অনুমোদনহীন ব্লু ড্রিংকস বাজারজাত করায় জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ইফতেখার রাফসান ওরফে ‘রাফসান দ্য ছোট ভাই’এর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের বিচারক আলাউল আকবর এ আদেশ দেন। এর আগেই অবশ্য তিনি বড় অঙ্কের ঋণগ্রস্ত মা-বাবাকে দামি গাড়ি কিনে দিয়ে সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন। সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের নিয়ে এ ধরনের তর্ক-বিতর্ক নতুন নয়। নানা দেশেই হয়। বাংলাদেশেও হচ্ছে। দুনিয়াজুড়েই সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা আলোচনা যেমন আছে, অস্বস্তিও আছে। এই ইনফ্লুয়েন্সারদের নিয়ন্ত্রণ করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই আলোচনায় যাওয়ার আগে সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার বিষয়টি বুঝে নেওয়া যাক। সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার বলতে সাধারণত সেই সব ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যারা তাদের সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে থাকা প্রোফাইল, পেজ, চ্যানেল ইত্যাদিতে প্রকাশিত কনটেন্টের মাধ্যমে একটি বড় জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করেন। শুধু তাই নয়, এই প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে মৌখিক, লিখিত, গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশন ইত্যাদির মাধ্যমে কোনো পণ্য বা সেবা কিনতে পাঠক-দর্শকদের উদ্বুদ্ধ করেন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিধানে ইনফ্লুয়েন্সার শব্দটির অর্থ জানাতে গিয়ে শুরুতে ‘অন্যের সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখা ব্যক্তি’র কথা বলা হলেও এর পরেই বলা হয়েছে, একজন ইনফ্লুয়েন্সার হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি কোনো কোম্পানি বা গোষ্ঠীর কাছ থেকে পাওয়া অর্থের বিনিময়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত কনটেন্টের সাহায্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবা কিনতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। অর্থাৎ, ইনফ্লুয়েন্সার বিষয়টি চিরাচরিত অর্থ ত্যাগ করে সামাজিক মাধ্যমকেন্দ্রিক একটি অর্থ এরই মধ্যে গ্রহণ করেছে, যাকে এমনকি গ্রাহ্য করতে হয়েছে কেমব্রিজের অভিধানকে। খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে সেই অংশটিকেই কমেব্রিজ স্বীকার করেছে, যাদের সাথে আর্থিক যোগটি পরিষ্কার। আর্থিক যোগ ছাড়া যেন কেউ প্রভাবশালী হয় না। অবশ্য পুঁজির বিশ্বে প্রভাবের দুনিয়া টাকা দিয়েই মোড়ানো।
এই ইনফ্লুয়েন্সাররা আসলে কত মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন? শুরুর উদাহরণ নিয়েই একটু কথা বলা যাক। এই সময়ে আলোচিত ইফতেখার রাফসানের সামাজিক মাধ্যমে তৈরি পেজ, প্রোফাইল ও চ্যানেলের নাম ‘রাফসান দ্য ছোটভাই’। এই নামে থাকা তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ২৭ লাখ ৫০ হাজার। তাঁর ফেসবুক পেজের অনুসারীর সংখ্যা ৪৪ লাখ। আর ফেসবুক প্রোফাইলের অনুসারী আছে ৩ লাখ ২৬ হাজার। ইনস্টাগ্রামের অনুসারী ৮ লাখ ৯৫ হাজার। এরমধ্যে অনেকেই একই সাথে তাঁর একাধিক পেজ ও চ্যানেলের অনুসারী হতে পারেন।
