রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের মডার্ন মোড়ের দক্ষিণে যাত্রীবাহী বাসের চাপায় আবুল কাশেম (৫২) নামের এক মাদ্রাসা সুপার নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় বাসে থাকা যাত্রী ও পথচারীসহ অন্তত ১০জন আহত হয়েছেন। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা বাসটি আগুন ধরিয়ে দিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে।
আজ রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের মডার্ন মোড়ের দক্ষিণে তুলা গবেষণা কেন্দ্রের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর বাসের আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে সার্ভিস।
নিহত আবুল কাশেম রংপুর নগরীর জিয়াতপুকুর মাজার শরিফ দাখিল মাদ্রাসার সুপার ছিলেন। পাশাপাশি তিনি একটি মসজিদের ইমাম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বড়বালা ইউনিয়নের আটপুনিয়া গ্রামে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, আবুল কাশেম সকালে মোটরসাইকেলে করে সাত বছর বয়সি মেয়েকে মাদ্রাসায় পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন। তিনি লোকাল লেন দিয়ে চলার সময় ‘স্পেশাল পরিবহন’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে লোকাল লেনে উঠে আসে। এতে বাসটি মোটরসাইকেলটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই আবুল কাশেম নিহত হন। ঘটনার পর বাসের চালক ও তাঁর সহকারী পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শেষ মুহূর্তে মেয়েকে রাস্তার পাশে সরিয়ে দিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন তিনি। এ ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা দুর্ঘটনাকবলিত বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং চালক ও তার সহকারীকে গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে।
প্রত্যক্ষদর্শী গফুর আলী বলেন, ‘দুর্ঘটনার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি নিজের মেয়েটিকে রাস্তার পাশে ঠেলে সরিয়ে দেন। এজন্য শিশুটি অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে। কিন্তু তিনি নিজে বাসের নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।’
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী শাহজাহান হোসেন বলেন, ‘বাসটি খুব দ্রুতগতিতে এসে হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে। মোটরসাইকেল আরোহীর কোনো সুযোগই ছিল না। এমন দুর্ঘটনা এই এলাকায় নতুন নয়। আমরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
এদিকে বিক্ষোভের কারণে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের দুই পাশে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। অনেক অ্যাম্বুলেন্স, রোগীবাহী যান ও দূরপাল্লার বাস আটকা পড়ে।
রংপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আনারুল হক বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাই। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা ও কিছু শিক্ষার্থী প্রথম দিকে আগুন নেভানোর কাজে বাধা দেয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আমরা আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি।’
রংপুরের তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর বাসচালক পালিয়ে গেছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে। নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, মডার্ন মোড় ও তুলা গবেষণা কেন্দ্রসংলগ্ন মহাসড়কে দীর্ঘদিন ধরে বেপরোয়া গতিতে যান চলাচল, হঠাৎ লেন পরিবর্তন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। তারা দ্রুত কার্যকর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং দায়ী চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
দুর্ঘটনার পর কয়েক ঘণ্টা চরম উত্তেজনা বিরাজ করলেও পরে পুলিশ, প্রশাসন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। অবরোধ প্রত্যাহারের পর ধীরে ধীরে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে দীর্ঘ সময়ের যানজটের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মারুফ আহমেদ বলেন, ‘মোটরসাইকেলের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষে একজন মাদ্রাসা শিক্ষক নিহত হয়েছেন। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



