২০১৮ সাল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আরোহণের মোটে বছর পার হয়েছে। তবে নিজের পাগলাটে স্বভাব ততদিনে সবাইকেই জানাতে সমর্থ হয়েছেন তিনি। সেটা এতটাই যে, এক প্রিয়জন ঘরোয়া আড্ডায় বলেই ফেললেন যে, ট্রাম্পকে দেখলেই তাঁর নাকি শৈশবে পড়া একটি ছড়া বা কবিতার লাইন মনে পড়ে। তা হলো, ‘আসছে আমার পাগলা ঘোড়া...’!
এই ছড়া আমরা অনেকেই পড়েছি। পুরোটা হলো:
আম পাতা জোড়া-জোড়া,
মারবো চাবুক চড়বো ঘোড়া।
ওরে বুবু সরে দাঁড়া,
আসছে আমার পাগলা ঘোড়া।
পাগলা ঘোড়া ক্ষেপেছে,
চাবুক ছুঁড়ে মেরেছে।
তো, ট্রাম্পকে দেখলেই পাগলা ঘোড়ার কথা মাথায় আসার কারণ জিজ্ঞেস করায় ওই প্রিয়জন বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ট্রাম্পের ‘পাগলাটে’ কর্মকাণ্ডই যত নষ্টের গোড়া। ট্রাম্প ওই সময় একদিন সৌদি যুবরাজকে মাথায় তুলছিলেন, তো পরদিনই খাসোগির হত্যার ক্রীড়নক বানাচ্ছিলেন। হুট করে গিয়ে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের সঙ্গে কোলাকুলি করছিলেন, রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনকে জড়িয়েও ধরছিলেন। আবার মাঝে মাঝেই এমন সব পরিবর্তনের কথা বলছিলেন, মার্কিন মুলুকে যা উচ্চারণও হয়নি বহুকাল!
সব মিলিয়ে ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়কালে একেবারে উথাল–পাথাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল ট্রাম্পের আমেরিকায়। এবার ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ফের সেই পরিস্থিতি ফিরে আসার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে কি আসছে আবার পাগলা ঘোড়া?
হ্যাঁ, এখনও পর্যন্ত ইলেকটোরাল কলেজের ভোটে অনেক এগিয়ে ট্রাম্প। তিনি যে ফের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন, তা প্রায় নিশ্চিত। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও বাকি যে। আর ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে শুধু আমেরিকা কেন, পুরো বিশ্বেই আবার হুলুস্থুল লেগে যেতে পারে। অন্তত নিরপেক্ষ বিশ্লেষকেরা তেমনটাই মনে করেন।
সেটা কেমন হবে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণের আগেই ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট কিনা, সেই বিতর্ক উঠে গিয়েছিল। এই বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে বিস্তর আলাপ–আলোচনা চলেছে এবং এখনও চলছে। বিশেষ করে ২০২১ সালে ক্যাপিটল হিলে ঘটে যাওয়া মবের আক্রমণে নেতৃত্ব দেওয়ার পর এই আলোচনা আরও তীব্র হয়। ফ্যাসিবাদে প্রবল প্রতাপশালী ক্যারিশমাটিক নেতার আবির্ভাবের যে বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তার সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিল পাওয়া যায় অনেকটাই।
আবার উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রচারেও ট্রাম্প এগিয়ে আছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় আমেরিকায় এ সংক্রান্ত চিন্তা–ভাবনার ব্যাপক প্রসার লক্ষ্যণীয় ছিল। দেশকে বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্ব এনে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি তিনি এবার এবং আগেও দিয়েছেন, সেটি ফ্যাসিস্ট নেতারই লক্ষণ বটে। ফ্যাসিবাদে সব সময়ই মহিমান্বিত অতীতকে ফিরিয়ে আনার বা তা নির্মাণের স্বপ্ন দেখানো হয়। ট্রাম্প এটি আগেও করেছেন এবং এখনও করছেন। ফলে এদিক থেকেও ফ্যাসিবাদী লক্ষণের তীব্রতা ট্রাম্পের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প যেভাবে বিরোধী মত দমনে সামরিক বাহিনী ব্যবহারের কথা বলেছেন, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অপমানজনক মন্তব্য করছেন, যেকোনো মতভিন্নতাকে কোণঠাসা করার কথা বলেছেন, নির্বাচনী কর্মকর্তার বিচার করার বা বিচার বিভাগকে ছিন্নভিন্ন করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তাতে ফ্যাসিবাদী অনেক লক্ষণই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সুতরাং, আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষিত হওয়ার পর এটি বলাই যায় যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকায় ফ্যাসিস্ট নেতার শাসন ফিরিয়ে আনতে চলেছেন। যদিও নেতা ফ্যাসিস্ট হলেই সরকার ফ্যাসিস্ট হয় না পুরোপুরি। তবে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগেরবারের চেয়ে আরও মরিয়া ও বেপরোয়া হওয়ার শঙ্কা আছে। কারণ বয়স ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই রাজনীতির মঞ্চে এটিই ট্রাম্পের শেষ অধ্যায়। আর শেষটা যে তিনি নিজের মতো রাঙাতে চাইবেনই, তা আর বলতে!
