে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমনটি মনে করেন ডা. ফওজিয়া মোসলেম। তিনি বলেন, ‘সমাজ যেহেতু একটা পরিবর্তিত পর্যায়ে আছে, তাই মনে হতে পারে নারীরা বেশি তালাক দিচ্ছেন। তবে এমন একটা দিন নিশ্চয়ই আসবে। যেদিন নারী–পুরুষের অংশীদারি সমান সমান হবে। সমাজ নারীকে মানুষ হিসেবে গণ্য করতে শিখবে। সেদিন হয়তো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে।’

বিবাহবিচ্ছেদে প্রয়োজন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ছবি: ফ্রিপিকপ্রয়োজন সহযোগিতা
বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর। তারা বেড়ে ওঠে ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান হিসেবে৷ এতে তারা এক ধরনের পরিচয় সংকটে ভোগে৷ এতে এসব পরিবারের সন্তানেরা মানসিক বিষণ্ণতায় ডুবে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইকোলজিস্ট ড. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘বিবাহবিচ্ছেদ বিষয়টাকে বুঝতে হলে আমরা এই ঘটনাকে কীভাবে দেখছি; অর্থাৎ, এই বিষয়ে আমাদের মনোভাব কী, সেটা জানা প্রয়োজন। বিবাহবিচ্ছেদ কি ইতিবাচক না নেতিবাচক? নাকি বিয়ে করার মতোই বিবাহবিচ্ছেদও একটা সামাজিক ঘটনা এটা আগে বুঝতে হবে।’

বিয়ে আসলে একটি সামাজিক প্রথা, যার ছবি প্রতিটি মানুষ তার মতো করে কল্পনা করে নেন। যেমন, একজন সঙ্গী কেমন হবে তা নিজের মতো করে মনের মধ্যে সাজিয়ে রাখেন। তারপর যাকে বিয়ে করেন, তাঁকে কল্পনার আসনে বসান। কিন্তু শেষে হয়তো দেখা গেল কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের অনেক অমিল। নিজেরাও বুঝতে পারেন না, অন্যজন তাঁকে কীভাবে কল্পনা করেছিলেন।

মনোবিদ ড. আজহারুল ইসলাম মনে করেন, এখন নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। তাই অসম্মানজনক সম্পর্কের যাঁতাকলে বন্দী না থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে বিবাহবিচ্ছেদে যাচ্ছেন। এটাকে সমাজের চরম ক্ষতিকর অবস্থা না ভেবে পরিবর্তিত সমাজের একটি অবস্থা হিসেবে দেখলেই বরং ভালো হবে। অবশ্য বিয়ের মতো একটা সম্পর্ক ভেঙে গেলে, ব্যক্তি মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে দিন কাটান। সন্তানদের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। এ সময় পরিবার বা নিকটজন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সহমর্মিতার হাত বাড়ালে ব্যক্তি ও তাঁর সন্তানদের জন্য ওই কঠিন সময়টা মোকাবিলা করা সহজ হবে।

হয়তো আপনার পরিচিত কোনো স্কুলপড়ুয়া মেয়ের ফেসবুক আইডি থেকে অদ্ভুত কিছু বার্তা পেলেন। অবাক হবেন না, হয়তো আপনার পরিচিত সেই মেয়েটি সাইবার অপরাধের নির্মম শিকার। এমন ভুয়া আইডি তৈরি করে বিভিন্নজনকে পাঠানো...
দেশে মোট শ্রমশক্তি সাত কোটির বেশি, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি নারী। যা এখন মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে অবদান বাড়লেও মজুরি আর মর্যাদায় এখনো পিছিয়ে নারীরা। কমেনি বৈষম্য। খাত...
গণিত অনেকের কাছেই কঠিন একটি বিষয়। সমীকরণ আর জটিল তত্ত্বে ভরা এই জগৎ অনেক সময় ভয়ও জাগায়। কিন্তু এই কঠিন বিষয়কেই নিজের ভালোবাসা আর মেধা দিয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মরিয়ম মির্জাখানি। তাঁর...
নারীর প্রতি ক্রমশ বাড়তে থাকা নিপীড়নের মধ্যে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যুদ্ধ, মানব পাচার আর সাইবার জগতে নারীর সুরক্ষায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বের...
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই টানটান উত্তেজনা, শেষ মুহূর্তের নাটক, আর কোটি ভক্তের স্বপ্নপূরণ। কিন্তু এর উল্টো পিঠটাও বড্ড নিষ্ঠুর। সেমিফাইনালের মহারণ শেষে আজ রাত ৩টায় আমেরিকার মায়ামিতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী...
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ম্যাচ খেলতে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে জাতীয় দলের দায়িত্বের...
গত বছরের ২৭ মে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। আরও গ্রেপ্তার হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ, শ্যুটার আরাফাত ও শরীফ। ২৪ এর ৫ আগস্টের পর একের পর এক হত্যাকাণ্ডে...
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর