নতুন বছরে কি কমবে নারীর প্রতি সহিংসতা

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৯:২১ এএম

চলছে জানুয়ারি মাস। নতুন বছর ঘিরে সকলের মধ্যেই নানা শঙ্কা ও সম্ভাবনা কাজ করে। নারীর ক্ষেত্রে বোধ হয় একটি নিরুপদ্রব বছর কাটানোর আকাঙ্ক্ষাই সবচেয়ে বেশি কাজ করে।

এ দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। নারীরা এই সমাজে এখনো অবহেলিত ও নির্যাতিত। এই অবহেলা, নির্যাতন বা শারীরিক ও মানসিক সহিংসতাই নারীর নতুন বছর ঘিরে আকাঙ্ক্ষার মানচিত্রটি এঁকে দেয় অলক্ষ্যে। অধিকার সচেতন–অসচেতন নির্বিশেষে নিজের অজান্তেই নারী এই আশা পোষণ করে যে, নতুন বছরে দেশের কোথাও যেন কোনো নারীকে নিপীড়নের শিকার হতে না হয়।

এ দেশে বছরের প্রায় প্রতিটি দিন কোনো না কোনো জায়গায় নারীরা নির্যাতনের শিকার হন। এই যে এখন লিখছি, এই সময়েও দেশের কোনো না কোনা জায়গায় সংগঠিত হচ্ছে নারী নির্যাতনের কোনো না কোনো ঘটনা। এখন আগের চেয়ে নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রগুলো বেড়েছে। নারীরা ঘরে–বাইরে, কর্মস্থলে, পরিবহন—সব জায়গায় সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। আগে যখন নারীরা ঘর থেকে বের হতেন না, তখন পরিবারেই সহিংসতার শিকার হতেন। এখন সবখানেই নারীরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। 

২০২৩ সালে নারী নির্যাতনের ঘটনা তার আগের বছরগুলোর মতো একই হারে হয়েছে বলা যায়। এর কিছু কিছু ঘটনার প্রতিবাদ, আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ সহিংসতার ঘটনায় অপরাধীরা ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিচারহীনতা, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমাগত বেড়েছে। 

এখন নারীর প্রতি সহিংসতার ধরনও বদলেছে। ২০২৩ সালেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। গত বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন, গৃহবধূর শরীরে কেরোসিন, পেট্রোল ঢেলে আগুন, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, বেআইনি সালিশে বর্বরভাবে বেত্রাঘাত ও পাথর নিক্ষেপ, স্কুলছাত্রী, কলেজছাত্রী, গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা, ধর্ষণের পর পুড়িয়ে হত্যাসহ নানা ঘটনা ঘটেছে। 

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০২৩ সালে ৬২৩টি নারী ও ৭৬৮টি শিশু ও কিশোরীর যৌন নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৩১টি। এ ছাড়া  ১১৭ জন নারী দলগত ধর্ষণ, ১৬ জন নারী ধর্ষণ-হত্যা ও ১৪৯ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। অ্যাসিড নিক্ষেপে আক্রান্ত হয়েছেন ১০ জন নারী। এ ছাড়া ৭২ জন প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে ৪২ জন প্রতিবন্ধী নারী ও শিশু অন্যান্য সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গত বছর মোট ২৮টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সমাজপতিরা আপস করেছেন। এসব ঘটনায় সমাজপতিরা প্রচলিত আইনকে অবজ্ঞা করে বেআইনিভাবে সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করেছেন, যা একদিকে নির্যাতককে সুবিধা দিয়েছে, আর নির্যাতিতকে করেছে অপমান।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামাল বলেন, 'নারীদের বাস্তব জীবন এবং মনোজগত—উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন এবং উত্তরণ ঘটেছে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে সেটা খুব সহজে হয়নি। নারীদের নানা প্রতিকূল অবস্থার সাথে সংগ্রাম করে এই অবস্থানে আসতে হয়েছে। সামগ্রিকভাবে দেশ ও সমাজের নানা শক্তি কখনো তাদের সমর্থন দিয়েছে বটে। তবে অধিকাংশ সময়েই নারী স্বাধীনতা ও নারী অধিকার, বিশেষত নারীর সম–অধিকারের প্রতি বৈরিতা ছিল প্রবল। এর মূল কারণ, সময়ে সময়ে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে সমস্ত অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য যে সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক ছিল, রাষ্ট্র পরিচালকেরা সে কাজটি আন্তরিকতার সঙ্গে করেননি। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দল নির্বিশেষে অনেকেই নারীবিদ্বেষী এবং নারীমুক্তির বিপক্ষের শক্তির সঙ্গে আপস করে গেছেন। ফলে শত চেষ্টা সত্ত্বেও নারীর প্রতি সহিংসতা কমানো বা বন্ধ করা অথবা নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে সন্তোষজনক পর্যায়ে আমরা পৌঁছতে পারিনি।' 

সুলতানা কামাল মনে করেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হলে নারীর স্বপক্ষে প্রণীত প্রচলিত যে আইন, সেই আইন যেন ঠিকমতো বাস্তবায়িত হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন বাতিল করে অভিন্ন পারিবারিক বা দেওয়ানি আইন প্রণয়ন করতে হবে। নারীর সুরক্ষায় যে আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।  এ ছাড়া সিডও'র  সংরক্ষিত ধারাগুলো থেকে সংরক্ষণ তুলে নিতে হবে। শিক্ষা এবং সামাজিক সংস্কৃতিতে নারীর প্রতি সম্মান বৃদ্ধি ও নারী অধিকার স্বীকার করে—এমন মনোভাব গড়ে তোলার জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মূল দায়িত্ব সরকারের। নাগরিক সমাজ ও সংগঠনগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। 

দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে যথেষ্ট কঠোর আইন রয়েছে। তা সত্ত্বেও প্রশাসন অপরাধ দমনে ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে না। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২৩ সালের নারী ও কন্যা নির্যাতন বিষয়ক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২৯৩৭ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৩৯ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন,  ৬৯ জন কন্যাসহ ১৪০ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২৫ জন কন্যাসহ ৩৪ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।  ৯ জন কন্যাসহ ১৪ জন ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে। পাশাপাশি ৬৮ জন কন্যাসহ ৯৮ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১৪৯ জন, উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন ৯৩ জন। এ ছাড়া যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১২২ জন। এর মধ্যে ৫২ জনকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ২৩১ জন। পারিবারিক সহিংসতায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩২ জন। 

নারীর প্রতি সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে। আগের দিনে নারীদের ঘর থেকে বের হওয়া কঠিন ছিল। নারীরা এখন ঘর থেকে বের হচ্ছেন, চাকরি করছেন, পর্বত জয় করছেন, ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য অর্জন করছে। সুতরাং উপযুক্ত পরিবেশ পেলে নারীরা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এমনটি মনে করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ড. তানিয়া মনে করেন, নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করতে সবার আগে পারিবারিক সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শৈশবে পরিবার থেকে যে শিক্ষা দেওয়া হয়, সেটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। তাই অভিভাবকেরা কীভাবে সন্তানকে শিক্ষা দেবেন, তা বইয়ে লিপিবদ্ধ করা দরকার। প্যারেন্টিং সন্তানের জীবনের অনেক বেশি ভূমিকা রাখে। তানিয়া বলেন, ‘আমি মনে করি ১০ থেকে ১৪ বছরের পর মানুষের মানসিক উন্নতি হয় না। মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শৈশব। মানুষের আচার–আচরণ তার বেড়ে ওঠার পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। শিক্ষাব্যবস্থা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সময়েই সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক মনে করেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির যুগে আমরা খুব সহজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় কীভাবে একে অপরকে খুন, অপহরণ বা নির্যাতন করবে, তা শিখছি। আমরা নারী নির্যাতন বন্ধে চিৎকার করলেও নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের বিভিন্ন মাধ্যম বন্ধ করছি না।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ড. তানিয়া হক আরও বলেন, ‘ঘর হচ্ছে মানুষের উত্তরণের জায়গা। ঘর মানে পরিবার, এরপর পরিবারে মাধ্যমে সমাজ। পরিবারের পর মানুষকে শিক্ষার দ্বার খুলে দেয় সমাজ। নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে এ দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো দরকার। নারীর প্রতি সহিংসতা কারা করছে? হয়তো কিছু পুরুষ এসব কাজ করছে। এই কিছু পুরুষ কোথা থেকে এসব শিখছে? তারা শিখছে তাদের পরিবার বা সমাজ থেকে। পরিবারের সদস্যরা যদি তাকে শেখায় তোমার ঘরে মা, বোন আছেন। তাদের সম্মান করবে। সে পুরুষ যদি মা আর বোনকে সম্মান করতে শেখে, তাহলে বাইরের একজন নারীকেও সম্মান করতে শিখবে। নারীকে সম্মান করা শিখলে সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতাও কমবে।'

হয়তো আপনার পরিচিত কোনো স্কুলপড়ুয়া মেয়ের ফেসবুক আইডি থেকে অদ্ভুত কিছু বার্তা পেলেন। অবাক হবেন না, হয়তো আপনার পরিচিত সেই মেয়েটি সাইবার অপরাধের নির্মম শিকার। এমন ভুয়া আইডি তৈরি করে বিভিন্নজনকে পাঠানো...
দেশে মোট শ্রমশক্তি সাত কোটির বেশি, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি নারী। যা এখন মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে অবদান বাড়লেও মজুরি আর মর্যাদায় এখনো পিছিয়ে নারীরা। কমেনি বৈষম্য। খাত...
গণিত অনেকের কাছেই কঠিন একটি বিষয়। সমীকরণ আর জটিল তত্ত্বে ভরা এই জগৎ অনেক সময় ভয়ও জাগায়। কিন্তু এই কঠিন বিষয়কেই নিজের ভালোবাসা আর মেধা দিয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মরিয়ম মির্জাখানি। তাঁর...
নারীর প্রতি ক্রমশ বাড়তে থাকা নিপীড়নের মধ্যে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যুদ্ধ, মানব পাচার আর সাইবার জগতে নারীর সুরক্ষায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বের...
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই টানটান উত্তেজনা, শেষ মুহূর্তের নাটক, আর কোটি ভক্তের স্বপ্নপূরণ। কিন্তু এর উল্টো পিঠটাও বড্ড নিষ্ঠুর। সেমিফাইনালের মহারণ শেষে আজ রাত ৩টায় আমেরিকার মায়ামিতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী...
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ম্যাচ খেলতে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে জাতীয় দলের দায়িত্বের...
গত বছরের ২৭ মে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। আরও গ্রেপ্তার হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ, শ্যুটার আরাফাত ও শরীফ। ২৪ এর ৫ আগস্টের পর একের পর এক হত্যাকাণ্ডে...
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর