বাজারে নতুন মডেলের স্মার্টফোন এলেই একটা হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। এই তো কিছুদিন আগেই আইফোন ১৬ বাজারে আসার সাথে সাথে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো। শুধু আইফোন কেন, অন্য ব্র্যান্ডগুলোর নতুন মডেল নিয়েও একই ধরনের একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায়। সামর্থ্য অনুযায়ী যে যার মতো ছুটছে। কিন্তু এই ছোটাছুটির কতটা প্রয়োজনের তাগিদে, আর কতটা ভোগবাদী আকাঙ্ক্ষা থেকে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মুক্তবাজার অর্থনীতির দুটি মূল উপাদান হলো চাহিদা ও যোগান। এই দুটিকে ঘিরেই আবর্তিত হয় অর্থনীতির চাকা। পণ্যের দামও নির্ধারিত হয় এ দুইয়ের ভিত্তিতেই। চাহিদা–যোগানের এই সম্পর্ক অবশ্য আদি থেকেই। তবে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বদল আসার পর এ দুইয়ের সম্পর্কটি একটা নতুন রূপ নিয়েছে। সেটা কেমন?
এখন ব্যক্তির চাহিদাও অন্য আর দশটা পণ্যের মতো উৎপাদন করা যায়। অর্থাৎ, চাহিদার স্বার্থে পণ্যের উৎপাদন নয়, চাহিদা নিজেই উৎপাদিত হচ্ছে। আজকের উদারনৈতিক অর্থ ব্যবস্থায় সৃষ্ট কৃত্রিম এ চাহিদা তথাকথিত যে ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন’-কে নির্দেশ করে তার মূলে রয়েছে প্রধানত ভোগবাদী চিন্তা-চেতনার এক ‘খেয়ালী’ উদযাপন। এখানে ভোক্তার সত্যিকারের ‘প্রয়োজন’ প্রাধান্য পায় কমই, বরং পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে সুসংহত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
ভোক্তার মনে কৃত্রিম চাহিদা উৎপন্ন করে সেই চাহিদার যোগান দিতে যে উৎপাদন ব্যবস্থাকে দাঁড় করানো হয়েছে, প্রযুক্তি বিশ্বে তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে স্মার্টফোনের বৈশ্বিক বাজার। প্রযুক্তির ‘বৈপ্লবিক’ উৎকর্ষতার দোহাই দিয়ে প্রতি বছর নিত্যনতুন সব স্মার্টফোন গছিয়ে দেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটা ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘নির্দোষ’ মনে হলেও নৈতিকতার নিরিখে কতটা সমর্থনযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে পাঠকের অনুসন্ধিৎসু মন নৈতিক অ-সমর্থনের প্রেক্ষিতগুলো জানতে আগ্রহী হবে সেটাই স্বাভাবিক।
গত দু’মাসেরও কম সময়ে বিশ্বের ৪টি প্রথম সারির স্মার্টফোন নির্মাতা বাজারে এনেছে চলতি বছরে তাঁদের সবচেয়ে আলোচিত স্মার্টফোনগুলো। ২৪ জুলাই স্যামসাং উন্মোচন করে ২টি ফোল্ডিং হ্যান্ডসেট- জেড ফ্লিপ৬ ও জেড ফোল্ড৬। গুগল পিক্সেলের সাম্প্রতিক সংস্করণ পিক্সেল ৯‑এর পর্দা উঠেছে ২২ আগস্ট। এরপর গত ৯ সেপ্টেম্বর ঘটা করে ‘ইটস গ্লোটাইম’ ইভেন্টের মাধ্যমে অ্যাপল নিয়ে এসেছে আইফোন ১৬ সিরিজ।
তবে বছরের এই স্মার্টফোন মৌসুমের ষোলোকলা পূর্ণ হয়েছে তার পরদিন হুয়াওয়ের মেট এক্সটি স্মার্টফোনটির আগমনের মধ্য দিয়ে। আইফোন ১৬ উন্মোচনের ১২ ঘণ্টার মধ্যেই হুয়াওয়ে হাজির হয় মেট এক্সটি নিয়ে, যাকে বিশ্বের প্রথম ট্রাই-ফোল্ডিং হ্যান্ডসেট দাবি করছে চীনা প্রতিষ্ঠানটি।
কতটা ‘মার্কেটিং’ আর কতটা ‘গিমিক’?
