দেশ যখন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা অরাজকতার কবলে পড়ে, তখন সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন সে দেশের নারী ও শিশুরা। যেমন আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছি লক্ষ লক্ষ নারী নির্যাতিত হয়েছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশেও যখনই কোনো নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তখনই নারীকে নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে বিশেষ করে ৫ আগস্ট বিকেলের পর থেকে দেশে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যে ধ্বংসযজ্ঞে অগ্নিসংযোগ আর লুটপাট শুরু হয়েছে, তাতে জানা যাচ্ছে রাজধানীর কোনো কোনো এলাকাসহ শহরতলি ও গ্রামাঞ্চলে নারীরা খুবই বিপন্ন অবস্থায় আছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু নারীরা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে আছেন।
কোনো একটা আন্দোলনের সফলতায় আন্দোলনকারীরা আনন্দ উচ্ছ্বাস করতেই পারে। তাতে বিশৃঙ্খলাও কিছুটা তৈরি হতে পারে। কিন্তু ৫ আগস্ট বিকেলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বানের জলের মতো ঢুকে পড়েছে গর্তে লুকিয়ে থাকা হাজার হাজার দুর্বৃত্ত ও লুটেরা গোষ্ঠী। তারা দেশজুড়ে এক তাণ্ডব শুরু করেছে। তাদের কারণে চাপা পড়ে গেছে কয়েকশো পরিবারের সন্তান ও স্বজন হারানোর বিলাপ। মাটির নিচে চাপা পড়েছে কয়েক’শ মায়ের সন্তান হারানোর বেদনা।
অবোধ শিশু ছিলাম বলে ১৯৭১ এর স্বাধীনতা অর্জনের বিজয় উল্লাস দেখিনি। তবে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার এরশাদ পতনের পর নিজের ছোট্ট শহরে সামনে থেকে আর টেলিভিশনে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বিজয় উৎসব দেখেছি। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ বিএনপি, সিপিবিসহ বিভিন্ন বামধারার সংগঠনের নেতাদের পাশাপাশি ছাত্র তরুণেরাও সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
কিন্তু তারুণ্যের সেই বিজয় উল্লাসের উচ্ছ্বাসের সঙ্গে কোনো পৈশাচিক বর্বরতা, সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের দৃশ্য দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। মনে আছে স্বৈরাচার পতনের পরে আমার ছোট্ট শহরের পাবলিক লাইব্রেরির পাশের মুক্ত মঞ্চের সামনে প্রতিদিন বিকাল থেকে বিভিন্ন সংগঠন এর শিল্পীরা কবিতা আবৃত্তি, সংগীত ও নাটক পরিবেশন করতেন। প্রবীণ রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা এবং যুব নেতাগণ মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও পূর্ববর্তী আন্দোলনের ইতিহাস অবলম্বনে প্রেরণাদায়ী বক্তব্য রাখতেন। বিজয় উৎসব এভাবেই উদ্যাপিত হয়েছিল। শহরের আনন্দমুখর পরিবেশ কী যে একটা উদ্দীপনায় তরুণদের সৃষ্টিশীল কাজে ব্যাপৃত করেছিল। এখন তা আর ভাবাও যায় না।
১৯৯৬ সালেও তৎকালীন বিএনপি সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র জনতা পেশাজীবীদের সম্মিলিত প্রতিবাদী আন্দোলনে যখন সরকারের পতন হয়েছিল তখনকার বিজয় মিছিল দেখেছি কিন্তু এমন পৈশাচিক বর্বরতা, সহিংসতা অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের দৃশ্য দেখা যায়নি। কারণ এদেশের মানুষ তখনও এতটা অসভ্য বর্বর ও সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেনি। কিন্তু ২০০১ সালের অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের পর রাজনীতিতে বিশেষ করে একটা নির্বাচন বা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সংখ্যালঘুর মন্দিরে, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট,ধর্ষণ,ধর্ষণের পর হত্যার সংস্কৃতি চালু করল বিএনপি–জামাতের কর্মী সংগঠক ও সমর্থকেরা।
গোল্ডফিশের মগজ না হলে কারো ভোলার কথা নয় সিরাজগঞ্জের পূর্ণিমা শীল কিংবা বরিশালের এগারো বছর বয়সী সেই মেয়েটির নৃশংসভাবে নির্যাতিত হওয়ার কথা। সেই বছর বাগেরহাটের কোমরপুরের ভট্টাচার্য বাড়িতে একই সময়ে একদল বর্বর স্ত্রীকে ধর্ষণ করছিল যতক্ষণ না পর্যন্ত আরেকদল নরঘাতক তার বরকে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করছিল। সেই অক্টোবর মাস জুড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হামলা অগ্নিসংযোগে আক্রান্ত হয়ে জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচাতে হাজার হাজার সংখ্যালঘু মানুষ দেশ ছেড়েছিল আর দেশ ছাড়তে না পেরে কত কত মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি সহায় সম্পদ ফেলে আশেপাশের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বলে রাখা ভালো সেই ২০০১ এর ভয়াবহ অক্টোবরের লোমহর্ষক ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর যশোরের অভয়নগরের হিন্দু পল্লিতে।
