মঙ্গল গ্রহ থেকে ডেটা বা তথ্য পরিবহণে গত কয়েক দশক ধরে নিজেদের তৈরি রিলে অরবিটার (মধ্যবর্তী যোগাযোগকারী মাধ্যম) ও মহাকাশযান ব্যবহার করে আসছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। কিন্তু এবারে সংস্থাটি এই পদ্ধতি থেকে সরে এসে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য সরবরাহের সেবা কিনে নিতে চাইছে। ঠিক যেমনটা তাঁরা রকেট উৎক্ষেপণ ও নভোচারী পরিবহণের ক্ষেত্রে করে থাকে।
ডেটা বা তথ্য পরিবহণে নাসা’র এমন কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যেই মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে মঙ্গলে একটি ডেটা পাইপলাইন তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে নিরবচ্ছিন্ন তথ্য সরবরাহ বা ডেটা পরিবহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ডেটা পাইপলাইন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
শীর্ষ মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যেই মঙ্গল গ্রহে তাঁদের মিশনগুলোকে অনলাইনে রাখতে বিভিন্ন উপায় প্রস্তাব করেছে। এখানে নাসা’র কাছ থেকে একটি চুক্তি বাগিয়ে নেওয়াই মূল লক্ষ্য নয়, বরং মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে ডেটা আদানপ্রদানের পুরো মাধ্যমটির নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে প্রতিষ্ঠানগুলো। সেজন্যই তথ্য পরিবহণে একটি টেকসই মাধ্যম (ডেটা পাইপলাইন) গড়ে তুলতে চায় তাঁরা।
নাসা’র এই পদক্ষেপের অর্থ হচ্ছে, মঙ্গলের সাথে তথ্য আদানপ্রদান বা ডেটা যোগাযোগের পুরোনো পদ্ধতি থেকে সরে এসে একটি নতুন, প্রতিযোগিতামূলক মডেল গ্রহণ করা। এক্ষেত্রে তাঁদের নিজস্ব সম্পদ ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো উভয়ই ব্যবহার করা হবে এবং নতুন মডেলটি পর্যায়ক্রমে তাঁদের বর্তমানের বিচ্ছিন্ন রিলে নেটওয়ার্কের স্থলাভিষিক্ত হবে।
বর্তমানে মঙ্গল গ্রহ থেকে ডেটা আদানপ্রদানের জন্য নাসা’র ব্যবহৃত রিলে নেটওয়ার্কটি দুটি ধাপে কাজ করে। প্রথম ধাপে, মার্স রিকনাইসান্স অরবিটার ও ম্যাভেন-এর মতো মহাকাশযানগুলো মঙ্গল গ্রহের চারপাশে ঘুরতে থাকে। এই অরবিটারগুলো মঙ্গলের পৃষ্ঠে থাকা রোভার (যেমন কিউরিওসিটি ও পারসিভিয়ারেন্স) এবং ল্যান্ডার (যেমন ইনসাইট) মহাকাশযানের কাছ থেকে ডেটা বা তথ্য সংগ্রহ করে।
উল্লেখ্য, রোভার বা ল্যান্ডার মহাকাশযানগুলো সরাসরি পৃথিবীতে ডেটা পাঠাতে পারে না, কেননা তাঁদের অ্যান্টেনা ততটা শক্তিশালী নয়। তাই মঙ্গল গ্রহ সম্পর্কিত বিভিন্ন ডেটা তাঁরা প্রথমে অরবিটারগুলোকে পাঠায়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে অরবিটারগুলো এই ডেটা তাঁদের নিজস্ব শক্তিশালী অ্যান্টেনা ব্যবহার করে পৃথিবীতে অবস্থিত ডিপ স্পেস নেটওয়ার্কের (ডিএনএস) বিশালাকার অ্যান্টেনাগুলোতে প্রেরণ করে থাকে।
নাসা’র রিলে মহাকাশযানগুলো এখনও সচল আছে এবং বেশ ভালোভাবেই কাজ করছে। কিন্তু তথ্য আদানপ্রদান প্রক্রিয়ায় এগুলোকে কখনোই স্থায়ী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেনি নাসা। ২০৩০ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত ম্যাভেন মহাকাশযানটি চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাঁরা। কিন্তু নাসা এও জানে যে, একটা সময় এই হার্ডওয়্যারগুলোর অকার্যকর হয়ে পড়বে।
অবশ্য নাসা’র স্পেস কমিউনিকেশনস অ্যান্ড নেভিগেশন (স্ক্যান) প্রোগ্রামের অধীনে হার্ডওয়্যারগুলোকে আরও উন্নত করার সমাধানও খোঁজা হচ্ছে। উল্লেখ্য, স্ক্যান প্রোগ্রামের অধীনেই পরিচালিত হয় ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক বা ডিএনএস।
নাসা চাইছে এমন একটি আন্তঃক্রিয়াশীল বাজার তৈরি করতে যেখানে তাঁরা মালিক-অপারেটর হবে না, বরং তাঁরা হবে গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের একটি। জুলাই মাসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশে এ সম্পর্কিত প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার একটি অনুরোধপত্র (আরএফপি) প্রকাশ করে সংস্থাটি।
এই অনুরোধপত্রের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সক্ষমতা যাচাই করা, তাৎক্ষণিকভাবে হার্ডওয়্যার কেনা নয়। এক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দুটি। প্রথমত চাঁদ ও পৃথিবীর মধ্যে একটি ‘লুনার ট্রাঙ্কলাইন’ স্থাপন করা। আর দ্বিতীয়ত মঙ্গল গ্রহের জন্য একটি সম্পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা, যেটা মঙ্গল পৃষ্ঠ থেকে ডেটা সংগ্রহ করে মঙ্গলের কক্ষপথের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে অবস্থিত অপারেশন সেন্টারে পৌঁছে দেবে।
এই দুটি লক্ষ্য অর্জন যে কঠিন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা এক্ষেত্রে ব্যবহৃত যেকোনো অবকাঠামোকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। এর মধ্যে আছে, পৃথিবী থেকে চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহের মধ্যকার বিশাল দূরত্ব, দীর্ঘ বিলম্ব, নিয়মিত বিরতিতে সৌর হস্তক্ষেপ, পৃথিবী থেকে দেখার সময়সীমা এবং ত্রুটি-সহনশীল সিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা।
এই বিষয়গুলোর কথা বিবেচনে করেই নাসা এখনই ক্রয়ের দিকে না গিয়ে বরং এই চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণে সম্ভাব্য সমাধানের পরিকল্পনা জানতে চাইছে। উল্লেখ্য, নাসা’র দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হচ্ছে নিজেদের গ্রহ অনুসন্ধানের কর্মসূচিকে শুধুমাত্র বিজ্ঞান-ভিত্তিক মিশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে একটি স্থায়ী মানব উপস্থিতি তৈরি করা।
তথ্যসূত্র: টেকক্রাঞ্চ



