কেমন ঢাকা চাই

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:২২ পিএম

আহা, সারা বছর যদি ঢাকা এমন থাকত। এই ঈদে যারা ঢাকায় ছিলেন এ উপলব্ধি তাঁদের। তবে নতুন নয়। ঈদ এলেই এমন এক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হন তাঁরা। কোথাও যানজট নেই, গাড়ির চাপ নেই, মানুষের ভিড় নেই, কেমন একটা নিস্তরঙ্গভাব। প্রচণ্ড গরমে অলস দুপুরের মতো। কোথাও যেতে গেলে একরাশ বিরক্তি মনে ভিড় করে না। বাসার বাইরে সওয়ারির জন্য অপেক্ষমাণ রিকশা বা সিএনজি, দরদামের জটিলতা কম। কারণ তাদের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম, ফলে নিত্যপণ্যের বাজারের বিক্রেতার মতো নিলে নেন, না নিলে না নেন–এমন কথা বলার সুযোগ নেই। টানাপড়েনের সংসারে ঘানি টানতে যাত্রীর সাথে দর-কষাকষির শেষ সুযোগটাও এই চালকদের হাতছাড়া হয়ে যায়। আর রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে ডাক দিলেই অল্প সময়ে দোরগোড়ায় হাজির প্রাইভেট কার। সত্যি বলতে ঈদের কটা দিন রাজধানীর বাসিন্দারা একটা ঘোরের মধ্যে থাকেন। এই ঘোরকে তাঁরা ভালোবাসেন। অর্থাৎ, বছরজুড়ে এমন ঢাকাই তাঁদের কাম্য। অবশ্য ছুটিতে থাকা গাড়ির চালক, গৃহকর্মী নিয়ে কিছুটা মনোকষ্ট কারও কারও থাকলেও থাকতে পারে। 

সত্যিই তো, বসবাসের জন্য এমন একটা নগরই চাই। চাই তো সবাই, কিন্তু হয় না কেন? কারণ অনেক, সমাধানও অন্যের হাতে। আর পাই না বলে অধরাকে ধরতে ছুটছি হাজার হাজার মাইল দূরের বিদেশ-বিভুঁইয়ে। কিন্তু দেশের ভেতরে পঞ্চাশ মাইল দূরে যেতে আমাদের অনীহা। অর্বুদপতি ব্যবসায়ী থেকে তাঁর অফিসে কর্মরত স্বল্প বেতনের অফিস সহকারী–সবাই থাকেন এ শহরে। এমন উদাহরণ দুনিয়ায় কমই আছে। তবে এই সহাবস্থানের মধ্যেও একটা গর্ব আছে। দেশের রাজধানীতে সবার সমান অধিকারের গর্ব। কিন্তু অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে স্বল্প আয়ের মানুষজনের কষ্ট ক্রমেই বেড়ে চলেছে। শুধু বাসা ভাড়া ও পরিবহন খরচে চলে যায় আয়ের বড় অংশ। বিদ্যুৎ-পানি-সন্তানের লেখাপড়া এসব ধরলে চলাই কঠিন। আর বড় কোনো অসুখ-বিসুখ হলে অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়াই নিয়মে পরিণত হয়েছে। এসব অসুন্দর তার ডালপালা মেলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে নিম্নবিত্তের জীবনকে।

একটু ভাবুন তো, এই বাস্তবতায় আমরা আর কত দূর যেতে পারব। ২০২২-এর আদমশুমারি বলছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি লোক বাস করে। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার কথা। কারণ সারা দেশ থেকে ঢাকায় সাময়িক অভিবাসী হওয়াদের হয়তো এর মধ্যে ধরাই হয়নি। আর রাজউকের সংজ্ঞায়িত ঢাকা মেগা সিটিতে দুই কোটি লোকের বেশি বাস। ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের পূর্বাভাষ বলছে, ২০৩৫ সালে ঢাকার লোকসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ। এখন থেকে হিসাব করলে হাতে আছে মাত্র ১১ বছর। এই সময়কালে ঢাকায় যে দেড় কোটির বেশি মানুষ বাড়বে, সেটা নিয়ে কি কেউ ভাবছি? এই বিপুলসংখ্যক মানুষের বাসস্থান, খাবার, পানি, পয়ঃনিষ্কাষণ, যাতায়াত–এসবের সংস্থান কোত্থেকে হবে? ঢাকার আয়তন কি বাড়ছে?

