ইরানের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহির বিরুদ্ধে এক বছরের কারাদণ্ড ও দুই বছরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে তেহরান বিপ্লবী আদালত। রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণায় যুক্ত থাকার অভিযোগে গত বছর তাঁর অনুপস্থিতিতে এই সাজা দেওয়া হয়েছিল।
রোববার (৭ জুন) পানাহির আইনজীবী মোস্তফা নিলি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এমতেদাদকে জানিয়েছেন, তাঁর মক্কেলের আপিল খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন কিংবা কোনো দলে যোগ দেওয়া থেকেও পানাহিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রায়ের কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গোপন ও বিতর্কিত চলচ্চিত্র নির্মাণ’, রাজনৈতিক বন্দীদের সমর্থন এবং ‘নারী, জীবন ও স্বাধীনতা’র বিক্ষোভসহ সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভকে সমর্থন করা।
এর আগে, পানাহির বিরুদ্ধে গত বছর আদালতের প্রাথমিক রায় জারি করা হয়েছিল, যখন তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। সেসময় এই নির্মাতা তাঁর ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ চলচ্চিত্রের প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন এবং নিউইয়র্কের গোথাম অ্যাওয়ার্ডস গ্রহণ করছিলেন।
২০২৫ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বোচ্চ পুরস্কার পাম দ’র অর্জন করে পানাহির ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট এবং চলচ্চিত্রটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস তথা অস্কারে ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করে। অস্কার অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর, অনুপস্থিতিকালীন কারাদণ্ড থাকা সত্ত্বেও গত ৩০ মার্চ তিনি ইরানে ফেরেন।
সাজা প্রথমবার নয়
কয়েক দশক ধরেই নিজ দেশ ইরানে সেন্সরশিপ ও কারাবাসের শিকার হয়েছেন পানাহি। যদিও তিনি কখনোই রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে চাননি।
‘আমার সংজ্ঞায়, একজন রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাতা এমন একটি মতাদর্শকে সমর্থন করেন, যেখানে ভালোরা তা অনুসরণ করেন এবং মন্দরা তার বিরোধিতা করেন।’—গত বছর কান চলচ্চিত্র উৎসব চলাকালীন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন পানাহি। যোগ করে তিনি বলেন, ‘আমার চলচ্চিত্রে যারা খারাপ আচরণ করে, তারাও ব্যক্তিগত পছন্দের জন্য নয়, বরং ব্যবস্থা দ্বারাই প্রভাবিত হয়।’

তবে একদশকেরও বেশি সময় ধরে পানাহির হাতে তেমন কোনো বিকল্প ছিল না। বিরোধী দল ‘গ্রিন মুভমেন্ট’-এর বিক্ষোভে সমর্থন জানানোর পর, ২০১০ সালে ইরানি কর্তৃপক্ষ ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ ও ‘দ্য সার্কেল’খ্যাত এই নির্মাতার ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণ ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ওপর ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি করে। যদিও এতে তিনি থেমে যাননি।
বছরের পর বছর ধরে নিজের চলচ্চিত্রগুলোর চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা এবং সেগুলো দেশের বাইরে পাঠানোর নতুন নতুন উপায় খুঁজে বের করেছেন পানাহি। এমনকি নিজের বসার ঘরকে সিনেমার সেটে পরিণত করা (দিস ইজ নট আ ফিল্ম, ২০১১) থেকে শুরু করে তিনি একটি গাড়িকে ভ্রাম্যমাণ স্টুডিও (ট্যাক্সি, যা ২০১৫ সালের বার্লিনালে ‘গোল্ডেন বেয়ার’ পুরস্কার জিতেছিল) হিসেবেও ব্যবহার করেছেন।
২০২২ সালের জুলাইয়ে গ্রেপ্তার করে তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারে আটক রাখা হয়েছিল এই নির্মাতাকে। প্রায় ৭ মাস অনশনের পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি মুক্তি পান। এক অভাবনীয় আইনি বিজয়ে ইরানের সর্বোচ্চ আদালত তাঁর ২০১০ সালের মূল সাজা বাতিল করে দেয়। পানাহি আইনত মুক্ত হলেও শৈল্পিকভাবে তিনি এমন এক ব্যবস্থায় আটকে ছিলেন, যার কাছে তিনি কখনও মাথা নত করতে রাজি ছিলেন না।
চলচ্চিত্র নির্মাণই একমাত্র বিকল্প
নানা প্রতিবন্ধকতায় জর্জরিত চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার হলেও, পানাহি জোর দিয়ে বলেন যে তিনি কেবল সেটাই করছেন, যা তিনি করতে জানেন। ২০২৫ সালের মে মাসে ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’র কান প্রেস কনফারেন্সে তিনি বলেন, ‘আমার ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞার সময়, আমি যে আবারও চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারব—এই আশা আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুরাও ছেড়ে দিয়েছিল।’

যোগ করে বলেন, ‘যাঁরা আমাকে চেনে, তাঁরা জানে যে আমি একটা লাইটও (বাল্ব) বদলাতে পারি না। সিনেমা বানানো ছাড়া আমি আর কিছুই করতে জানি না।’
এই একাগ্রতাই তাঁকে চরম দুর্দিনেও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
গত ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ শুরু হলে, মাতৃভূমিতে ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেন পানাহি। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই আকাঙ্ক্ষার কথা এবং যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তবে ইরানে তাঁর বিরুদ্ধে যে সাজা রয়েছে, সেটির কী হবে—এমন প্রশ্নে নির্মাতার ভাষ্য ছিল, ‘আবারও হয়তো জেলে যাব, নতুন একটি সিনেমার চিত্রনাট্য নিয়ে বের হব।’
সাজা সত্ত্বেও যে কারণে ইরানে ফেরা
অস্কার-মনোনীত ‘দ্য সিড অব দ্য স্যাক্রেড ফিগ’খ্যাত নির্মাতা মোহাম্মদ রাসুলোফ এখন জার্মানিতে থাকেন। তিনি ছাড়াও আরও অনেক ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা নির্বাসনে রয়েছেন। তবে পানাহি বারবার জানিয়েছেন যে, তাঁদের মতো নির্বাসনে থাকার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। তিনি বলেন, ‘আমি অন্যকোনো সমাজে নিজেকে মানিয়ে নিতে সম্পূর্ণ অক্ষম। পোস্ট-প্রোডাকশনের জন্য আমাকে সাড়ে তিন মাস প্যারিসে থাকতে হয়েছিল, আর আমার মনে হচ্ছিল আমি মরেই যাব।’
ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, ইরানে চলচ্চিত্র নির্মাণ হলো স্বতঃস্ফূর্ততা ও বিশ্বাসের এক সম্মিলিত প্রয়াস। তিনি বলেন, ‘ইরানে রাত ২টার সময়ও আমি আমার একজন সহকর্মীকে ফোন করে বলতে পারি: ওই শটটা আরও দীর্ঘ হওয়া উচিত। সে আমার সঙ্গে এসে যোগ দিবে এবং আমরা সারারাত কাজ করব। ইউরোপে এভাবে কাজ করা যায় না। আমি এখানকার নই।’



