নতুন করে আলোচনাটা গত নভেম্বরে শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেতার পর রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে আমেরিকায় যান কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। এরপর আলোচনা হয় নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্পের বহুল আলোচিত শুল্ক আরোপের ইস্যু নিয়ে। তাতে কানাডা সংকটে পড়বে জানালে ট্রুডোর কাছে ট্রাম্প প্রস্তাব করেন, তাহলে কানাডা আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য হয়ে যাক!
সেই থেকে এখন অবধি কানাডার এই ইস্যু নিয়ে আলোচনা চলছেই। মাঝে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন জাস্টিন ট্রুডো। তখনও এই ইস্যু সামনে আনেন ট্রাম্প। এমন এক সময়ে আলোচনাটা ডালপালা মেলছে, যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর তাঁর পাগলাটে কথাবার্তার কারণে সংকটে রয়েছে কানাডাও। আবার না আমেরিকার অধীনে চলে যেতে হয়!
এ অবস্থায় কয়েকটি প্রশ্ন আসছেই। ট্রাম্প কি কানাডাকে দখলে নিয়ে নেবেন? এই সুযোগ কী রয়েছে? সুযোগ থাকলে সেটি কেমন হতে পারে? এ ব্যাপারে আমেরিকার ইতিহাসই‑বা কী বলছে?
ইতিহাস কথা বলে
সময়টা ১৮৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি। মেক্সিকোর সঙ্গে আমেরিকার সংঘাত কেবল শেষ হয়েছে। ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সার অ্যান্ড ওয়াশিংটন অ্যাডভারটাইজার নামক তৎকালীন প্রখ্যাত মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরের শিরোনাম ছিল এমন, ‘আমরা বিজয়ের মাধ্যমে কোনোকিছু পেলাম না…স্রষ্টাকে ধন্যবাদ।’
সংবাদমাধ্যম এশিয়া টাইমস বলছে, আমেরিকানদের অন্যতম লাভজনক সংঘাত হলো এই মেক্সিকো যুদ্ধ। ১৮৪৬ থেকে ১৮৪৮ সালের মধ্যে সংঘটিত মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধটি হলো বিদেশের মাটিতে আমেরিকার প্রথম যুদ্ধ। বলা হয়ে থাকে এই সংঘাত ছিল রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও অপ্রস্তুত মেক্সিকোর বিরুদ্ধে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেমস কে পোকের চাপিয়ে দেওয়া একটি যুদ্ধ।
এর উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার সীমানাকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করা। তৎকালীন আমেরিকা ও মেক্সিকোর মধ্যবর্তী রিও গ্র্যান্ডে যুদ্ধ শুরু হয় এবং যুদ্ধে একে একে আমেরিকা জিততে থাকে। চূড়ান্তভাবে জয়ী হওয়ার পর মেক্সিকোর ভূখণ্ডের ৩ ভাগের ১ ভাগ আমেরিকার দখলে চলে আসে।
আসলে সেটি জয় ছিল না। গুয়াদালুপে হিডালগো নামের এক চুক্তি বা সন্ধির কল্যাণে তখনকার ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারে মেক্সিকোর ৫৫ শতাংশ এলাকা নিজেদের করে নেয় আমেরিকা। এতে আমেরিকার লাভ তো হয়ই, হাজারো প্রাণের রক্তপাতও বন্ধ হয়।
এটাকে আমেরিকার বিজয় বলা যাবে কি‑না, সে ব্যাপারে দ্বিমত থাকতে পারে। তবে ‘ন্যায্য অধিকার’ দাবি করে যে অন্যদের জায়গা দখল করা যায়, সেই চিত্র ইতিহাসে আঁকা হয়ে থাকবে। এই সন্ধির কল্যাণেই আজকের ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, উটাহ, নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনা, কলোরাডো, ওকলাহোমা, কানসাস ও ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্য দখলে নেয় আমেরিকা। এসব এলাকা মেক্সিকোর অংশ ছিল।
এবার তাহলে কানাডা?
মেক্সিকোর এই যুদ্ধের দিকে কানাডাবাসী ও দেশটির সরকারকে নজর দেওয়া উচিত বলেই মনে করছেন ডালহৌস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক রবার্ট হুইসকে। এ নিয়ে সাম্প্রতিক আলাপও সে কথাই বলছে।
ভিডিও দেখুন:সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘কানাডা ও আমেরিকা এক হবে। কানাডার অনেক মানুষ আমাদের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হতে চায়। কানাডাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি ও ভর্তুকির চাপ আমেরিকা নেবে না। জাস্টিন ট্রুডো এটা জানতেন। তাই তিনি পদত্যাগ করেছেন।’
এমনকি কানাডাকে যুক্ত করে আমেরিকার নতুন মানচিত্রও প্রকাশ করেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মানচিত্রের ছবি প্রকাশ করে নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘ওহ কানাডা’। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
তবে কানাডাকে অঙ্গরাজ্য হওয়ার যে প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছেন, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। তিনি বলেছেন, ‘কানাডা কখনো আমেরিকার অঙ্গরাজ্য হবে না।’
তবে ট্রাম্প কানাডাকে হয়তো ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানাবেন না। এর পরিবর্তে কিছু এলাকা নিয়ে নিতে পারেন। এমনটা অসম্ভব নয় বলেই মনে করছেন ডালহৌস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিসের অধ্যাপক রবার্ট হুইসকে। এশিয়া টাইমসের এক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, আমেরিকার একটি অঞ্চল হয়ে যেতে পারে কানাডা। তাতে এর বাসিন্দারা প্রেসিডেন্ট কিংবা কংগ্রেসে ভোট দিতে পারবেন না। এতে থাকবে সায়ত্তশাসনের অনুমোদন। আমেরিকার আইনও কিন্তু এই পথ রেখেছে ট্রাম্পের জন্য। আগে আইনের বাইরের দিক দেখা যাক।
আইনের বাইরে যে সুযোগ
এই ইস্যুতে ২০১৮ সালেই বিশদ আকারে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল সংবাদমাধ্যম পলিটিকো। তাতে বলা হয়, আমেরিকা-কানাডা সম্পর্ক মধুর বলে যারা মনে করছেন, তাঁরা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। তাদের মধ্যে তিক্ত সম্পর্কের শুরু সম্ভবত ১৮১২ সালে। তখন কানাডীয় কয়েকজন সেনা হোয়াইট হাউসে আগুন দিয়েছিলেন।
কানাডাকে দখলের জন্য আমেরিকার যে পরিকল্পনা ও আমেরিকা দখলের জন্য কানাডার যে পরিকল্পনা, তা নিয়ে ‘ওয়ার প্ল্যান রেড’ নামের একটি বই লেখেন কেভিন লিপার্ট। তাতেই এসব গোপন পরিকল্পনার কথা বিস্তারিত বলা আছে।
বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকার দিক থেকে বিবেচনা করলে কানাডা দখলে নেওয়ার প্রক্রিয়াটা হতে পারে এমন: কানাডার হ্যালিফ্যাক্সে বিষাক্ত গ্যাসের আক্রমণ, এরপর দ্রুত নিউ ব্রান্সউইক আক্রমণ এবং তারপর নায়াগ্রা জলপ্রপাত দাবি করা। এর আগে কুইবেক সিটি ও মন্ট্রিয়েল দখল করতে হবে।
ট্রুডোর কথা বাদ দিলেও ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকা কানাডার অনেক নেতাকে উদ্বিগ্ন করে রাখে। রানি ভিক্টোরিয়া মনে করেছিলেন যে, একটি রাজধানী হিসেবে অটোয়া মার্কিন আক্রমণ থেকে বাঁচবে। কানাডায় ইউনিয়ন বাহিনীর আক্রমণ সম্পর্কে চিন্তিত ছিলেন জন এ ম্যাকডোনাল্ড। কারণ, গৃহযুদ্ধের সময় ইউএস কনফেডারেসির গুপ্তচর ও হামলাকারীদের মন্ট্রিয়েলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