এই বিপুলসংখ্যক মানুষের সাথে রাফসান নিয়মিত বিরতিতে নানা কনটেন্টের মাধ্যমে সংযুক্ত হন। নিজের তৈরি ফুডভ্লগিংয়ের মাধ্যমেই তিনি এই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তাঁর করা বিভিন্ন কনটেন্টে তিনি নানা ধরনের খাবারের কথা তুলে ধরেন। মানুষকে এর সাথে পরিচিত করিয়ে দেন। প্রচলিত প্রচারমাধ্যমে প্রকাশিত কনটেন্টের চেয়ে আলাদা ধাঁচের হওয়ায় মানুষও এতে আকৃষ্ট হয়। এই আকর্ষণ এবং এর থেকে সৃষ্ট প্রভাবই তাঁর পুঁজি, যা কাজে লাগাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের প্রচারে তাঁকে কাজে লাগায়। মোটা দাগে এটি এবং সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে ভিউ বাবদ আসা ডলারই তাঁর আয়ের উৎস। এখানে রাফসানের কথা উদাহরণ হিসেবে এসেছে। তিনি ও তাঁর মতো সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সাররা সৎভাবে এমন আয় করতেই পারেন।
তবে প্রশ্ন থেকে যায় যে, এই ইনফ্লুয়েন্সাররা যেহেতু পণ্য ও সেবার প্রচারের মাধ্যমেই টাকা উপার্জন করেন, সেহেতু জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে–এমন কোনো পণ্যের প্রচার যদি তাঁরা করেন, তাহলে কী হবে? এর একটি নমুনা আমাদের সামনেই আছে। ইফতেখার রাফসানের ঘটনাই সাম্প্রতিকতম উদাহরণ।
মুশকিল হচ্ছে, প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যবসা বাণিজ্যে অনেক বদল এসেছে। বদল এসেছে এর প্রচারেও। ফলে পুরোনো আইন দিয়ে আর এসবকে ঠিক তদারকি করা যাচ্ছে না। আবার এই তদারকির প্রশ্নে নানা দেশের প্রশাসন অনেক সময় এমন কিছু নীতি তৈরি করে ফেলে, যা মোটাদাগে মানুষের বাকস্বাধীনতাতেই হস্তক্ষেপ করে বসে। অনেক দেশে সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশে বিধিনিষেধ বা মত প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখা হয়, যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। ফলে এটি খুবই সূক্ষ্ম একটি জায়গা, যেখানে বুঝেশুনে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এ ক্ষেত্রে ফ্রান্সের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ইউরোপিয়ান কনজিউমার সেন্টারে প্রকাশিত ফ্রান্সের এ সম্পর্কিত আইনটি এখানে উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালের ৯ জুন পাস হওয়া আইনটি তৈরিই করা হয়েছে সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের একটি কাঠামোর মধ্যে আনার লক্ষ্যে। সেখানে বলা হচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যারা বিভিন্ন পণ্যের প্রশংসামূলক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করছে। তারা তাদের দর্শক-শ্রোতা ও পাঠকদের বিভিন্ন পণ্য কিনতে উদ্বুদ্ধ করছে। পণ্য ও সেবার তালিকায় কী নেই? সবই আছে। কিন্তু এ ধরনের পণ্য ও সেবার প্রচারে তারা কোনো ধরনের ‘পেইড পার্টনারশিপ’ থাকার বিষয়ে ভোক্তাদের অবহিত করছে না।
ফ্রান্সে পাস হওয়া এ সম্পর্কিত আইনে বলা হচ্ছে, একজন ইনফ্লুয়েন্সারকে অবশ্যই তাঁর তৈরি কনটেন্টে মৌখিক বা লিখিতভাবে জানাতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হয়ে তিনি টাকার বিনিময়ে এই প্রচার চালাচ্ছেন। প্রতিটি বাণিজ্যিক কনটেন্টে অবশ্যই ‘বিজ্ঞাপন’ বা ‘বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব’ শব্দ লেখা থাকতে হবে। একইসঙ্গে কনটেন্টে ব্যবহৃত হ্যাশট্যাগে অবশ্যই এই শব্দগুলো থাকতে হবে।
একইসঙ্গে আইনটিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, ইনফ্লুয়েন্সাররা কী করতে পারবেন না। আইন অনুযায়ী, পাঠক-দর্শক ও শ্রোতাদের সংবেদনশীলতায় আঘাত করা যাবে না, ধর্ম, শরীরের ধরন, মতবাদ ইত্যাদি বিচারে কাউকে হেয় করা যাবে না, কোনো সহিংসতা উসকে দেওয়া যাবে না। শিশু-কিশোরদের লক্ষ্য করে তৈরি কনটেন্টের ক্ষেত্রে অবশ্যই অভিভাবকের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে হবে। পাশাপাশি প্রতিযোগী ইনফ্লুয়েন্সার বা পণ্যের বদনাম বা সে সম্পর্কে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রচার করা যাবে না।