আর ট্রাম্পের মতো জনতুষ্টিবাদী রাজনৈতিক নেতা যখন আমেরিকার মতো প্রভাবশালী দেশের প্রেসিডেন্ট হন, তাও একবার হারের পর আবার দ্বিতীয় দফায়—তখন পুরো বিশ্বকে নীরব দর্শক হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ট্রাম্প ফের প্রেসিডেন্ট হওয়ার অর্থ কী? অর্থ হলো, উত্তর কোরিয়ায় কিম জং উন সুখে থাকবেন। স্বস্তিতে থাকবেন রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন। ভারতের নরেন্দ্র মোদিও আরামে থাকবেন। অর্থাৎ, সারা বিশ্বের জনতুষ্টিবাদী নেতারা বোধ করবেন ব্যাপক প্রতাপ। কারণ যখনই তারা নৈতিক বিরোধিতার সম্মুখীন হবেন, তখনই আমেরিকার ট্রাম্পকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে তারা পার পাওয়ার চেষ্টা করতে পারবেন।
ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলে আগের বারের মতোই একটি প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রিক আমেরিকাকে দেখবে বিশ্ব। এই আমেরিকা বিশ্বমোড়ল হওয়ার চেয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতেই বেশি তৎপর থাকবে। একজন তুমুল পুঁজিবাদী ব্যবসায়ী ট্রাম্প পুরো বিশ্বে পুঁজিবাদ ও ভোগবাদকে আরও শক্তিশালী করতে যে কাজ করে যাবেন, তা নিয়ে সন্দেহ নেই একেবারেই। সেই শক্তিশালীকরণের ক্ষেত্রেও সবার আগে নিশ্চিত করা হবে মার্কিন লাভ। গণতন্ত্রের সবক দিয়ে মুখে ফেনা তোলা আমেরিকা এখন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আগের মতো হস্তক্ষেপ করা থেকে সরে আসতে পারে অনেকটাই। কারণ দেশটির পরবর্তী প্রেসিডেন্টই যে বহুমুখী ও বহুবৈচিত্র্যের কথা বলা গণতন্ত্রকে পাত্তা দেন না মোটেও!
প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ইরানের সঙ্গে হওয়া পরমাণু চুক্তি থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট ঘোষিত হওয়ার পর ট্রাম্প আরও কিছু বৈশ্বিক চুক্তি থেকে বের হয়ে যাবেন বলে শঙ্কা আছে। যেমন, প্যারিস ক্লাইমেট অ্যাকর্ড থেকে বের হয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি আগেভাগেই দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। জাতিসংঘ ও এর বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থাকে করা মার্কিন সহায়তাও তিনি কমিয়ে দিতে পারেন উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশনের মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলো এক্ষেত্রে বিপদে পড়তে পারে। ন্যাটো’র প্রতিও এই মার্কিন নেতার সুনজর খুব একটা নেই। ফলে প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফাতেও ট্রাম্প ন্যাটো’র প্রতি বিমাতাসুলভ হয়ে উঠতে পারেন। এবং তাতে বিপদে পড়তে পারে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ অনেক দেশই। আর ট্রাম্প তো বলেই রেখেছেন যে, ক্ষমতা পেলে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করে দেবেন মোটে ২৪ ঘন্টায়!
সব মিলিয়ে আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতি সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিতে বড়সড় পরিবর্তন আনতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোন দেশের প্রতি আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতির দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে, তা চাইলে বদলে দিতে পারেন যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট। পদের কারণেই এই ক্ষমতা আমেরিকার যে কোনো প্রেসিডেন্টের থাকে। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এমনতর ওলট–পালট যে করবেনই, সে ব্যাপারে বিশ্লেষকেরা মোটামুটি নিঃসংশয়। এক্ষেত্রে তিনি হয়তো সম্ভাব্য বিপর্যয়কর পরিণতিরও ধার ধারবেন না!
আর আমেরিকার ভেতরে চলবে পাগলামির রোলার কোস্টার। দেশটির সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে। সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে। উদার অভিবাসন নীতি ক্রমশ নিপীড়নমূলক হয়ে উঠতে পারে। বন্দুক সহিংসতা বিরোধী আইন বাতিল হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এলজিবিটিকিউ’দের অধিকারের দাবি হয়তো অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। আরও কঠোর হয়ে উঠতে পারে গর্ভপাতবিরোধী আইনও। আর যারা ট্রাম্পের বিরোধিতায় রাস্তায় নামবেন, তাদের হয়তো মুখোমুখি হতে হবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সরকারের চালানো দমনমূলক নীতির মার্কিন সংস্করণের সঙ্গে!
অর্থাৎ, শৈশবে পড়া ছড়ার মতো এখন আওড়ানোই যায় যে, ‘…আসছে আমার পাগলা ঘোড়া’! এবার আপনি রাস্তার একপাশে সরে দাঁড়িয়ে নীরব দর্শক হবেন, নাকি ক্ষেপে যাওয়া পাগলা ঘোড়ার ছুঁড়ে মারা চাবুকের সামনে দাঁড়াবেন—তা যার যার বিবেচনার বিষয়!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