অ্যাপল তাদের আইফোন ১৬ উন্মোচনের ইভেন্টের নাম দিয়েছে ‘ইটস গ্লোটাইম’। এই নামকরণের সাথে আইফোন ১৬ সিরিজের ফিচারগুলোর সম্পর্ক কত, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। একটা সম্পর্ক অবশ্য খুঁজে পাওয়া যেতে পারে ডিজিটাল অ্যাসিসট্যান্ট সিরি’তে। আইওএস ১৮ আসার পর এবার থেকে ‘সিরি’ চালু হওয়ার সময় কিছুক্ষণের জন্য স্ক্রিনের চারপাশ নানা রঙে আলোকিত হয়ে উঠবে (বা গ্লো করবে)। সিরি’র এই নতুন ‘লুক’ প্রথম সামনে আসে গত জুনে এআই প্ল্যাটফর্ম ‘অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স’ লঞ্চ করার সময়। যেহেতু আইফোন ১৬ সিরিজ’কে অ্যাপল এআই ফোন হিসেবে প্রচার করছে, ‘গ্লোটাইম’ নামকরণের সাথে এআই-এর সম্পর্কও থাকতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আইফোন ১৬ সিরিজের ফিচারগুলো কি আসলেই ব্যবহারকারীদের স্মার্টফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে আমূল বদলে দেবে। অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী (সিইও) টিম কুক অবশ্য এমনটাই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ভদ্রলোকের প্রতিশ্রুতি সত্যি হলে, একটি স্মার্টফোন কী করতে পারে, তা ‘রিডিফাইন’ (বা নতুন করে সংজ্ঞায়িত) করবে আইফোন ১৬ সিরিজের ফোনগুলো। আসলেই কি তাই? সে আলোচনায় একটু পরে আসছি।
পিক্সেল ৯ নিয়ে গুগল যে প্রচার চালিয়েছে, যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাস্তবের সাথে তার দূরত্ব রয়ে গেছে অনেকটাই। বিশেষ করে এর ডিজাইনে অসাধারণ কিছু খুঁজে পাননি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অনেকেই। এদিকে হুয়াওয়ের মেট এক্সটি স্মার্টফোনটিকে ট্রিপল-ফোল্ডিং বা থ্রি-ফোল্ড হ্যান্ডসেট বলা হলেও বাস্তবে এটা দুবারই ভাঁজ (ফোল্ড) করা যায়, তিনবার নয়। ডিসপ্লে ৩টি থাকলেও কেন এই ফোনটিকে টু-ফোল্ড বলা হচ্ছে না, এটা আসলেই আমার বোধগম্য নয়।
এবার চলুন মেট এক্সটির প্রচারে ব্যবহৃত কিছু শব্দগুচ্ছ নিয়ে আলোচনা করা যাক। গণমাধ্যমে এই স্মার্টফোনটিকে হুয়াওয়ে তুলে ধরেছে ঠিক এভাবে–(মেট এক্সটি)... স্বপ্ন বাস্তবায়নের ইচ্ছেকে বলিষ্ঠভাবে প্রকাশ করে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের বিশ্বাস থেকেই উদ্ভূত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিটি যুগান্তকারী সাফল্য–(মেট এক্সটি ফোনটি) এই বিষয়টিকেই হাইলাইট করে।
অনেকেই বলতে পারেন এমন অতিরঞ্জিত শব্দচয়ন এখন যেকোনো পণ্যের প্রচার বা প্রোমোশনের স্ট্যান্ডার্ড ভাষা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এমন ভাষা প্রোয়োগে সৃষ্ট ‘হাইপ’-এর কারণে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কিনা, আর পড়লে সেটা কতটা।
স্মার্টফোনের সামাজিক প্রভাব
ফোনের মূল কাজ হলো কথা বলা এবং ম্যাসেজ (এসএমএস) আদানপ্রদান করা। কিন্তু স্মার্টফোনের আবির্ভাবের পর থেকে ক্যামেরার মতো আধুনিক ফিচারগুলোও জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এর সাথে যুক্ত হয় বিভিন্ন কাজের জন্য নানাবিধ অ্যাপ্লিকেশন। তবে আইফোন আসার পর স্মার্টফোন প্রযুক্তিতে আক্ষরিক অর্থেই নতুন এক যুগের সূচনা হয়েছে। তবে স্টিভ জবসের নেতৃত্বে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আইফোন, সামাজিক জীবনে তার যেমন ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে নেতিবাচকও।
আইফোনকে কেন্দ্র করে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজে ‘শ্রেণিভেদ’ যেভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে, সেটা অন্য কোনো প্রযুক্তি পণ্যের কারণে নিকট অতীতে অন্তত দেখা যায়নি। সমাজের অভিজাত শ্রেণির এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে আইফোনের মতো প্রিমিয়াম স্মার্টফোনগুলো।
ভোগবাদী অর্থনীতিতে বিদ্যমান এই সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো ব্যক্তি সাধারণের অবচেতন মনে এতটাই শক্তভাবে প্রোথিত যে, শ্রেণিভেদের এই নিত্য অনুশীলন সমাজে আর দশটা আটপৌরে ঘটনার মতোই প্রতীয়মান হয়। মজার বিষয় হচ্ছে, আইফোন ব্যবহারকারীদের নিজেদের মধ্যেও ‘জেনারেশন গ্যাপ’-কে কেন্দ্র করে চলে আভিজাত্যের ভেদাভেদ। ফলে আইফোন ১১‑এর সাথে আইফোন ১৬‑এর তুলনা এখন আর শুধু ফিচারে সীমাবদ্ধ নেই। একই প্রতিষ্ঠানের একই ব্র্যান্ডের দুটি ফোনের তুলনার পরিপ্রেক্ষিতে এখন সামাজিক স্ট্যাটাসেও তারতম্য ঘটে।
প্রিমিয়াম স্মার্টফোন কেনার উদগ্র বাসনা
গত ২০ সেপ্টেম্বর আইফোন ১৬ এবং হুয়াওয়ের মেট এক্সটি, এই দুটো স্মার্টফোনেরই বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রিমিয়াম দুটি স্মার্টফোন নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে আগ্রহ থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই আগ্রহের মাত্রা কতটা, সেটা বুঝতে হলে আপনার কথা বলতে হবে ভারতের মুম্বাইয়ের উজ্জ্বল শাহ নামের একজন আইফোন গ্রাহকের সাথে। এই ভদ্রলোক ২১ ঘণ্টা টানা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন শুধু সবার আগে অ্যাপলের আউটলেটে প্রবেশ করবেন এবং পছন্দের আইফোনটি কিনবেন বলে। এখানে উল্লেখ করতে হয়, গত বছরও আইফোন কেনার জন্য তিনি ঠিক এভাবেই উৎসাহের সাথে রাত জেগে লাইনে অপেক্ষা করেছেন। উজ্জ্বল শাহ’র মতো আরও অনেকেই মুম্বাইতে অ্যাপল আউটলেটের সামনে রাত জেগে লাইনে অপেক্ষা করেছেন আইফোন ১৬ কেনার জন্য।
প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে চীনে হুয়াওয়ের আউটলেটগুলোর সামনে। অনেকেই আগের রাত থেকে লাইনে অপেক্ষা করেছেন মেট এক্সটি স্মার্টফোনটি কেনার জন্য। এরপর সকালে হুয়াওয়ের তরফ থেকে ‘প্রি-অর্ডার ছাড়া ফোনটি কেনা যাবে না’ জানানোর পর অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন।
সারারাত লাইনে দাঁড়ানোটাকে যদি নিছক ‘পাগলামি’ বলেন তাহলে ভারতের রাজধানী দিল্লীর শাকারপুরের ঘটনাটিকে কী বলবেন। গতকাল (২৪ সেপ্টেম্বর) শাকারপুরে শচীন নামের ১৬ বছরের এক কিশোর আইফোন কিনে ফেরার পথে বন্ধুদেরকে ‘ট্রিট’ না দেওয়ায় এক বন্ধুর ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন। আমি বলছি না এই হত্যার দায় অ্যাপলের। কিন্তু স্মার্টফোনের মতো একটি ইলেক্ট্রিনিক্স ডিভাইসকে সমাজে স্ট্যাটাস তৈরি বা রক্ষার প্রতীকে পরিণত করার সমন্বিত দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।
এআই থেকে রেহাই নেই
২০২২ সালের নভেম্বরে ওপেনএআই চ্যাটজিপিটি নামক চ্যাটবটটি আনার পর থেকেই প্রযুক্তি জগতে দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা বেড়েছে। আর বাজারের ‘জনপ্রিয়’ চাহিদার সেরা ও অভিনব যোগান দিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে টেক জায়ান্টরাও। বিস্তর বিনিয়োগও করেছে। ফলে লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেল দ্বারা প্রশিক্ষিত জেনারেটিভ এআই-ভিত্তিক নিত্যনতুন সব টুল ও ফিচারের আগমন এখন প্রায় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
