অনেক হিসাব বদলে এবং তারও চেয়ে অনেক বেশি কিছু বদলে দেওয়ার বার্তা নিয়ে হোয়াইট হাউসে পুনঃপ্রবেশ করতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ৫ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোটের ম্যাজিক ফিগার পেরিয়ে গেছেন। ফলে মার্কিন মসনদে ‘বালক রাজা’র প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত।
ঘটন‑অঘটন পটিয়সী ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানেই থাকেন, সেখানেই আলোচনার জন্ম দেন। আর এই ব্যক্তি যখন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রশাসনিক দপ্তরে বসেন, তখন আলোচনা নিজেই জন্ম নেয়। এ ক্ষেত্রে তাঁর তেমন কিছু না করলেও চলে।
সাবেক এই আবাসন ব্যবসায়ী সবকিছুকেই বিচার করেন ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে। এর সাথে যখন যুক্ত হয় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ, অভিবাসনবিরোধিতা, জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দেওয়া, অতি ধনীদের ওপর উচ্চ করারোপের বিরোধিতা, মার্কিন গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠানকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দেওয়া, এফবিআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদির মতো বিষয়, তখন নড়েচড়ে বসা ছাড়া আর উপায় কী।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ২০১৭‑২০২১ মেয়াদে গোটা মার্কিন প্রশাসনকে খেয়ালি রাজার দপ্তরে পরিণত করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তাঁর বিখ্যাত টিভি শো ‘দ্য অ্যাপ্রেনটিস’‑এ তিনি যেভাবে কথায় কথায় ‘ইউ আর ফায়ারড’ শব্দত্রয়ী উচ্চারণ করতেন, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পরও সে অভ্যাস ছাড়েননি। পুরো মেয়াদেই তিনি হোয়াইট হাউসে ছাঁটাই ও নিয়োগ অব্যাহত রেখেছিলেন। একজন খেয়ালি রাজার মতোই নিজের মতের সাথে না মিললেই ছাঁটাই করেছেন যাকে‑তাকে।
তখন ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই একের পর এক নির্বাহী আদেশে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মেয়াদে নেওয়া নানা পদক্ষেপ হয় বাতিল করেছেন, নয়তো স্থগিত করেছেন। এ তালিকা থেকে বাদ যায়নি ড্রিমার প্রকল্প, স্বাস্থ্য খাতে নেওয়া ওবামাকেয়ারের মতো জনহিতকর প্রকল্পও। প্রথম রাতেই ছয় মুসলিম দেশ থেকে অভিবাসী গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তাঁর ওই মেয়াদে একে একে প্যারিস চুক্তি, ইরানের সাথে ছয় জাতি চুক্তি থেকে সরে আসে আমেরিকা। ন্যাটো, নাফটার মতো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলোও পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেন তিনি।
এবারও কি তেমন কিছু হতে যাচ্ছে? প্রশ্নটি অনেক দিন ধরেই ঘুরছে। কারণ, মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর জনমত জরিপ যাই বলুক না কেন, দুটি যুদ্ধ মার্কিনিদের পরিবর্তনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে রেখেছিল। আর তাদের সামনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ, কমলা নিজেই এই প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ছিলেন, যা কিনা দুটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যুক্ত হয়েছে। এমনকি আমেরিকার ভেতরে গড়ে ওঠা যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকে দমনও করেছে।
ফলে প্রশ্নটি সামনে আসবেই। আর এ প্রশ্নের উত্তর ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই দিয়েছেন নির্বাচনী প্রচারকালে। উইসকনসিনে এক প্রচারাভিযানে তিনি সরাসরি বলেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বড় বদল আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। তাঁর ভাষ্য–মিত্ররা আমাদের খুবই বাজেভাবে ব্যবহার করেছে। আমাদের সঙ্গে মিত্রদের আচরণ আমাদের শত্রুদের চেয়েও খারাপ। সামরিকভাবে আমরা তাদের সহায়তা করি। কিন্তু তারা বাণিজ্য খাতে আমাদের সাথে অন্যায় করে তার প্রতিদান দেয়। এমনটি আমরা আর হতে দিতে পারি না।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ভক্স বলছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ভাষ্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট অনেক বদল আনতে পারেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তি থেকে প্রেসিডেন্ট চাইলে বেরিয়ে যেতে পারেন। তবে কিছু চুক্তি আছে, যা থেকে বেরিয়ে যেতে হলে প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদন লাগে। ট্রাম্প এরই মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন। আর কে না জানে ডোনাল্ড ট্রাম্প আর যাই হোক, প্রতিশ্রুতি রাখেন।
