আব্দুস সোবহান গোলাপ আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। ছিলেন আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী। মাদারীপুর-৩ আসনে ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকে শুরু হয় বিতর্ক। দলীয় কোন্দলে নেতা–কর্মীদের কাছে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। গত ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যসহ বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য সমালোচিতও হয়েছেন তিনি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে কালকিনি ও ডাসার উপজেলার সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা–কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে কেন্দ্রে মনোনয়নের জন্য আবদুস সোবাহান গোলাপের নাম প্রস্তাব পাঠানো হয়নি। তারপরেও তিনি পেয়ে গেছেন দলীয় মনোনয়ন। এরপরই তৃণমূল নেতা–কর্মীদের নির্বাচনী চূড়ান্ত বিরোধীতার তোপে পড়েন গোলাপ। এর জের ধরেই আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতেই স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে হেরেছেন বিপুল ভোটের ব্যবধানে।
এই আসনে আওয়ামী লীগের আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপ ৬১ হাজার ৯৭১ ভোট পেয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বদ্বী কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তাহমিনা বেগম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ে ঈগল প্রতীকে তিনি ৯৬ হাজার ৬৩৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের একটি গ্লোবাল প্লাটফর্ম অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট (ওসিসিআরপি)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আবদুস সোবহান ২০১৮ সালে তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় মার্কিন নাগরিক হওয়ার তথ্য গোপন করেছিলেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ ডলারে ৯টি বাড়ি কেনেন। সবশেষ ২০১৯ সালে তিনি নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে ১ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলারে একটি সেমি-ডিটাচড বাড়ি কিনেছেন। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্থানীয় ভোটারদের মাঝে তাঁর প্রতি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
দলীয় নেতা–কর্মীদের সঙ্গে দূরত্বের শুরু
মাদারীপুর-৩ আসনটি মাদারীপুরের সদরের ৫টি ইউনিয়ন, কালকিনি ও ডাসার উপজেলা নিয়ে গঠিত। পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রকল্পে ওই সময়ের স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রয়াত সৈয়দ আবুল হোসেনকে ২০১৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। সৈয়দ আবুল হোসেনের পরিবর্তে ওই সময়ের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ.ফ.ম বাহাউদ্দিন নাছিমকে মাদারীপুর-৩ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তিনি এই আসনটির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে হাল ধরেন আওয়ামী লীগের।
কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ টানা পাঁচ বছর এই আসনটিতে কাজ করেন তিনি। সৈয়দ আবুল হোসেনের অনুসারী পরিচিত আওয়ামী লীগের একটি অংশ নীরব থাকে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৈয়দ আবুল হোসেনের অনুসারী ও বাহাউদ্দিন নাছিমের অনুসারীদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় তখনকার প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবাহান মিয়া গোলাপ সবাইকে চমকে দিয়ে নৌকার মনোনয়ন পেয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্থানীয় নেতা–কর্মীরা আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপ মেনে নিয়ে নৌকা প্রতীকের নির্বাচন করেন এবং বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিতও হন। এর পরপর পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।
মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ মোল্লা বলেন, ‘গত ৩০ নভেম্বর আমার প্রাণের নেত্রী শেখ হাসিনা কালকিনিতে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের জন্য জনসভা করেন। সেই জনসভায় যোগদান করার জন্য জেলা আওয়ামী লীগের ১১ জন নেতার নাম প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু আবদুস সোবহান গোলাপ সাহেব আমাদের জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেন। এতে জেলা আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা মনক্ষুন্ন করতেই পারে। তবে কালকিনিতে তাহমিনা বেগমের প্রতি আমাদের সমর্থন ছিল। তিনি গত প্রায় ৫০ বছর ধরে কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগকে একটি পরিবারের মতো আগলে রেখেছেন। তিনি জয়লাভ করায় আমরা মনে করি এখানে আওয়ামী লীগ হারেনি। আওয়ামী লীগের বিজয় হয়েছে। হেরেছেন একজন বিতর্কিত নৌকার মাঝি।’
গত মঙ্গলবার মাদারীপুর প্রেসক্লাবে আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপ সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, ‘নির্বাচনে ঈগল প্রতীকের প্রার্থী বিভিন্ন কেন্দ্রে একটি ‘অদৃশ্য’ শক্তির প্রভাব বিস্তার করে সূক্ষ্ম কারচুপি করে নৌকাকে হারিয়েছে। আর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার করে আমার ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে তারা।’
অন্যদিকে একই দিন তাহমিনা বেগমও কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আবদুস সোবহান গোলাপ সাহেবের অন্যায় অপকর্ম ও দুর্নীতির কারণে মাদারীপুর-৩ আসনের জনগণ তাঁকে প্রত্যাখান করেছে। নির্বাচনে হেরে এখন তিনি আমাদের আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের বাড়িঘর ভাংচুরসহ অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে আমাদের শান্তিপূর্ণ বিজয় মিছিলে তাঁর কর্মীরা বোমা হামলাও করেছে। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দেব না। কাউকে অন্যায় করতেও দেব না।’