শুরুতে যে ৪টি প্রতিষ্ঠানের ‘ফ্ল্যাগশিপ’ স্মার্টফোনের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটিতেই এআই-ভিত্তিক বিভিন্ন ফিচারকে অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে প্রোমোট করা হয়েছে। এআই ফিচারের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে হয়তো আইফোন ১৬। কারণ, অ্যাপল নিজেই নতুন আইফোনকে এআই ফোন হিসেবে অভিহিত করছে।
কোনো সন্দেহ নেই, অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সের কল্যাণে বেশ কিছু এআই-ভিত্তিক ফিচার যুক্ত করা হয়েছে নতুন আইফোনে, যার পুরোটা বোঝা যাবে আগামী মাসে আইওএস ১৮.১‑এর ফাইনাল ভার্সনটি রিলিজের পর। তবে আইওএস ১৮-এর কল্যাণে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু এআই ফিচার অ্যাক্সেস করা যাচ্ছে। নতুন আইফোনে চ্যাটজিপিটি ইন্টিগ্রেট থাকায় ডিজিটাল অ্যাসিসট্যান্ট ‘সিরি’ আগের চেয়ে আরও বেশি স্মার্ট হয়েছে এবং এটি এখন আগের চেয়ে আরও ভালোভাবে ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেস করতে সক্ষম। পিক্সেল ৯‑এর ক্ষেত্রে গুগল জেমিনি একইভাবে আরও বেশি কার্যকর হয়েছে।
মোটা দাগে বললে, ফোনগুলোতে এআই-প্রযুক্তির কল্যাণে কল সামারি তৈরি, ই-মেইলের সামারি তৈরির পাশাপাশি টেক্সট ও ইমেজ জেনারেট করার সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই কাজগুলো ইতোমধ্যেই চ্যাটজিপিটির মতো জেনারেটিভ এআইভিত্তিক বিভিন্ন চ্যাটবটে করা যায়। এখানে ‘জবসীয়’ (স্টিভ জবসের মতো) কোনো বৈপ্লবিক উদ্ভাবন চোখে পড়েনি।
হ্যাঁ, ক্যামেরা’তে বেশ কিছু আকর্ষণীয় এআই ফিচার এসেছে। গুগলের ম্যাজিক এডিটরের মতো অ্যাপ ব্যবহার করে ছবিতে এআই জেনারেটেড কোনো উপাদান যেমন যোগ করা যাচ্ছে, তেমনি ছবির অনাকাঙ্ক্ষিত একটি অংশ বাদও দেওয়া যাচ্ছে।
নিঃসন্দেহে নিত্যনতুন এআই ফিচারের কল্যাণে ব্যবহারকারীদের কাছে স্মার্টফোন আগের চেয়ে আরও বেশি উপভোগ্য হয়ে উঠবে। কিন্তু সেজন্য প্রতি বছর স্মার্টফোন পরিবর্তন করা কতটা যুক্তিযুক্ত সেটা ভাববার বিষয়। বিশেষ করে অপারেটিং সিস্টেম আপডেটের মাধ্যমে পুরোনো ভার্সনগুলোতে নতুন ফিচার ব্যবহারের সুযোগ যখন করে দেওয়া সম্ভব, তখন প্রতি বছর ‘না কিনলে হারাবেন’ ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ তৈরি করা ভোগবাদী অর্থ ব্যবস্থার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলেই প্রতীয়মান হয়।
সাধারণ ব্যবহারকারীরা আসলে কী চায়
এআই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার ভিত্তি ও সত্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু স্মার্টফোনে ব্যবহারকারীরা আসলে কী চায়, তাদের প্রত্যাশার তালিকায় এআই-এর অবস্থানই‑বা কোথায়, সেটা জানা জরুরি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিসিএস ইনসাইট-এর মোবাইল ফোন বিশেষজ্ঞ বেন উডের মতে, এআই-ভিত্তিক ফিচারগুলোর লক্ষ্য ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল লাইফকে আরও সহজ করে তোলা হলেও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের সকলের প্রত্যাশার তালিকায় প্রথম স্থানে এআই থাকবে বিষয়টি একেবারেই এমন নয়। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি যে বেশির ভাগ মানুষই এখন জানে একটি ফোন থেকে সে কী চায়, যার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ক্যামেরা।’