শুধু তাই নয় এই আইনে ইনফ্লুয়েন্সারদের জন্য কিছু বিশেষ পণ্যের প্রচার একেবারে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক সার্জারি ও অ্যাসথেটিক মেডিসিন, আর্থিক পণ্য ও সেবা, জুয়া, নিকোটিনসমৃদ্ধ পণ্য, ক্রীড়া কোচিং ও ক্রীড়া ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কিত সেবা বা পণ্য ইত্যাদি।
সম্প্রতি হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউতে এ সম্পর্কিত একটি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ওই নিবন্ধে বলা হচ্ছে, সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদেরও এমন একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন, যেখানে অন্য বিপণন কর্মীদের মতো কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য শাস্তির আওতায় আসবেন। পাশাপাশি তাঁদের পেশাগত উৎকর্ষ, আয়, কাঙ্ক্ষিত ফল ইত্যাদিও একটি মানসম্পন্ন জায়গায় পৌঁছাবে। এর প্রয়োজনীয়তা এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, গত ২০ বছরে সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সাররা একেবারে শূন্য থেকে বলা যায় বাজারের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তাঁরা মানুষের খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, ক্রয় প্রবণতাসহ সবকিছুই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এখনো এটি ফ্যাশন, খাবার, ভ্রমণ, সৌন্দর্য ইত্যাদি শিল্পের সাথে বেশি যুক্ত থাকলেও সরকারি-বেসরকারি নানা সেবা, রাজনীতিসহ নানা বিষয় ও খাত এর সাথে ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে। ফলে এটিকে একটি নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই প্রয়োজন থেকেই ফ্রান্সে এ সম্পর্কিত আইনটি পাস হয়। এটি কেবলই একটি উদাহরণ নয়। বিশ্বের বহু দেশ এখন ফ্রান্সের মতো করে ভাবছে। বিশেষত ইউরোপের দেশগুলো সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসতে নানা ধরনের উদ্যোগ ও আলোচনা করছে। হয়তো খুব শিগগিরই বহু দেশে এ ধরনের বিধিমালা তৈরি হয়ে যাবে।
পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, বিশ্বের বিজ্ঞাপনী বাজার থেকে শুধু ইনফ্লুয়েন্সাররাই তুলে নিচ্ছেন ৩৫ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি। ইনফ্লুয়েন্সারদের এই বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে। বাংলাদেশেও এই বাজার ক্রমে বাড়ছে। বর্তমানে দেশি ইনফ্লুয়েন্সারদের বিজ্ঞাপনী বাজার তিন কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। এর আকার খুব দ্রুত গতিতে বাড়ছে। ফলে অর্থনীতি, প্রতিযোগিতা, জনস্বাস্থ্য ইত্যাদি বিবেচনায় এ সম্পর্কিত আইন বা বিধিমালা এখানে আসা জরুরি। আজ হোক বা না হোক, কাল তা হবে। তাই এ নিয়ে নানা অংশীজন এবং সমাজ ও বাজার বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলোচনা এখন থেকেই শুরু হওয়া জরুরি। বিশেষত অর্থনীতি ও বাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকায় এটি এড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। এ ক্ষেত্রে অংশীজনেরা বিলম্ব করলে হয়তো পরে একটি চাপিয়ে দেওয়া বিধিমালার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।
ফজলুল কবির: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


ইউটিউবার রাফসানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি
