সূর্যের মতো নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী। ২০২৩ সালেও একই কাজ করে দেখান তাঁরা। পাওয়া যায় আগেরবারের চেয়ে বেশি শক্তি। এর মধ্য দিয়ে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির উৎস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
কিন্তু এই সাফল্য চীনকে বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছে। জ্বালানির এই খাত বাণিজ্যিকীকরণ করতে আমেরিকার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি এই দেশ।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, ২০২২ ও ২০২৩ সালে দুটি পরীক্ষাই ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লাইভমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ন্যাশনাল ইগনিশন ফ্যাসিলিটিতে (এনআইএফ) চালান বিজ্ঞানীরা।
সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান বলছে, সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটে। বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীতেই নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় সেই বিক্রিয়া ঘটানোর কৌশল উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। এই পরীক্ষার সফলতার মধ্য দিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে ফ্রান্সের একটি এলাকায় নিউক্লিয়ার ফিউশনের ডিভাইস বানানোর তোড়জোর চলছে। এটি হতে যাচ্ছে এ ধরনের সবচেয়ে বড় ডিভাইস। এর মাধ্যমে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে বানানো যাবে জ্বালানি। সংবাদমাধ্যম ইউরো নিউজের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা যায়।
কী করছে চীন?
এশিয়া টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাণিজ্যিক জ্বালানি হিসেবে এই নিউক্লিয়ার ফিউশনকে কাজে লাগাতে চাইছে চীন। কাজে লাগাতে চাইছে বললে ভুল হবে, রীতিমতো আমেরিকাকে টেক্কা দেওয়াও শুরু করেছে তারা। ফিউশন প্রযুক্তির জন্য ব্যাপক গবেষণার অংশ হিসেবে শিগগির হেফেই প্রদেশে গবেষণাগার খুলছে চীন। শুধু গবেষণাগার নয়, এটি আসলে বাণিজ্যিকভাবে এই জ্বালানি ব্যবহারেরই অংশ।
এ ছাড়া এই জ্বালানি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে আরও কয়েকটি প্রজেক্ট। এ তালিকায় রয়েছে প্রোটোটাইপ ফিউশন পাওয়ার প্ল্যান্ট চায়না ফিউশন ইঞ্জিনিয়ারিং টেস্ট রিয়্যাক্টর, বার্নিং প্লাজমা টেস্ট রিয়্যাক্টর। এর মধ্যে ২০২৭ সালে কার্যক্রম শুরু করবে বার্নিং প্লাজমা টেস্ট রিয়্যাক্টর। এ ছাড়া চীনের ইএএসটি নামের আরেকটি রিয়্যাক্টরে রয়েছে সবচেয়ে বেশি কাঁচামাল। এর বাইরেও দেশটির বিভিন্ন স্থানে রয়েছে আরও কয়েকটি প্রজেক্ট।
এসব প্রজেক্ট এটাই প্রমাণ করে যে, এই নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে জ্বালানি কার্যক্রমকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছে চীন।
আমেরিকা কোথায়?
এশিয়া টাইমসের এ‑সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে সাংবাদিক ও কলাম লেখক জোনাথন টেনেনবাউম বলছেন, মার্কিন সরকার এখনো এই জ্বালানি খাতে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। এ কারণে প্রায় ৭৫ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা এই নিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণা ও প্রয়োগে হয়তো আধিপত্য হারাতে পারে আমেরিকা।
তবে আমেরিকার জন্য ইতিবাচক সংবাদ হলো, দেশটির বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই কার্যক্রমে বিনিয়োগ করছে। এর সুফল খুব দ্রুতই হয়তো তারা পেতে পারে। এ ব্যাপারে ফিউশন ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (এফআইএ) প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু হল্যান্ড সংবাদমাধ্যম এশিয়া টাইমসকে বলেন, আমেরিকা কিন্তু এই ধরনের কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এতে তারা জাপান ও যুক্তরাজ্যকেও যুক্ত করেছে। আশা করা যাচ্ছে রিয়্যাক্টর বানাতে বেশি সময় লাগবে না।
এই প্রতিযোগিতায় ২০ বছর আগেও চীনের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ইন্টারন্যাশনাল থার্মোনিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্টাল রিয়্যাক্টরে (আইটিইআর) যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে তারা প্রতিযোগিতায় আসে। আর দ্রুত বাড়াতে থাকে বিনিয়োগ। গবেষণার পাশাপাশি বাণিজ্যিকীকরণের দিকেও মনোযোগ দিয়েছে তারা। এ কারণেই দ্রুত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।
এতে বাড়তি সুবিধা হিসেবে তারা পেয়েছে আমেরিকা, জাপান ও বিশ্বের বিভিন্ন ল্যাবে কাজ করা চিনা গবেষকদের।
আসলে কে এগিয়ে, আমেরিকা নাকি চীন?