এই বদলের বহু নমুনা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে উপস্থিত। উপরন্তু এবার সিনেটেও রিপাবলিকান পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। এমনকি প্রতিনিধি পরিষদেও তারাই হয়তো নেতৃত্বে থাকবে। ফলে ট্রাম্পের জন্য বদলের কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
মনে রাখা জরুরি যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে এবারও মুখ্য বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন–আমেরিকা ফার্স্ট। এই নীতি অনুসরণ করেই আগের মেয়াদে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বহু আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। চীনের সাথে হওয়া বহুল আলোচিত ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ও হয়েছিল এই নীতি মেনেই। শুধু আমেরিকার পয়সা খসছে–এই কারণ দেখিয়ে মিত্রদের দেওয়া নিরাপত্তা গ্যারান্টি তুলে নেওয়ার পথে হাঁটা শুরু করেছিলেন তিনি।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন অনেক আন্তর্জাতিক হিসাবই হয়তো বদলে দেবে। এর মধ্যে সবার আগে বলতে হয় ইউক্রেন যুদ্ধের কথা। এ বিষয়ে তিনি বহু আগেই বলেছেন যে, হোয়াইট হাউসে তিনি থাকলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হয়তো ইউক্রেনে অভিযানই চালাতেন না। এই সংকট তিনি এখনো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান করতে পারেন। শুধু তাই নয়, ইউক্রেন যুদ্ধজুড়েই তিনি প্রতিনিয়ত বাইডেন প্রশাসনের নীতির সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত।
এই ভাষ্য থেকে এটা পরিষ্কার যে, ইউক্রেন যুদ্ধে ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত যেভাবে অর্থ ও সমর সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, তাতে ভাটা পড়বে নিশ্চিতভাবে। পুরো বিষয়টা নির্ভর করবে ন্যাটোর ওপর। তবে এ জোটকে তখন ইউক্রেন ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অনীহাকে বিবেচনায় রেখেই এগোতে হবে। সে সক্ষমতা ইউরোপের বাকি দেশগুলোর অতটা নেই, এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার ন্যাটোর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এই যুদ্ধ আর দীর্ঘায়িত করতে ইচ্ছুক না; কিন্তু পাছে আমেরিকা চটে যায়–এই ভয়ে বলতে পারছে না।
এ ক্ষেত্রে বলে রাখা দরকার যে, নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগেই ন্যাটো ইস্যুতে ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ন্যাটো মিত্রদের নিরাপত্তায় অসীম ব্যয় করতে তিনি রাজি নন। বরং ন্যাটো মিত্রদের সাথে রাশিয়া চাইলে যা কিছু করুক, তা নিয়ে তিনি আর মাথা ঘামাতে রাজি নন।
না, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ন্যাটো প্রশ্নে হয়তো এতটা কঠোর তিনি হতে পারবেন না। তবে ন্যাটোর এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়ায় তাঁর তীব্র অনীহা থাকবে–এটা নিশ্চিত।
আসা যাক ইসরায়েল প্রশ্নে। এ ক্ষেত্রে বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে তেমন কোনো ফারাক নেই। এ ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়ে ইভানকা ট্রাম্পের বর জ্যারেড কুশনারের মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে তৎপরতাকে মাথায় রাখলেই বিষয়টি বোঝা যাবে। সেখানে ট্রাম্পনীতি পরিষ্কার–ইসরায়েলকে খুশি রাখ। এবং বিশেষত প্রকাশ্য মিত্র ইসরায়েলের সাথে আরেক মিত্র সৌদি আরবের গাটছড়া বাঁধার কাজেই বরং তাঁর প্রশাসনের আগ্রহ বেশি থাকবে। তেমনটি ঘটলে ইরান এখনকার চেয়েও বেশি চাপে থাকবে, সন্দেহ নেই। মনে রাখা দরকার, ইরানের কমান্ডার কাসেমি হত্যা কিন্তু বিগত ট্রাম্প জমানাতেই হয়েছিল।
