দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার মান ইত্যাদি নিয়ে প্রায়ই বহু মানুষকে হা–হুতাশ করতে দেখা যায়। বলা হয়, শিক্ষকদের মানও নাকি নেমে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এমন অভিযোগ ও আক্ষেপ নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ হওয়া জরুরি। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করেই এ নিয়ে দায়িত্বশীলদের গুরুতর অনুসন্ধান চালানো উচিত। কিন্তু এসব আলোচনার মাঝে যে বিষয়টি একেবারেই অনালোচিত থেকে যাচ্ছে, তা হলো—শিক্ষকদের সম্মানের বিষয়টি। না, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের পাঠদান বা এ ধরনের কোনো দক্ষতা প্রশ্নে সম্মানের প্রসঙ্গটি আসছে না। বরং শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষকেরা যেসব হেনস্তার শিকার হচ্ছেন, তার কথা বলা হচ্ছে।
উদাহরণ দেওয়া যাক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম কপালেশ্বর উচ্চবিদ্যালয়। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে এর শিক্ষকদের কপালের দোষে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সামনেই প্রতিষ্ঠানটির এক শিক্ষককে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির অভিভাবক সদস্য মারধর করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার (৮ জুন) হওয়া ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষক থানায় লিখিত অভিযোগও করেছেন।
ওই শিক্ষকের নাম মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। বয়স ৪৪ বছর। প্রতিষ্ঠানটিতে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে কর্মরত মোজাম্মেল হক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি। আর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বিল্লাল হোসেন ওই বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির অভিভাবক সদস্য। তাঁর বয়স ৪২ বছর। মোজাম্মেল হকের করা অভিযোগ বলছে, ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় পদাধিকারবলে কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ কে এম লুৎফর রহমানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা না জানানোয় প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে বিল্লাল হোসেন প্রধান শিক্ষককে গালিগালাজ শুরু করেন। থামাতে গেলে মোজাম্মেল হককে মারধর করেন বিল্লাল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইউএনও পুলিশের সহায়তায় পরিস্থিতি শান্ত করেন।
বরাবরের মতোই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিল্লাল হোসেন। মোজাম্মেল হকের অভিযোগে আরও কিছু নাম উল্লেখ আছে। তাঁদের সবাই চল্লিশোর্ধ্ব। ইউএনওকে ফুল দেওয়া বা না দেওয়া নিয়ে এই বিতণ্ডা ও মারধরের খবর শুনলে প্রথমেই যে শব্দটি মাথায় আসতে পারে, তা হলো—ছেলেমানুষি। কিন্তু তাঁদের বয়স বলছে, তাঁরা আর যাই হোক, অপ্রাপ্তবয়স্ক নন, ছেলেমানুষ তো ননই। তাহলে?
বিষয়টি সম্ভবত, তৈলবাজির সাথে সম্পর্কিত। না হলে উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে ফুল দেওয়া বা না দেওয়ায়, বিল্লাল হোসেন বা অন্যদের এতটা ক্ষিপ্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কে না জানে, স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদের কর্মকর্তাদের কিছু ক্ষমতা থাকে, যা ব্যবহার যেমন করা যায়, অপব্যবহারও করা যায়। বিল্লাল হোসেনদের নজর ব্যবহারে নয়, অপব্যবহারে। ফলে তাঁরা নানাভাবে এই পদধারী কর্মকর্তাদের তুষ্ট করতে চান। আর যদি তাঁরা ব্যবসা বা এমন কোনো পেশার সাথে যুক্ত থাকেন, তাহলে তো কথাই নেই। স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রকল্পের সাথে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের বেশ জোর সংশ্লেষ থাকে। এই সংশ্লেষ আরও বাড়ানো যায় যদি আগে থেকেই একটু ‘লাইন–ঘাট’ করা যায়। এই লাইন করতে গিয়েই বিল্লাল হোসেনদের মতো অনেকে বেলাইনে হাঁটা শুরু করেন। সে ক্ষেত্রে তাঁরা ‘শিক্ষাগুরুর শির’–এর উচ্চতা সম্পর্কে একেবারে বেখেয়াল হয়ে পড়েন।
আর যেহেতু এতে তেমন তিরস্কার বা প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় না, সেহেতু কেউ এ বিষয়ে ন্যূনতম সতর্ক হওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেন না। তাঁদের কাছে মনে হয়, স্থানীয় বিদ্যালয়–উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক—এ আর এমন কী? এরা তো একেবারে ছা–পোষা। তাঁদের সামনে শ্রদ্ধায় অবনত তো নয়ই, বরং তাঁদের যতভাবে উপেক্ষা করা যায়, ততই নিজের মর্যাদা বাড়ে!
সর্বশেষ এ ঘটনায় ইউএনও ব্যবস্থা নিয়েছেন। মামলা হয়েছে। তিনি তদন্ত ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ। কিন্তু সব ক্ষেত্রে বিষয়গুলো এমন হয় না।
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে ঢোকার জন্যই প্রধান শিক্ষককে ঘরে ডেকে হেনস্তা করার নজির এই বাংলাদেশেই আছে। তাও বেশি আগে নয়। গত বছরের ৮ নভেম্বর স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি হতে প্রধান শিক্ষককে বাড়ি ডেকে নিয়ে দুই ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল যশোর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তফা ফরিদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া স্কুলে গিয়ে বর্তমান সভাপতিকে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটে।
ওই স্কুলের নামটি শুনুন—আদর্শ বহুমুখী বালিকা বিদ্যালয়। সেখানেই ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হতে প্রধান শিক্ষককে হেনস্তার মতো ‘আদর্শ’ উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়েছিল। ঘটনার অভিযুক্ত মোস্তফা ফরিদ চৌধুরী এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। তাঁর এই জবাবদিহির বাইরে থাকাটা কি স্কুল শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষককে ‘নির্যাতনযোগ্য’ হিসেবে সাব্যস্ত করছে না?