 ঈদ এলেই এমন এক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হন তাঁরা। কোথাও যানজট নেই, গাড়ির চাপ নেই, মানুষের ভিড় নেই, কেমন একটা নিস্তরঙ্গভাব। ছবি: সংগৃহীত
বরং অপরিকল্পিতভাবে বাড়তে বাড়তে রাজধানী ঢাকা আজ স্থূলতায় আক্রান্ত। অনেকটা নিম্নবিত্তের হঠাৎ বিত্তশালী হওয়ার মতো। বেহিসেবি খাবার খেতে খেতে পরিবারের সবাই স্থূলতা বা ওবেসিটিতে আক্রান্ত, যার পরিণামে শরীরে বাসা বেঁধেছে হাজারো ব্যধি। অনেক দিন ধরে ঢাকা ও এর আশপাশে জমির দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় এক শ্রেণির মানুষ হাতে পেয়ে যায় আলাদিনের চেরাগ। যা ভাঙিয়ে এখনো তারা চলছে। লোভ ও লাভের বেসাতি নিয়ে বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ায় পূর্ণ হয়ে গেছে সর্বনাশের ষোলকলা। 

এখানে সরকারে ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু ঢাকা-কেন্দ্রিক করে রাখায় মানুষ ছুটছে এদিকে। উপায় নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ১২-১৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় পৌঁছানো যায়। আকাশপথেও যোগাযোগ এখন অনেক ভালো। নামী-দামি শিক্ষাকেন্দ্র, চিকিৎসাসেবার অধিকাংশই ঢাকায়। পদ্মা সেতু হওয়ার পর অন্তত ২০টি জেলা থেকে দু ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় আসা যায়। এত গুণ যার, তার কাছেই তো মানুষ ভিড়বে। এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু এই ভিড়ের মাশুল কে কীভাবে দিচ্ছে, তা কি একবারও ভেবে দেখেছি। বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা শীর্ষস্থানীয়। আবার জীবনযাত্রার ব্যয়ে একেবারে ওপরের সারিতে। কী চমৎকার বৈপরীত্য। অর্থাৎ, যারা ঢাকায় থাকেন তাঁরা যাপিত জীবনের জন্য বেশি পয়সা ব্যয় করেও উপহার পাচ্ছেন একটা বাসের অযোগ্য শহর। কীভাবে সম্ভব? সাধারণ হিসেবই তো বলে, বেশি টাকা দিলে ভালো জিনিসটা পাওয়া যায়। তাহলে ঢাকা ব্যতিক্রম কেন? এই কেন-র উত্তর লুকিয়ে আছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। এই শহরে আমরা এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, যেখানে নিম্নবিত্তরা অতিরিক্ত অর্থব্যয় করে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে উচ্চবিত্তরা গাঁটের কড়ি খরচ করে কিনতে পারছে না তাদের প্রত্যাশিত নাগরিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। ফলে তারা বিদেশমুখী। সব মিলিয়ে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, না ঘরকা, না ঘাটকা। নিম্ন-মধ্য-উচ্চবিত্তের পকেট কেটে তাদের সবাইকে নাগরিক সুযোগ-সুবিধাহীন একটা শহরে বাস করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

ভিড়ের মাশুল কে কীভাবে দিচ্ছে, তা কি একবারও ভেবে দেখেছি। বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা শীর্ষস্থানীয়। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের সর্বত্র নগরজীবন সম্প্রসারিত হচ্ছে। শহুরে জীবনের আরাম-আয়েশ, সুযোগ-সুবিধা প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ধাবিত। এ কারণেই দেশের ১৮ কোটি মানুষের একটা বড় অংশ নাগরিক হতে চায়। নিজের জন্য, সন্তানের জন্য। এই প্রক্রিয়ায় বিরাম টানা সম্ভব না। সেক্ষেত্রে উত্তুঙ্গ চাহিদার বিপরীতে যোগান বাড়াতে হবে। আর এই যোগান বাড়াতে প্রথম কাজটি হবে ঢাকার অতিবৃদ্ধিতে রাশ টানা। শুধু রাশ টানা নয় বরং দাড়ি টানা দরকার। জোর দিয়ে বলা, ঢাকার বাড়বাড়ন্তের এখানেই ইতি।

ঢাকার আশাপাশে দেখুন কোনো বড় শহর নেই। অতি প্রাচীন ব্যবসা-বাণিজ্য সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জের কথা বলতে পারেন। কিন্তু সত্যিই বলুন তো, ঢাকার তুলনায় নারায়ণগঞ্জ কোথায়? পাশেই সাভার। একেবারে বিপাকে না পড়লে ঢাকা ছেড়ে সেখানে থাকার কথা কেউ ভাবে না। আরেকটু এগোলে ধামরাই, মানিকগঞ্জ–এখনো একটা সাধারণ মফস্ফল ছোট শহরে বৈ কিছু না। তৈরি পোশাক ও অন্যান্য শিল্পের কারণে গাজীপুর দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। অপ্রতুল নাগরিক সুবিধাকে সঙ্গী করে বিপুল জনগোষ্ঠীর বাস সেখানে। টঙ্গীকেও এর সাথে মিলিয়ে দেওয়ায় গাজীপুর এখন দেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশন। ঢাকার অদূরে একদা সমৃদ্ধ জনপদ বিক্রমপুর, অধুনা মুন্সীগঞ্জ। কী আছে সেখানে? 

