ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের ধলেশ্বরী টোলপ্লাজায় সেতুর টোল পরিশোধের জন্য দাঁড়িয়ে ছিল একটি মাইক্রোবাস, একটি প্রাইভেটকার ও একটি মোটরসাইকেল। মাওয়ামুখী ওই বাহনগুলোকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় একটি যাত্রীবাহী বাস। এতে একই পরিবারের চারজনসহ নিহত হয়েছে ছয়জন।
গত ২৭ ডিসেম্বর শুক্রবার ছুটির দিন বেলা ১১টার দিকে ঘটে এ দুর্ঘটনা ঘটে। মুহূর্তেই ছয়টি প্রাণ শেষ হয়ে গেল! এটি কি আসলেই দুর্ঘটনা নাকি অন্যকিছু? প্রাথমিক তথ্যে, চালকের অসর্তকতা, মালিকপক্ষের গাফিলতি আর কর্তৃপক্ষের অবহেলা উঠে এসেছে এর পেছনে।
সড়কে প্রাণহানি যেন এ দেশে খুব সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক বাহনের ধাক্কায় অন্য বাহনের আরোহীর প্রাণ যাওয়া, সড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কারও ওপর গাড়ি উঠে যাওয়া কিংবা সড়ক বিভাজকে থাকা পথচারীর ওপরও কখনও কখনও উঠে যায় নিয়ন্ত্রণ হারানো যান।
এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সঠিক হিসাব পাওয়াটা কঠিন। কেউ দুর্ঘটনাস্থলেই মারা যান, কেউ মারা যান হাসপাতালে নেওয়ার পথে, কেউবা হাসপাতাল চিকিৎসা নেওয়া অবস্থাতেই মারা যান। তাই হিসাবটা সাধারণত হয়, দুর্ঘটনাস্থলে নিহতদের নিয়েই। সে হিসাবেও সড়কে বছরে প্রাণহানির সংখ্যা অনেক।
২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবার প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশে প্রায় ৩৩ হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩৫ হাজার ৩৮৪ জন নিহত হয়েছেন, যার ১৩ শতাংশই শিক্ষার্থী।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, কেবলমাত্র ফায়ার সার্ভিসের হিসাবেই, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে ২০২৩ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালেরর ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩টির বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৬ জন, আহত হয়েছেন ৮০ জন।
এক্সপ্রেসওয়েটিতে গত ২৭ ডিসেম্বর ছয়জন নিহতের ঘটনায় দুর্ঘটনার দায়ী বাসটির চালক মোহাম্মদ নুরুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গ্রেপ্তার করা হয়েছে বেপারী পরিবহনের বাসের মালিক ডাবলু বেপারীকেও। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বাসচালক জানিয়েছেন, ঘটনার সাত দিন আগে থেকে গাড়িটি গ্যারেজে ছিল। গাড়ির ব্রেক ও ক্লাচ প্লেটের সমস্যা ছিল। গাড়ির মালিক ডাবলু বেপারির ছেলে পারভেজ তাঁকে এ অবস্থায় গাড়ি রাস্তায় নামাতে চাপ দেন। পারভেজ তাঁকে বলেন, ‘গাড়ি চালালে ঠিক হয়ে যাবে।’ দুর্ঘটনার সময় বাসটিকে অনেকবার ব্রেক কষেও থামানো যায়নি বলে দাবি করেছেন চালক।
চালক স্বীকারোক্তিতে আরও বলেন, মালিকের চাপে শুক্রবার গাড়ি নিয়ে বের হন। গাড়িতে যাত্রী ছিলেন ৬০ জন। ধলেশ্বরী টোল প্লাজায় যাওয়ার আগে গাড়ির গতি ছিল ৫৫ কিলোমিটার। টোল প্লাজায় ঢোকার আগে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণের অনেক চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। গাড়ির ব্রেক ফেল ছিল। গিয়ার পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও তা করা যায়নি। পরে টোল প্লাজায় গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায় গাড়িটি।
আর ১০টি দুর্ঘটনার পর যেমন হয়, এবারও তাই-ই হয়েছে। দু-একদিন গণমাধ্যমে খবর, ফেসবুকে সমবেদনা জানিয়ে পোস্ট।
অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, রিমান্ড। এরপর হয়তো খবরও থাকবে না দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের। যারা হতাহত হয়েছেন, বহু বছর তাঁদের স্বজনদের চোখ মুছতে মুছতে কেটে যাবে।
এই যে দুর্ঘটনা, এই যে সড়কে প্রাণহানি–এর দায় কী কেউ নেবে না? কমবে না এমন প্রাণহানির ঘটনা? একটু সচেতন হবে না কেউ? বিশ্লেষকদের মতে, সড়ক, যানবাহন ও ব্যবহারকারী–এই তিনটি উপাদানের সমন্বয়ে যদি ব্যাঘাত ঘটে তাহলেই দুর্ঘটনা ঘটে। একটির সিস্টেমে ত্রুটি থাকলে ঘটে দুর্ঘটনা, ঘটে প্রাণহানি।
এক্সপ্রেসওয়ের দুর্ঘটনাটি ঠিক কী কারণে ঘটেছিল তার নিশ্চিত উত্তর পেতে হয়তো আরও সময় লাগতে পারে। উত্তর ঠিকঠাক পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ করা খুব অস্বাভাবিক কিছু না। তবে একটি যানবাহন যেন দুর্ঘটনায় না পড়ে সে জন্য যাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হয়, তারা কী বেপারী পরিবহনের বাসটি রাস্তায় বের হওয়ার সময় ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন?