ফলে ইসরায়েলের সমরায়ন ও ফিলিস্তিনের ভোগান্তি–কোনোটাই কমার তেমন আশা আপাতত নেই। ট্রাম্প বরং চাইবেন–হামাসকে দ্রুত নির্মূল করে যুদ্ধের একটা রফা হোক। তবে যেহেতু তিনি মানবাধিকার রক্ষাকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলে মনে করেন না, সেহেতু গাজাসহ ফিলিস্তিনে মানবিক সহায়তায় মার্কিন ব্যয়ে টান পড়তে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে চীন। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের মেয়াদে ট্রাম্প আবারও চীনের সাথে বাণিজ্যে যুদ্ধের পন্থাতেই এগোতে পারেন। অত্যাধিক শুল্কারোপের নীতিতেই তাঁর প্রশাসন ফিরতে পারে। তবে তাইওয়ান বা দক্ষিণ কোরিয়া প্রশ্নে তাঁর প্রশাসন ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করতে পারে। ট্রাম্প এরই মধ্যে জানিয়ে রেখেছেন যে, তিনি মনে করেন তাইওয়ানের উচিত নিরাপত্তার জন্য আমেরিকাকে পয়সা দেওয়া। অর্থাৎ, আমেরিকার যুদ্ধ ইঞ্জিনে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে।
আগের মেয়াদে দেখা গেছে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) মোকাবিলায় ট্রাম্প সামরিক স্থাপনা ও আক্রমণের পথে না হেঁটে শুল্কারোপের লাইন ধরেছেন। সাথে ছিল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। এবারও তার ব্যত্যয় না ঘটার সম্ভাবনাই বেশি।
চীন ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান বেশ মিশ্র। তিনি সোজাসাপটা ভাষায় চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রশংসা করেন তাঁর ‘লৌহনেতৃত্ব’ ও ‘মেধার’ জন্য। আবার চীনের বাণিজ্যনীতি নিয়ে, বিশেষত সস্তা পণ্য নিয়ে তাঁর ক্ষোভও অত্যধিক। শুল্ক আরোপের মধ্য দিয়ে তিনি এই সস্তা পণ্যের বাজারই সংকুচিত করতে চান। প্রথম মেয়াদে চীনে কারখানা থাকা মার্কিন কোম্পানিগুলোকেও চেপে ধরেছিলেন। এবারও তার থেকে আলাদা কিছু হওয়ার কথা নয়। এখানেই এসে টের পাওয়া যায়–কেন ইলন মাস্ক ট্রাম্পকে এত পছন্দ করেন। মাস্কের টেসলার সস্তা সংস্করণ দিয়ে ইউরোপের বাজার চীন দখল করছে। স্বাভাবিকভাবেই মাস্ক এটি পছন্দ করেন না। এ ক্ষেত্রেই দুজনের নীতি মিলে যায়।
বন্ধু হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে আরেকটি স্বস্তি দিতেই পারেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে ভারত প্রশ্নে মার্কিন নীতিটি ঠিক হবে ট্রাম্পের শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মনোভূমিতেই। বাড়তি সুবিধা নয়, বরং চীনকে সামাল দিতে প্রয়োজনীয় বাণিজ্য সমঝোতাই হতে পারে এ ক্ষেত্রে তাঁর নীতি। এর বাইরে এশিয়া বা আফ্রিকার মতো অঞ্চলে থাকা ছোট ছোট পকেটগুলোতে মার্কিন নীতি ব্যয় সংকোচন নীতিতেই পরিচালিত হবে। অর্থাগমের বিষয়াদিই মুখ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভূ-রাজনৈতিক কৌশল বিবেচনায় কোনো অঞ্চলে সম্প্রদান কারকে কোনো আর্থিক সমর্থন দেওয়াটা তাঁর ধাতে নেই।
সব মিলিয়ে হোয়াইট হাউসে বালক রাজার প্রত্যাবর্তনে গোটা বিশ্বের নড়চড়ে বসায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, আগের মেয়াদ সাক্ষ্য দিচ্ছে তাঁর খেয়ালি নেতৃত্ব অনেক কিছু ওলট‑পালট করে দিতে পারে। গোটা বিশ্বে সামরিক বিবেচনায় বা কোনো তত্ত্ব বা মানবাধিকার প্রশ্নে নয়, তাঁর বিবেচনায় আমেরিকা শ্রেষ্ঠ হবে বিত্ত‑বৈভবে এবং সেই সূত্রেই বাণিজ্যে। তাঁর অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি এই পথ ধরেই এগোবে–সন্দেহ নেই। এর সাথে তাঁর কিছু শিশুসুলভ আচরণকে আমলে নিলে বলতে হয়–আসছে মেয়াদে অর্থবহ বদল কিছু হলেও অনর্থও যে অনেক ঘটতে পারে, তার জন্য সবার প্রস্তুত থাকাই ভালো। কারণ, এরই মধ্যে ট্রাম্পের মগজ হিসেবে খ্যাত স্টিভ ব্যানন বলেছেন–আগের মতো ছাড় দেওয়া হবে না। ছয় মাস জেল খেটে মুক্ত হওয়া ব্যাননের এই বাক্যের অর্থ অনেক কিছুই হতে পারে।
লেখক: উপ বার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


আসছে আবার পাগলা ঘোড়া (ট্রাম্প)
