কোরবানি ঈদে সামাজিক মাধ্যমে বেশ সরব ছিল সাদা রঙের অ্যালবিনো মহিষ। নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। বিশাল আকৃতির এই মহিষটির ট্রাম্পের মতো মাথায় সাদা চুল থাকায় দ্রুতই ভাইরাল হয়ে ওঠে নেট দুনিয়ায়। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে তার ছবি ও ভিডিও। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশি দর্শকদেরও নজর কেড়েছিল সেই মহিষ।
সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিপ্টো অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে ‘বাফডন কয়েন’ বা বাফালো ডন। সেটি মূলত বাংলাদেশের ভাইরাল সাদা মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। যদিও কয়েনটির পেছনে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠাতা দলের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। প্রকল্পটির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এটিকে কমিউনিটি বেজড মিম কয়েন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ভাইরাল থেকে ভার্চ্যুয়াল কয়েন
ডিজিটাল যুগে কোনো ঘটনা, ব্যক্তি বা প্রাণীর জনপ্রিয়তা অনেক সময় বাস্তবতার সীমানা ছাড়িয়ে নতুন অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে। ইন্টারনেট সংস্কৃতিতে এটিকে বলা হয় ‘মিম ইকোনমি’।
এর আগে একটি কুকুরের ছবি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হওয়া মিম কয়েন বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি করেছে। নাম ‘ডোজকয়েন’। যা ইলন মাস্কসহ বড় বড় বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার আলোচনায় এসেছে বাফডন কয়েন।
কেন এত আলোচনা?
ক্রিপ্টো বাজারে প্রতিদিন শত শত নতুন টোকেন বা কয়েন চালু হয়। এর মধ্যে অধিকাংশই খুব দ্রুত হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু কয়েন হয় ব্যতিক্রমী। তার গল্প, শক্তিশালী কমিউনিটি বা অভিনব মার্কেটিং কৌশলের কারণে আলাদা করে নজর কেড়ে নেয়। বাফডন কয়েনের ক্ষেত্রেও ঘটেছে তেমনটাই।
একদিকে রয়েছে ভাইরাল একটি বাস্তব গল্প। অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় সমর্থকগোষ্ঠী। এই দুইয়ের সমন্বয়ে কয়েনটি নিয়ে দ্রুত আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
অনেক বিনিয়োগকারী এটিকে শুধু একটি মিম কয়েন হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পেও পরিণত হতে পারে।
মিম কয়েন কেন জনপ্রিয়?
প্রচলিত অর্থনীতির চোখে অনেক মিম কয়েনের মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ এসব প্রকল্পের বড় কোনো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বা ব্যবহার থাকে না। তবুও মিম কয়েন সফল হয় একটি কারণে। আর সেটি হলো কমিউনিটি।
যখন হাজার হাজার মানুষ একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে এবং নতুন বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করে, তখন সেই প্রকল্পের বাজারমূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশ্বের সব পরিচিত মিম কয়েনগুলোও ঠিক এভাবেই জনপ্রিয় হয়েছে। বাফডনের সমর্থকেরাও একই ধরনের কমিউনিটি শক্তির ওপর জোর দিচ্ছেন।
বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কারণ
ক্রিপ্টো বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ সবসময় এমন প্রকল্প খোঁজেন। যেগুলোর বর্তমান মূল্য কম হলেও ভবিষ্যতে বড় প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের ধারণা, প্রতিষ্ঠিত কয়েনগুলোর তুলনায় ছোট প্রকল্পে ঝুঁকি বেশি হলেও লাভের সম্ভাবনাও তুলনামূলক বেশি।
এই মানসিকতার কারণেই নতুন কয়েনগুলো দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। বাফডন কয়েনও সেই আগ্রহের বাইরে নয়। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে কয়েনটির নাম ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই এই কয়েনটিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
তবে ঝুঁকিও কম নয়
যদিও সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তবে নতুন ক্রিপ্টো প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকিও অত্যন্ত বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভাইরাল হওয়া বা আলোচনায় থাকার কারণে কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করা উচিত নয়।
প্রথমে দেখতে হবে প্রকল্পটির বাস্তব ব্যবহার কী, ডেভেলপমেন্ট টিম কারা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, কমিউনিটি কতটা সক্রিয়, ট্রেডিং ভলিউম ও লিকুইডিটি কেমন। এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশে ক্রিপ্টো নিয়ে আলোচনা
বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে দেশের কোনো ভাইরাল ঘটনা বা প্রাণীকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত একটি টোকেন তৈরি হওয়ার ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না। এই কারণেই বিষয়টি অনেকের কাছে আগ্রহের।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেখিয়ে দেয় যে ইন্টারনেট সংস্কৃতি এখন কত দ্রুত বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলতে পারে।
একসময় একটি খামারে থাকা মহিষ ছিল শুধুই একটি প্রাণী। পরে সেটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। আর এখন সেই গল্পকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একটি ডিজিটাল সম্পদ, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের বিষয়।
ভবিষ্যৎ কী বলছে?
বর্তমান অবস্থায় বাফডনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন। যদি প্রকল্পটি শুধু ভাইরাল গল্পের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে সময়ের সঙ্গে আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে যদি শক্তিশালী কমিউনিটি গড়ে তোলা যায়, এতে নতুন ব্যবহারিক সুবিধা যুক্ত হয় এবং প্রকল্পের উন্নয়ন ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে, তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।
ক্রিপ্টো বাজারের ইতিহাস বলছে, অনেক সময় হাস্যরস বা মিম থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পও বড় সাফল্য পেয়েছে। আবার অনেক আলোচিত কয়েন কয়েক মাসের মধ্যেই হারিয়ে গেছে।
বাংলাদেশের সেই ভাইরাল সাদা মহিষ একসময় সামাজিক মাধ্যমের আলোচনার বিষয় ছিল। এখন সেই গল্পের অনুপ্রেরণায় তৈরি একটি ডিজিটাল টোকেন ক্রিপ্টো বাজারে নতুন কৌতূহল তৈরি করেছে।
এটি কি শুধুই ক্ষণস্থায়ী হাইপ, নাকি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় প্রকল্প? তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ডিজিটাল যুগে একটি ভাইরাল গল্প কখন যে কোটি মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। আর কখন তা অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করে। তবে এটি আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। আর সেই কারণেই বাংলাদেশের সেই সাদা মহিষ এখন শুধু খামারের নয়, ক্রিপ্টো বাজারেরও আলোচিত নাম।



