
কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা কবিতা আছে, নাম ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’। শুক্রবার (২১ জুন) সিনেমা হলে শাকিব খান অভিনীত ‘তুফান’ দেখতে গিয়ে বারবার এই কবিতার দুটি লাইন মনে আসছিল! কবিতাটির সেই দুই ছত্র একটু ঘুরিয়ে বললে—‘আমি বড় পর্দায় তুফানের সামনে বসে থাকি/ তুফানের ভেতরের পশুটাকে দেখব বলে!’
গভীরভাবে ‘তুফান’কে সেভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন নির্মাতা রায়হান রাফী। তবে এ বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, তুফান কোনো সাধারণ মানুষ নয়, সে রাক্ষস! তুফানকে জন্মের পরই এই বলে আখ্যায়িত করে তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ লোকেরা। বড় হতে হতে সেটা রূপ নেয় বাস্তবে! পর্দায় ধুন্ধমার অ্যাকশন দিয়েই শুরু সিনেমাটি। ধীরে ধীরে গল্পের ভেতরে ঢুকতে থাকেন দর্শক।
কে না জানে, বাংলা সিনেমা দীর্ঘদিন ধরেই দর্শক খরায় ভুগছে! একে একে বন্ধ হয়ে গেছে বিভিন্ন জেলার ঐতিহ্যবাহী হল। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তুফান ব্যতিক্রম। প্রচুর দর্শক পাচ্ছে ছবিটি। যে হলে দর্শক থাকে হাতেগোনা, সেই হলেও ইভেনিং শো ছিল পুরো হাউসফুল। কানায় কানায় পরিপূর্ণ, যা বাংলা সিনেমার জন্য বেশ আশাব্যঞ্জক চিত্র।

যা হোক, ফেরা যাক তুফান প্রসঙ্গে। এ সিনেমায় দ্বৈত ভূমিকায় রয়েছেন শাকিব খান। একজন কুখ্যাত গ্যাংস্টার, নাম যার ‘তুফান’। অন্যজন সাদাসিধা, স্বপ্ন তার নায়ক হওয়া; নাম ‘শান্ত’। এর আগেও অবশ্য এই সুপারস্টারকে দ্বৈত চরিত্রে দেখা গেছে একাধিক বার। যেমনটা ‘ভাইজান এলো রে’ কিংবা ‘হিরো: দ্য সুপারস্টার’ ছবিতে। কিন্তু তুফান-এ এই ছবি দুটির তুলনায় অনেক সাবলীল রূপে দেখা গেছে শাকিবকে। ‘শান্ত’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় মুগ্ধকর। আর ‘তুফান’ মানেই ড্যাম কেয়ার!
অন্যদিকে, তুফান-এ মাসুমা রহমান নাবিলা রয়েছেন কস্টিউম ডিজাইনার চরিত্রে। তাঁর স্ক্রিন টাইম উপস্থিতি নজরকাড়া। সংলাপের সঙ্গে অভিনেত্রীর মুখের অভিব্যক্তি একরাশ মুগ্ধতা ছড়ানো। তবে এ সিনেমায় টলিউডের মিমি চক্রবর্তীর ‘সূচনা’ চরিত্রটি যেন শোপিস! গল্পের ভেতরেও তিনি নায়িকার ভূমিকায়। শোভাবর্ধন ছাড়া অভিনয়ের জন্য খুব একটা সুযোগ রাখা হয়নি তাঁর জন্য। অথচ সেই যোগ্যতা ও সক্ষমতা তাঁর ছিল ভালোমতোই। এ এক নিদারুণ অপচয় অবশ্যই!

তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, তুফান-এর ক্ষেত্রে অভিনয়শিল্পী বাছাইয়ে বেশ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন রায়হান রাফী। পশ্চিমবঙ্গের রজত গাঙ্গুলি, লোকনাথ দেসহ এ দেশের গাজী রাকায়েত, ফজলুর রহমান বাবু, শহিদুজ্জামান সেলিম, মিশা সওদাগর, সালাউদ্দিন লাভলু, সুমন আনোয়ার, সাইফুল জার্নাল তাঁদের সবার অভিনয় ছিল দেখার মতো।
তবে সিনেমাটিতে গল্পের খেলা ঘুরিয়ে দেন চঞ্চল চৌধুরী। স্ক্রিন টাইমে তাঁর উপস্থিতি কম হলেও, সুঅভিনয় দেখানোর সুযোগটা তিনি পেয়েছেন। এবং বরাবরের মতোই তিনি অনবদ্য।

এদিকে, তুফান-এর লুক ও ট্রেলার প্রকাশের পর থেকে ‘কেজিএফ’, ‘সালার’, ‘অ্যানিমেল’ কিংবা কারও কারও মতে ‘ডন’ ছবির কপি করা হয়েছে বলে যেসব চর্চা সামাজিক মাধ্যমে জারি রয়েছে, মূল সিনেমা দেখতে বসলে সেই জায়গায় এক ধরনের মিশ্র অনুভূতির জন্ম হয়। কখনো কখনো ছায়া খুঁজে পাওয়াই যায়। তবে সেটাকে ‘অনুপ্রেরণা’ বলাই শ্রেয়। বিষয়টি খুবই দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদিত হয়েছে, ফলে ‘হুবহু নকল’ বলা যাচ্ছে না।
সিনেমাটির চিত্রনাট্য লিখেছেন আদনান আদিব খান। বলিউড-তেলুগুর মতো হিংস্রতা, কমেডি ও বডি ডাবল ট্রেন্ডের মতোই জনপ্রিয় পথকে বেছে নিয়েছেন তিনি। আর রায়হান রাফী হয়তো সেটি ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের মতো করে। তবে গল্প বলতে গিয়ে তিনি কিছুটা খেই হারিয়েছেন। কারণ শুরুতে যে অ্যাকশন দৃশ্যের অবতারণা দিয়ে দর্শকের মন জয় করে নেন তিনি, সেই কল্পনাটি কি ‘শান্ত’ কাকতালীয়ভাবেই দেখেন কিনা—এর কোনো কিছু পরবর্তীতে আর উল্লেখ পাওয়া যায় না। ফলে এ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। উপস্থাপনায় একদিকে চমৎকারিত্ব রয়েছে, সেই সঙ্গে কিছুটা দুর্বলতার প্রকাশও লক্ষ্য করা গেছে শেষদিকে, যখন শান্ত আর তুফান যেকোনো একজনকে বেছে নিতে হয় মৃত্যু!

এমনিতে এই সিনেমায় রোমান্টিক গান যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে দুষ্টু গান। ভার্চ্যুয়াল জগতের ভাষায় পড়েন ‘আইটেম সং’! দর্শকের মাঝে এসব গান রোমান্স ছড়ানোর পাশাপাশি প্রাণেও একরাশ দোলা দেয়। অন্যদিকে, তুফান-এর সিনেমাটোগ্রাফি সুন্দর। কস্টিউমও মানানসই। বিশেষভাবে নজর কাড়ে সিনেমাটির আর্ট ডিরেকশন। সেটের কারুকাজ নান্দনিক।
এক কথায়, তুফান-এর গল্পকে যদি দুটি ভাগে ভাগ করা হয়, তবে একভাগ সরল, অন্যভাগ লোমহর্ষক। লেখক হুমায়ুন আজাদ যেমনটা বলেছিলেন, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। তুফানের বেলায় ফুটে উঠে সেই বাস্তবতা। শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি, কৃষি সবকিছুই যেতে থাকে নষ্টদের দখলে! চলতে থাকে ক্ষমতার অপব্যবহার আর কূটকৌশলের খেলা। মানুষের ভেতর যে পশুত্ব প্রবৃত্তি রয়েছে সেটার এক চরম পর্যায় উপস্থাপিত হয়েছে এই তুফানে। দর্শকের মনে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তুফান—মানুষ না অমানুষ?
তবে গল্প সম্পর্কে এখানে বেশি কিছু বলছি না, বরং পর্দার ‘শান্ত’র সুর ধরে বলব—বাকিটা বড় পর্দায়! অস্থির না হয়ে দেখুন তা শেষ পর্যন্ত। চমকটা সেখানেই!
সবশেষ কথা হলো, এ দেশের সিনেমার গল্প বলার নিজস্ব কায়দা আছে। সেখান থেকে বের হয়ে এবার এই যে দক্ষিণী কিংবা তেলুগু ট্রেন্ডে নির্মাণ শুরু হলো, এই কি চলতেই থাকবে? যদি চলেই, তবে তা কতদিন গ্রহণ করবে দর্শক? নাকি দুই নৌকোয় উঠে দুলতে থাকবে স্বকীয়তা!


প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী ‘কালপুরুষ’ কত নম্বর পেল?
অন্ধ ছেলে, বাবার মরদেহ ও একটি কুকুর
আগামী অস্কার মাতানোর সিনেমা পেয়ে গেছে হলিউড?
