একাত্তরে ৩০ লাখ বাঙালি প্রাণ দিলেও, বিশ্বের অন্য অনেক গণহত্যার মতো মেলেনি এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আর এর কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রসহ তখনকার বড় কিছু দেশের ভূমিকাকে দায়ী করেছেন ইতিহাসবিদ ও গবেষকেরা। তাঁরা বলছেন, এ স্বীকৃতি আদায়ে দূতাবাসের সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি বাড়াতে হবে ইংরেজি ভাষায় গবেষণাগ্রন্থের সংখ্যা।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, নাৎসিদের হাতে। তাতে হত্যা করা হয় প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষকে। এর পরেই আছে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম। এ দুই দেশেই গণহত্যার শিকার প্রায় ৩০ লাখ করে মানুষ। এ ছাড়াও বড় হত্যার নজির আছে কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা, সুদান থেকে শুরু করে আর্মেনিয়ান গণহত্যায়।
এসব গণহত্যা নিয়ে বিশ্ব পরিসরে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হলেও, প্রায় আলোচনার বাইরে একাত্তরে পাকিস্তানিদের সংগঠিত নৃসংশ হত্যাকাণ্ড। ইতিহাসবিদ ও গবেষকেরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় কিছু দেশের সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়ানোই এর প্রধান কারণ।
ইতিহাসবিদ ও গণহত্যা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘দুঃখের বিষয় পৃথিবীতে রুয়ান্ডার গণহত্যা পাবেন, কম্বোডিয়ার গণহত্যা পাবেন, বাংলাদেশের গণহত্যা অনুপস্থিত। এর কারণটা কী? কারণটা হচ্ছে এই গণহত্যায় ভারত ছাড়া এবং পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া সবাই বাংলাদেশের বিপক্ষে ছিল। আমেরিকা যেমন এখন ইজরায়েলকে সমর্থন করছে, পাকিস্তানকে সেইভাবে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছে। তখন তাদের মনে হয়েছিল যদি কখনও যুদ্ধাপরাধ বিচারের কথা ওঠে তখনতো তাদেরকেও দায়ী করা হবে।’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের গণহত্যা বিস্মৃত গণহত্যায় পরিণত হবার কারণ জাতীয়ভাবে যদি আমরা দেখি, বাংলাদেশ নানা রকম উদ্যোগ নিয়েছিল। দালাল আইন প্রণয়ন হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইন ১৯৭৩ সালে সংসদে গৃহীত হয়েছে। প্রসিকিউশন টিম তৈরি হয়েছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে সব পাল্টে গেল। দীর্ঘ সময় কিন্তু আমরা মুক্তিযুদ্ধের অস্বীকৃতি, গণহত্যার অস্বীকৃতি, মুক্তিযুদ্ধকে তাচ্ছিল্য করা, ৩০ লক্ষ মানুষ মারা যায়নি এরকম অর্বাচীন উক্তি করা-এসবের মধ্য দিয়ে গেছি।’
এ অবস্থায় বাংলাদেশকে গণহত্যার স্বীকৃতি পেতে হলে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব হেগের নিয়ম মেনে এগোতে হবে বলে উল্লেখ করেন গণহত্যা বিশেষজ্ঞ ড. এম এ হাসান। এ ছাড়াও লাগবে পর্যাপ্ত গবেষণা। তিনি বলেন, ‘৮৮টি নদী, ৬৮টা ব্রিজেরও বেশি ব্যবহার করা হয়েছে প্রতি দিন আমাদের লোকেদের ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য। যা কিনা টোটাল হত্যার ৭০ ভাগ। অর্থাৎ ৭০ ভাগ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমরা যদি পাঁচ লাখ হাড়ও পাই তাহলে এই পাঁচ লাখ হলো ৩০ শতাংশ। পাঁচ লাখ যদি ৩০ শতাংশ হয় হান্ড্রেড পারসেন্ট কত হয় হিসেব করুন। ১.২ মিলিয়ন মানুষ যারা রিফিউজি ক্যাম্পে গেছে, পথে পথে যাওয়ার সময় মারা গেছে, ইন্টারনালি ডিসপ্লেস ছিল দুই কোটি তাদের মাঝে মারা গেছে, বিভিন্ন ক্যাম্পে মারা গেছে, রোগে শোকে মারা গেছে এবং পথে রাজাকারদের দ্বারা এসটেকুলেট বা ধর্ষণের মাধ্যমে মারা গেছে, কেউ আত্মহত্যা করেছে ধর্ষিতা হয়েছে তার সংখ্যা হল ১.২ মিলিয়ন। ১.৮ প্লাস ১.২ দ্যাট মেকস থ্রি মিলিয়ন। এটিই হলো একাত্তরের টোটাল হত্যার চিত্র।’
তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মাধ্যমে কিছু গুণগত পরিবর্তনও দেখছেন তারা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সভা-সেমিনার, সম্মেলন, গণহত্যা জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ প্রতিষ্ঠাসহ নানাভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে একাত্তরের গণহত্যা উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে জানিয়ে এর প্রতিফলনও দেখছেন তারা।
মফিদুল হক আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের সেরকম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিদানের পদ্ধতি নেই। কিন্তু নানা দেশের পার্লামেন্টে, যেটা আর্মেনিয়ানরা করেছে যে তারা বিভিন্ন প্রস্তাব এনেছে, সেটা নিয়ে আমরা কাজ করতে পারি। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করেছে। এটা যখন আমরা পালন করি তখন তা দেশে এবং দেশের বাইরে কিন্তু এর মাধ্যমেও বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয়টিকে নিয়ে যেতে পারি।’
একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর ভুমিকা বাড়ানোর পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশের ওপরও জোর দিচ্ছেন গবেষকেরা।
আরও পড়ুন:



