জন্মের পর থেকেই বুক থেকে পেট পর্যন্ত একে অপরের সঙ্গে যুক্ত জোড়া লাগা যমজ দুই কন্যাশিশু জয়নব ও উম্মে কুলসুম। আধুনিক চিকিৎসায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আলাদা করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা থাকলেও চরম দারিদ্র্যের কারণে সেই চিকিৎসা অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া মধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নাহিদ হাসান ও সানজিদা ইয়াছমিন মুক্তা দম্পতির ঘরে গত ৪ মে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয় বিরল এ জোড়া লাগা যমজ কন্যাশিশু।
সন্তান জন্মের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। চিকিৎসকেরা জানান, শিশু দুটিকে আলাদা করতে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিয়মিত চিকিৎসা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। জন্মের তিন মাস পূর্ণ হলে তাদের আবার ঢাকায় নিয়ে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চরম আর্থিক সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ে শিশু দুটিকে নিয়ে ঢাকায় যেতে পারেনি পরিবারটি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় চার বছর আগে একই এলাকার মামুন হোসেনের ছেলে নাহিদ হাসানের সঙ্গে একই গ্রামের মখলেছুর রহমানের মেয়ে সানজিদা ইয়াছমিন মুক্তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনের দুই বছর পর তাদের ঘরে নোমান নামে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। বর্তমানে তার বয়স দুই বছর। দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের সময় আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে জানা যায়, গর্ভে থাকা যমজ সন্তান দুটি একে অপরের সঙ্গে জোড়া লাগানো। স্থানীয়ভাবে অস্ত্রোপচার সম্ভব না হওয়ায় প্রথমে কুষ্টিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে ঢাকার বিএসএমএমইউতে স্থানান্তর করা হলে সেখানেই জন্ম হয় বিরল এই দুই শিশুর।
একসময় রাজধানীর একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন শিশুদের বাবা নাহিদ হাসান। বর্তমানে তিনি স্থানীয় একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। মাসে মাত্র ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় দিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে শিশুদের দুধ, ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারটি ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাহিদ হাসান বলেন, ‘চিকিৎসকেরা আশা দিয়েছেন, আমার মেয়েদের আলাদা করা সম্ভব। কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য আমার নেই। এখন তাদের দুধ কেনার টাকাই জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সিজারিয়ান অপারেশনের জন্যও অনেক ঋণ করতে হয়েছে। একজন একটু নড়লেই অন্যজন কষ্ট পায়। নিয়মিত ঢাকায় যেতে হবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। কিন্তু যাতায়াতের খরচও জোগাড় করতে পারছি না।’
শিশুদের দাদি নার্গিছ পারভীন বলেন, ‘দুই শিশুর জন্য প্রতিদিন দেড় থেকে দুই প্যাকেট তরল দুধ লাগে। সেই দুধ কেনার টাকাও আমাদের হাতে থাকে না। সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ ও মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে হয়তো আমার নাতনিরা নতুন জীবন পাবে।’
স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, জোড়া লাগা যমজ শিশু জন্ম নেওয়া অত্যন্ত বিরল একটি জন্মগত অবস্থা। তবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আলাদা করার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের নিবিড় তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।
দৌলতপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিরল এই যমজ শিশুর বিষয়ে আমরা অবগত। পরিবারটি সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনুকূলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের রোগী কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি উপজেলা সমাজকল্যাণ পরিষদের মাধ্যমেও আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তার চেষ্টা করা হবে।’
দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা পরিবারটির এখন একটাই স্বপ্ন—জয়নব ও উম্মে কুলসুম একদিন আলাদা দুটি স্বাভাবিক জীবন পাবে। তবে অর্থাভাবে সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে দুই শিশুর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে। তাই সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতাই হতে পারে তাদের নতুন জীবনের সবচেয়ে বড় আশার আলো।