কানাডায় ১৯১১ সালের নির্বাচনে যখন লিবারেল পার্টি আমেরিকার সঙ্গে অবাধ বাণিজ্যের জন্য চাপ দেয়, তখন তাদের আমেরিকা-বিরোধী মনোভাবের দোসর বলে আখ্যা দেওয়া হয়।
চুক্তি ও কংগ্রেসের সবুজ সংকেত
হাইপোথিসিস না হয় একপাশে রেখে দেওয়া হলো। সহজ করে বললে, মার্কিন সংবিধান কানাডাকে দখল করার সব অনুমোদন আমেরিকাকে দিয়েছে। সংবিধানের দ্বিতীয় সেকশনের ‘আর্টিকেল টু’ দিয়ে শুরু করা যাক। এতে বলা আছে, ‘তার [প্রেসিডেন্টের] ক্ষমতা থাকবে সিনেটের পরামর্শ ও সম্মতিতে চুক্তি করার। যদি উপস্থিত সিনেটরদের দুই‑তৃতীয়াংশ একমত হন।’
এই আইনে সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশা রয়েছে এমন উদ্যোগের বাস্তবায়নে। পড়ে মনে হবে, এটি সহজেই আটকে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আসলে কোনো এলাকা দখলে নেওয়ার জন্য এই আইনই আমেরিকার জন্য সবচেয়ে সহজ পথ। এর মাধ্যমে কোথাও যুদ্ধে জয়লাভ না করেও সিনেটরদের সম্মতিতে কোনো এলাকা দখলে নিতে পারে আমেরিকা।
১৮৪৮ সালে প্রেসিডেন্ট জাচারি টেলর মেক্সিকোর ভূখণ্ড আমেরিকায় সংযুক্ত করতে কংগ্রেসের কাছে গুয়াদালুপে হিডালগো চুক্তির প্রস্তাব করেছিলেন। যদিও কেউ কেউ পুরো মেক্সিকো নিতে চেয়েছিল, তবে কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত হিডালগো প্রস্তাবিত চুক্তিটি অনুমোদন করে।
ভিডিও দেখুন:১৮৯৮ সালে কংগ্রেস হাউস জয়েন্ট রেজ্যুলেশন ২৫৯ পাস করে। এর মাধ্যমে হাওয়াইয়ের সংযুক্তিকরণে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাকক্যানলির চুক্তি অনুমোদন পায়। তবে প্রতিবাদ ও ভিন্নমতের কারণে এটি আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত হতে প্রায় ৬০ বছর লেগেছিল। এই হাওয়াই হচ্ছে আমেরিকার ৫০তম অঙ্গরাজ্য।
আমেরিকা কিন্তু প্রথম দিকে এত বড় রাষ্ট্র ছিল না। এভাবে আইনের বলে দখল করে করে এত বড় হয়েছে তারা।
এর বাইরে ফ্রান্সের কাছ থেকে লুইজিয়ানা, জাপানের কাছ থেকে মার্শাল আইল্যান্ড, ডমিনিক রিপাবলিক থেকে সান্টো ডমিনিকো দখলে নিয়েছিল আমেরিকা। এভাবে কিউবাকেও দখলে নেওয়ার চেষ্টা ছিল তাদের। তবে তা আর হয়ে ওঠেনি।
ট্রাম্প কি পারবেন?
যেভাবেই হোক কানাডা দখলে মার্কিন প্রচেষ্টা আলোচনায় আসছেই। এক্ষেত্রে ইতিহাস ও মার্কিন সংবিধানকে উপেক্ষা এবং বিদ্যমান চুক্তিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা ভুল হবে। আসলে মূল ব্যাপার হচ্ছে, এ নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসকে অনুমোদন দিতে হবে। আর আইনমতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন তো লাগবেই। সেই সমর্থন ট্রাম্পের আপাতত নেই।
এ কারণে ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে সহজ পথ হতে পারে কানাডীয়দের ক্ষেপিয়ে তোলা। এ ছাড়া কানাডার রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও বিস্তর যোগাযোগ রাখতে হবে ট্রাম্পকে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করে। তবে এমন করলেও হয়তো ট্রাম্প কানাডা দখলে নিতে পারবেন না। এর অন্যতম কারণ, এই মুহূর্তে কানাডা আমেরিকার অংশ হয়ে যাওয়া মানে সেটি মার্কিন সরকারের জন্য বোঝা। এতে তাদের লাভ তো হবেই না, বরং ক্ষতিই বেশি হবে।
ক্ষমতায় আসার পর রিপাবলিকান এই নেতা কী করেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


কানাডা কখনো যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হবে না: ট্রুডো
ফের কানাডাকে অঙ্গরাজ্য বানানোর ইচ্ছার কথা জানালেন ট্রাম্প 