এই যে নির্বাচনের পর বা ক্ষমতার পালাবদলের ক্রান্তিলগ্নে বিজয়ী বা পরাজিত যে কোনো গোষ্ঠী সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুসম্প্রদায়ের বাড়িঘরে আক্রমণ চালায় তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ এর ৫ আগস্ট থেকেই শুরু হয়ে গেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুর ওপর অত্যাচার নির্যাতন অগ্নিসংযোগ লুঠপাট ও দখলবাজি। ফেসবুক জুড়ে এখন ভেসে বেড়াচ্ছে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার এক নারীর আর্তচিৎকার, কোথাও আরেক তরুণী বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছেন। একজন হাউমাউ করে কাঁদছেন তাদের সব শেষ হয়ে গেছে বলে।
সিলেটে দেখলাম একটি বাড়ি জ্বলছে, সেই বাড়ির মানুষগুলো পালিয়ে গেছেন এক কাপড়ে। মুন্সীগঞ্জে এক মুখার্জী পরিবারের নারী জানিয়েছেন তাদের জুয়েলারি দোকান লুটপাট করে নিয়ে সেই দোকানের দখলও নিয়েছে হামলাকারীরা। পাশাপাশি পরিবারের লোকগুলোকে হুমকি দিচ্ছে। এতে তারা খুবই আতঙ্কের মধ্যে আছেন।
নেত্রকোণায় হাওরাঞ্চলের গ্রামে এক শিক্ষক দম্পতির বাড়িতে ঢুকে তাদের মারধর করে সব কিছু লুটে নিয়ে গেছে দুবৃত্তের দল। দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ উপজেলার শনকাই গ্রামের এক মহিলার আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তিনি বলছেন তাদের পুরো গ্রাম, বাজারের দোকানপাট জ্বালিয়ে দিয়েছে। এখন বাঁচার জন্য তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। চট্টগ্রাম শহরে ও গ্রামে অনেক হিন্দুবাড়িঘরেও আগুন লাগানো হয়েছে। প্রায় সবখানেই আক্রান্ত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে থেকে নারীগণ আর্ত চিৎকার করে বলছেন তারা পালিয়ে আছেন। কিন্তু তাদেরকে উদ্ধার করার কেউ নেই। কারণ আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর অনুপস্থিতিতে সারা দেশে সর্বত্র একটা নৈরাজ্য বিরাজ করছে।
এমতাবস্থায় সংখ্যালঘুর ঘরবাড়ি ছাড়াও দেশের সর্বত্র ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ লুটপাট চলছে। তবে সেসব হামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য। কিন্তু হিন্দুদের মন্দিরে, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আক্রমণের কারণ তারা সংখ্যালঘু এবং তারা নিরীহ। আক্রমণকারীরা জানে তাদেরকে আক্রমণ করলে দেশ ছেড়ে পালাবে, তখন তাদের ঘরবাড়ি সহায় সম্পত্তি দখল করা যাবে।
পরিস্থিতি যে সংকটাপন্ন সেটা সহজেই অনুমেয়। আর তাতে বিশেষ করে হিন্দু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীগণ ভয়াবহ রকমের ঝুঁকিতে আছেন। এখন পর্যন্ত যতগুলো ঘটনার খবর পাওয়া গেছে, তাতে প্রায় সবখানেই অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও মারধরের কথা শোনা গেছে।
এ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে কে কাকে আশ্রয় দেবে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি অবিলম্বে নিরীহ মানুষের জানমাল রক্ষায় এগিয়ে না আসে তাহলে দুর্বৃত্তরা তাদের সহিংসতার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিবে। তাই পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আগে অবিলম্বে পুলিশবাহিনীকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি আন্দোলনকারী ছাত্র, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে নিজ নিজ এলাকায় সকল প্রকার অরাজকতা, সহিংসতা, লুটপাট ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে দুর্বৃত্তদের মোকাবেলা করতে হবে।
যে দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে এত বড় সফল আন্দোলন হল তার পরিণতিতে এমন দুর্বৃত্তপনা ও জুলুম সহ্য করা যায় না।


আর যেন পথ না হারায় বাংলাদেশ
আসুন, একটু কাঁদি