এই তুলনা টানতে গিয়ে এশিয়া টাইমসের এ‑সংক্রান্ত প্রতিবেদনে সাংবাদিক ও কলাম লেখক জোনাথন টেনেনবাউম দুটো পয়েন্ট উল্লেখ করেন, বাজেট ও বাণিজ্যিকীকরণে ধীরগতি।
পরিসংখ্যান বলছে, টানা সাত বছর ধরে মার্কিন জ্বালানি বিভাগের ফিউশন এনার্জি সায়েন্স প্রোগ্রামে বাজেট বাড়িয়েই যাচ্ছে মার্কিন কংগ্রেস। এতে তাদের কোনো আপত্তিও থাকে না। কম হোক কিংবা বেশি, বাজেট বাড়বেই। এই বাজেট রাখার সময় কিন্তু বাণিজ্যিকীকরণের কথা তেমনিভাবে উল্লেখ করা হয় না। আর বাণিজ্যিকীকরণের গতিও বেশ ধীর।
চিরায়তভাবেই এসব খাতে বিনিয়োগ বেশি লাগে। প্রচলিত আছে, খরচ কমানোর জন্য প্রায়ই চাপ আসে মার্কিন জ্বালানি বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পের ওপর। এ কারণে বাণিজ্যিক পথে হাঁটার গতি হয় শ্লথ। এর পরিবর্তে বেসিক সায়েন্স ও প্লাজমা ফিজিক্সের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফিউশন জ্বালানিকে বাণিজ্যিকীকরণে এসব কিন্তু তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।
এখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংযুক্তিকে এগিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই হয়তো। এ কারণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ‘ইনফিউজ’ ও ‘ফায়ার’ নামের প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। চীনের কিন্তু এত কিছু ভাবার সময় নেই। তারা চিন্তা করে ব্যবসায়িকভাবে। এ নিয়ে আগেও আমেরিকাকে বলেছিলেন দেশটির গবেষক পল ডাবার। এ কারণে ২০২১ সাল থেকে শুরু হয় মার্কিন তোড়জোর। কিন্তু লাভ হয়নি। এ খাতে বাজেট সেভাবে বাড়েনি।
মার্কিন গবেষকদের মোদ্দা কথা হচ্ছে, আপনার কাছে পরিকল্পনা রয়েছে। আপনাকে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। আমেরিকাকে এ খাতে বাজেট বাড়াতে হবে। পরিকল্পনা করতে হবে বিভিন্ন রিয়্যাক্টর বানানোর। তাতে বেসরকারিভাবেও বিনিয়োগ আসবে হু হু করে। আর তাতে চীনের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া সহজ হবে।
যে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া নিয়ে এত প্রতিযোগিতা হচ্ছে, সে ব্যাপারে জেনে নেওয়া যাক।
মার্কিন সম্প্রচার মাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সূর্যের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটে। উপযুক্ত পরিবেশে যখন দুই বা ততোধিক পরমাণু মিলে একটি বড় অণুতে পরিণত হয়, সেটিকে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া। এ সময় তাপ আকারে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচলিত পদ্ধতিতে যে পরিমাণ দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয়, নিউক্লিয়ার ফিউশনের ক্ষেত্রে ততটা হয় না। ফলে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পৃথিবীতে নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটানো গেলে এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব অসীম জ্বালানি উৎপাদন করা যাবে। এ প্রক্রিয়ায় কার্বন নির্গমন বা তেজস্ক্রিয় নিঃসরণের ঝুঁকিও কমবে।


খবরের ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব বেড়েছে
রোবোট্যাক্সি, অপটিমাসসহ ইলন মাস্কের আলোচিত সেরা ৬ প্রযুক্তি