আপনি ভারতের রাজধানীর নয়াদিল্লির কথাই ধরুন। এর চারপাশে নয়ডা, গাজীয়াবাদ, গুরুগ্রামের (গুরগাঁও) মতো শহর গড়ে উঠেছে। এই শহরগুলোর সাথে দিল্লির যোগাযোগ ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যে, তাতে কেউ মনেই করে না তারা দিল্লিতে নেই। বরং অনেকেই দিল্লির চেয়ে আশাপাশের এসব শহরে থাকতে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করে। কলকাতায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের আছে। সেখানে সকাল হলেই চারপাশ থেকে লোক ঢুকতে থাকে ট্রেন ও বাসে। সন্ধ্যা নামতেই শহর প্রায় ফাঁকা। বলা হয়ে থাকে কলকাতা শহরে প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় কোটি লোক বাইরে থেকে আসে। ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ নিজের বাড়িতে থেকে সুস্থ জীবন কাটাতে পারছে। আমাদের খামতি বা ব্যর্থতা–যা বলি সেটা এখানেই।

তবে শুধু ঢাকার আশাপাশে কয়েকটা বড় শহর গড়ে তোলাই সমাধান না। দেশের বিভাগীয় শহর খুলনা, ময়মনসিংহ, রংপুর, বরিশাল, রাজশাহী বা জেলা সদরগুলো কেন ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো দেশের মানুষের পছন্দের গন্তব্য হবে না? এদের থেকে মফস্বলীয় শহরের চরিত্র মুছে দিয়ে নাগরিক জীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলাই একমাত্র পথ। তাহলেই বাসের অযোগ্য, ব্যয়বহুল ঢাকা বাঁচবে। শুধু ঈদের কয়দিন নয়, সারা বছর ঢাকাবাসী সুখ ও স্বস্তির ঘোরে থাকতে পারবে। 

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক সকাল। বন্যপ্রাণী দেখার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম ঢাকার উত্তরা, দিয়াবাড়ি, গোড়ানচটবাড়ী, আফতাবনগর ও খিলখেত এলাকায়। গত এক দশক ধরে ঢাকার প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে আমার পরিচয়। এই শহরের...
ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের একটি বড় অংশের জয়ের বিপরীতে বিরোধী পক্ষগুলোর নানা অভিযোগ রয়েছে খোদ নির্বাচন নিয়েই। কিন্তু এসব অভিযোগের উল্টো দিকে যখন ভিপি-জিএস-এজিএস পদে বিজয়ীর...
আমরা প্রায়ই দুটি শব্দ শুনি–‘নির্মোহ’ এবং ‘সততা’। কিন্তু বাস্তব জীবনে কতজন মানুষকে আমরা সত্যিই নির্মোহ ও পরিশুদ্ধ রূপে দেখতে পাই? কথায় নয়, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সততা বজায় রাখেন–এমন মানুষ কি...
সমাজের চোখে শিক্ষার্থী কী? এক কথায়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। একদিন তারা সমাজ গড়বে, রাজনীতি বলুন, অর্থনীতি বলুন, কিংবা চিকিৎসা-সশস্ত্রবাহিনী-প্রশাসন বলুন… পুরো সমাজের নেতৃত্ব দেবে, এই স্বপ্ন দেখে বলেই তো...
যারা একসময় হরতাল অবরোধ দিয়ে দেশকে অচল করে দেওয়া হবে বলেছিল, আজকের বিরোধী দল তাদেরই সঙ্গী বলে মন্তব্য করেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। শুক্রবার রাতে...
দেশে টানা কয়েক বছর ধরে বাড়ছে দারিদ্র্যের হার। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, চার বছরে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ৮০ লাখ মানুষ। একই সঙ্গে বেড়েছে ধনী-গরিব আয় বৈষম্য। দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে থাকা প্রায় ৬ কোটি ২০...
ইয়েমেনের তাইজে হুতি বিদ্রোহীদের ১৬ যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করেছে সেনাবাহিনী। এছাড়া ৮ ঘণ্টার দীর্ঘ লড়াইয়ে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে বলেও জানায় তারা।
জুলাই সনদ সই হওয়ার এক বছর আজ। বাস্তবায়ন নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা। সরকার বারবার বলেছে, নোট অব ডিসেন্টসহ সনদ বাস্তবায়ন করবে তারা। তবে একথা মানতে নারাজ বিরোধীরা। দুপক্ষের মধ্যে সংবিধান সংশোধন আর সংস্কার...
লোডিং...
পঠিত নির্বাচিত

এলাকার খবর