এ তো মাত্র দুটি উদাহরণ। এর আগে নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তির গলায় জুতার মালা উঠতে এই আমরাই দেখেছি। দেশের মানুষ সে ঘটনায় প্রতিবাদ করেছিল। কেউ কেউ অভিযুক্তদের পক্ষে সাফাইও গেয়েছিল। এর পর এমন ঘটনা আরও অনেক ঘটেছে। এখনো ঘটছে। কিন্তু তেমন আলোচনা হচ্ছে না। যেন অপমানের ধরন ঠিক ‘কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়’ না হলে কেউ কিছু বলবে না বলে ঠিক করে রেখেছে। আচ্ছা, শিক্ষকের অপমান নিয়ে কথা বলতে হলে ঠিক কতজন শিক্ষকের গলায় জুতার মালা উঠতে হবে?
যে জাতির সন্তানেরা প্রাথমিক পর্যায়েই কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতা পাঠ ও আত্মস্থ করে বেড়ে ওঠে, সে দেশে শিক্ষকের মর্যাদার এই হাল কেন? কেন এই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও সভাপতি হতে স্থানীয় হোমরা–চোমরাদের এত তোড়জোড়? শিক্ষার উন্নয়নে এই ব্যবস্থাপনা কমিটি ও তার এই অতি আবেগী সদস্য ও সভাপতিদের অবদানটা কী? কেউ বলতে পারবেন?
কেউ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারুক আর না পারুক—এটা তো হলফ করেই বলা যায় যে, ব্যবস্থাপনা কমিটি নামক মধুর ভাণ্ডে আছে প্রতিষ্ঠানের নানা পদে নিয়োগ ও সরকারি নানা প্রকল্পের নির্যাস। এর সদস্য হিসেবে থাকতে পারলে তার কিছু নয়–ছয়ে ভাগীদার হওয়া যায়। আর উপরি হিসেবে থাকে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের সাথে সংযোগের এক মিহি সূত্র, যাদের পদাধিকারবলেই এসব কমিটির সাথে থাকতে হয়। ফলে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এলাকাভিত্তিক নানা প্রকল্পের লাভের গুড়ও পকেটস্থ করার একটা সুযোগ তৈরি হয়।
শেষ করার আগে অধ্যাপক নেহাল আহমেদের করা আক্ষেপের দিকে একটু তাকানো যাক। এই কিছুদিন আগে গত ২১ মে সংবাদমাধ্যমের কাছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের এই মহাপরিচালক আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘কিছু কিছু মানুষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি পদকে ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি) দ্বারা আমাদের সম্মানিত শিক্ষকরা অনেক অত্যাচার, নির্যাতনের শিকার হয়। দেখা গেছে আলুর ব্যাপারীও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হয়ে শিক্ষকদের নির্যাতন করার চেষ্টা করছে। অথচ তিনি শিক্ষার “শ”ও জানেন না। সেই তিনি চেয়ারে বসে আমাদের শিক্ষকদের ওয়াজ-নসিয়ত করেন।’
না, আলুর ব্যাপারী হলেই যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রাখা যাবে না, এমন নয়। বিষয়টি নেহাল আহমেদ রূপক অর্থেই বলেছেন। ভাষ্যটি পরিষ্কার—শিক্ষার প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা বা শিক্ষার সম্প্রসারণে যৎকিঞ্চিৎ আগ্রহও নেই—এমন ব্যক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হর্তাকর্তা হয়ে বসছেন। এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে শিক্ষকদের, যাঁদের ওপর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার ভার। প্রতিনিয়ত অপমান ও উপেক্ষার শিকার হয়ে তাঁদের নতুন প্রজন্মের সামনে দাঁড়াতে হয়, জাতির সেই মেরুদণ্ডের উদাহরণ সৃষ্টি করতে, যা তাঁর কাছ থেকেই খুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়। কপালেশ্বর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কপালদোষের মতো এই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের নিজের অজান্তেই আহাজারি করতে হয়—হা কপাল বলে। আর দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার মান উভয়ই তখন অলক্ষ্যে বদনসিবের খপ্পরে পড়ে কাতরায়। ওই গোঙানি শুনে যারা হা–হুতাশ করেন নিয়মিত বিরতিতে, তাঁরা এই সদা ঘটে চলা শিক্ষকদের অপমানের ঘটনাগুলো নিয়েও দু–একটি বাক্য বিনিময় করলে কপালদোষ ও বদনসিব—দুইয়েরই একটু মীমাংসা হতে পারে। সে পথে কি আমরা হাঁটব?
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


ইউএনওর সামনে শিক্ষককে মারধর, থানায় অভিযোগ
'লেটার'–এর বাজারে মানুষ যাবে কোথায়