স্মার্টফোন প্রতিষ্ঠানগুলোও যথারীতি ক্যামেরাতে নিত্যনতুন ফিচার যুক্ত করতে ব্যতিব্যস্ত থাকে। আর কিছু হোক না হোক, নতুন ফোনে এর আগের ভার্সনের ক্যামেরার চেয়ে উন্নত ক্যামেরা থাকবে–এটা এখন প্রায় অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
তবে ক্যামেরার মতো সব ক্ষেত্রেই যে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহারকারীদের ভালো-মন্দ দিকগুলো বিবেচনা করে ফোন বাজারে আনেন, এমনটা বলা যাবে না। বিভিন্ন ফিচার তৈরির সময় শিশু-কিশোরদের ওপর তার প্রভাব কতটা পড়বে সেটা নিয়ে কি আদৌ ভাবা হয়–এ নিয়ে আলাদা পরিসরে আলোচনা হতে পারে।
২০২৩ সালে বছরে স্মার্টফোনের বিক্রি ৩০ মিলিয়ন হলেও এখন সংখ্যাটা অর্ধেকেরও কম। এর একটা কারণ অবশ্যই এই যে, স্মার্টফোনের বাজার এখন আগের অনেক বেশি পরিণত, ফলে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি কোনোভাবেই আশা করা যায় না। এই প্রেক্ষাপটে স্মার্টফোন নির্মাতাদের মূল লক্ষ্যই হয়ে উঠেছে পুরাতন ফোন থেকে গ্রাহকদের নতুন ফোনের দিকে ধাবিত করা। মার্কেটিং কৌশলও সেভাবেই সাজানো হয়।
এআই ফিচারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, তাই স্মার্টফোন নির্মাতারাও নিয়ে আসছেন এআই ফিচার। কিন্তু এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, সেটা যেমন নির্মাতারাও বলছেন না, তেমনি ব্যবহারকারীরাও জানতে পারছেন না, বা জানলেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অথচ এআই প্রযুক্তির জন্য তৈরি ডেটা সেন্টারগুলো থেকে যে পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হয়, সেটা ঠান্ডা রাখার জন্য প্রতিদিন বিশাল পরিমাণ পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এক হিসাব অনুযায়ী, ডেটা সেন্টারগুলোতে ঘণ্টায় ১ কিলোওয়াট এনার্জি ব্যবহার করার জন্য ৯ লিটার পানি প্রয়োজন হয়।
এ ছাড়া স্মার্টফোনগুলোতে ব্যবহৃত উন্নতমানের সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরিতে পৃথিবীর বিভিন্ন রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট (বা বিরল মৃত্তিকা ধাতু) ব্যবহার করা হয়, যেগুলোর বিকল্প কোনো ধাতু এখনো পৃথিবীতে পাওয়া যায়নি। ফলে এক অর্থে স্মার্টফোনের মতো ডিভাইস বেশি বেশি ব্যবহার করে আমরা কি প্রকারান্তরে পৃথিবীর মূল্যবান সম্পদ দ্রুত নিঃশেষ হতে অবদান রাখছি না?
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই পাঠককে প্রযুক্তি-বিমুখ করে তোলা নয়। এগিয়ে যেতে হলে অবশ্যই আধুনিক প্রযুক্তিকে ধারণ করতে হবে, ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাস্তবতা এবং নৈতিকতার সীমারেখা সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। আর এ জন্য কয়েকটি সরল প্রশ্নের উত্তর জানা অতীব জরুরি। প্রশ্নগুলো হতে পারে এই রকম: সামর্থ্য থাকলেও আইফোনের মতো প্রিমিয়াম স্মার্টফোন কি সকলের প্রয়োজন? যাদের প্রয়োজন তাদের ক্ষেত্রেও প্রতিবছর স্মার্টফোন পরিবর্তন করা কতটা যুক্তিযুক্ত? স্মার্টফোনের মতো স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘প্রয়োজন’ আর ‘উদযাপনের’ মধ্যে কোনটির প্রাধান্য পাওয়া উচিত? এবং স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারে নৈতিক মূল্যবোধের উপস্থিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
তথ্যসূত্র: বিবিসি, ফোর্বস