যে বাসটির কারণে ছয়জনের প্রাণ গেছে, যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য যদি এটি গ্যারেজে ফেলে রাখা হয়; তবে এই ত্রুটি না সারিয়ে কেন সড়কে বের করা হলো? চালকের ভাষ্য যদি সত্যি হয়, তবে মালিকপক্ষ আসলে এই ত্রুটিকে গুরুত্বই দেয়নি। ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট বোঝা যায়, চালক নুরুদ্দিনের বরাতে বাসটির মালিকের ছেলে পারভেজের বক্তব্যে। তিনি নাকি বলেছিলেন,‘গাড়ি চালালে ঠিক হয়ে যাবে।’ এ হিসেবে দুর্ঘটনার দায় তাঁর ওপর যায় অনেকটাই।
গাড়ির ব্রেক ও ক্লাচ প্লেটের সমস্যা থাকার পরও সেই গাড়ি নিয়ে চালক কেন রাস্তায় বের হলেন? শুধুই কি চাকরি বাঁচানোর জন্য? বিষয়টি কিন্তু মোটেও তা নয়। গাড়ির সমস্যা থাকলে দুর্ঘটনা ঘটবে, হতাহত হওয়ার আশঙ্কা তার নিজেরও থাকে। সেক্ষেত্রে বলাই যায়, চালক আসলে গুরুত্বই দেননি বিষয়টি নিয়ে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাসচালক নুরউদ্দিন জানিয়েছেন, তার লাইসেন্স নবায়ন ছিল না এবং তিনি গাঁজা সেবন করতেন। তবে এবার বাস চালানোর সময় তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন না যে চালকের লাইসেন্স নবায়ন নেই, তিনি কীভাবে রাস্তায় বের হন গাড়ি চালাতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তিনি ধরা পড়েননি; বিষয়টি একটু অন্যরকমই মনে হচ্ছে। হয়তো এমনও হতে পারে, লাইসেন্সের বিকল্প কাগজপত্র হয়তো জোগাড় করে রেখেছিলেন কোনো অসৎ উপায়ে। এমন অনিয়মের খবর প্রায়ই আসে গণমাধ্যমে। বিশেষ করে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে, পত্রিকায় এ সংক্রান্ত খবরে দেখা যায়, চালকের লাইসেন্সই ছিল না। কখনো কখনও তো এমনও হয়, গাড়ি চালাচ্ছিলেন চালকের সহকারী। তার ক্ষেত্রে লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ এসব তো দূরের কথা।
অবশ্য এ-ও আরেকটি তথ্য যে, গাড়ি দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকই দায়ী থাকেন না সবসময়। এর পেছনে থাকেন আরও হয়তো কয়েকজন। ২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘সড়ক দুর্ঘটনায় চালকের দায় কতটুকু?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। সেখানে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এককভাবে শুধু চালকেরা দায়ী থাকেন না। চালকের পাশাপাশি সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রকৌশলী, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাসমালিক, পথচারী–সবাই সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এসব বিষয়ও ভেবে দেখা দরকার।
গত বছরের ১৩ মার্চ ড্রাইভিং লাইসেন্সের অনিয়মসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের জন্য চালক ও তার সহকারীদের জেল-জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে সড়ক পরিবহন (সংশোধন) আইন, ২০২৪ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ওইদিন সভা শেষে জানানো হয়, সড়ক পরিবহন আইনের তিনটি ধারার অপরাধ অজামিনযোগ্য ছিল। এখন একটি ধারার অপরাধকে অজামিনযোগ্য রেখে অন্য দুটিকে জামিনযোগ্য করা হয়েছে।
খসড়ায় ১০৫ ধারা অজামিনযোগ্যই রাখা হয়। দুর্ঘটনাসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তির কথা আছে এই ধারায়। এতে বলা হয়েছে, এই আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত হলে বা তাঁর প্রাণহানি ঘটলে, সে-সংক্রান্ত অপরাধগুলো দণ্ডবিধিতে থাকা বিধান অনুযায়ী অপরাধ বলে গণ্য হবে। তবে শর্ত হিসেবে বলা আছে, দণ্ডবিধিতে যা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কেউ গুরুতরভাবে আহত হলে বা প্রাণহানি ঘটলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আইন চলবে আইনের গতিতে। দুর্ঘটনায় দায়ীরা শাস্তি পাবে। তবে এত কিছুর পরও দুর্ঘটনায় যারা প্রাণ হারালেন,তারা তো আর ফিরবেন না। যারা আহত হলেন; তাদের এ ক্ষতিও পূরণ হবে না কখনো। তাই আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি এমন সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দরকার সচেতনতা। সব পক্ষের সচেতনাই পারে, এই অপূরণীয় ক্ষতি ঠেকাতে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের টোলপ্লাজায় দুর্ঘটনা, আটক ২
