গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল!
ইংল্যান্ডের ফুটবল দলটাকে নিয়ে ইংলিশ সংবাদমাধ্যমের মাতামাতি, সুযোগ পেলেই ইনিয়েবিনিয়ে কেন ইংল্যান্ড বিশ্বের সেরা দল সে যুক্তি নিয়ে হাজির হয়ে যাওয়া, শিরোপা যে আসলে ইংল্যান্ডের হাতে আসার অপেক্ষায় সে অনুভূতি ছড়িয়ে দেওয়া – বড় কোনো টুর্নামেন্ট এলে এসব চিত্র দেখে অভ্যস্ত দর্শকের এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এবারও চিত্রটা ব্যতিক্রম নয়। ইংলিশ যেকোনো সংবাদমাধ্যমে ঢুঁ মেরে দেখুন, ইংল্যান্ডের ইউরো জেতার পথে যা কিছুটা ফ্রান্সকেই বাধা বলে মানে তারা, এর বাইরে বাকি দলগুলোর নাম ইংলিশদের সঙ্গে তুলনায় খুব একটা খোঁজ পাবেন না।
তবে ইংলিশ মিডিয়ার এই আবেগের বাড়াবাড়ি যুগ যুগ ধরে চলে এলেও গত কয়েক বছরে ইংলিশ প্রতিভার ছড়াছড়ি আসলেই দলটাকে বিশ্বের সেরাদের একটি হিসেবে রাখতে বাধ্য করে। এমনই অবস্থা যে, ইংল্যান্ড কোচ গ্যারেথ সাউথগেটের বরং ঘাম ছুটে যায় কাকে একাদশের বাইরে রাখবেন সে হিসেব করতে গিয়ে।
হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহ্যাম, ডেক্লান রাইস…এই নামগুলো একাদশে থাকবে বলে দেওয়াই যায়। কিন্তু এর বাইরে? কাকে রাখবেন আর কাকে রাখবেন না? বুকায়ো সাকাকে খেলাবেন, তাহলে এই মৌসুমে চেলসিতে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া কোল পালমারকে বসানো কেন ঠিক হবে না সে বিশ্লেষণ চলে আসে। ম্যানচেস্টার সিটির ফিল ফোডেনই-বা কী দোষ করলেন? সাকা-পালমারকে বসিয়ে তাঁকে আক্রমণে ডানদিকে খেলাতে বাধে, আবার বাঁদিকে ফোডেন ঠিক অতটা কার্যকর নন।
আর মিডফিল্ড? ওখানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে পল পগবাকে মনে করানো কোবি মাইনোকে কীভাবে বাদ রাখবেন? কিন্তু রাইস-বেলিংহ্যামের পাশে মাইনোর চেয়ে তো কোনো প্রেসিংয়ে দক্ষ মিডফিল্ডার দরকার, সে হিসেবে চেলসির কনর গ্যালাঘারের নাম আসে। কিন্তু ওদিকে ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার আরনল্ডের মতো পাসিংয়ে বিশ্বসেরাদের একজনকে বসিয়ে রাখতেও খচখচানি কাজ করবে! রাইটব্যাকে ট্রেন্টকে বোঝা মনে করেন ইংল্যান্ডের অনেকে, মিডফিল্ডেই তাঁর ভবিষ্যৎ দেখেন সাউথগেট নিজেও – কিন্তু তাঁকে খেলাতে গেলে বাদ দেবেন কাকে?
মধুর ঝামেলা তো একেই বলে। তবে সাউথগেটের কাছে এ এক জিলাপির প্যাঁচ। কীভাবে একাদশ সাজাবেন, কাকে রেখে কাকে খেলাবেন – ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত ইউরো জিতবে কি না, উত্তরটা সম্ভবত ওখানেই রাখা।
সেই ২০১৮ বিশ্বকাপ থেকেই তো ইংলিশ সমর্থকরা ‘ফুটবল’স কামিং হোম’ বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন। একের পর এক টুর্নামেন্টে খুব কাছে গিয়েও আর ফুটবলটার বাড়িতে ফেরা হয় না। গত ইউরোতে তো বাড়ির দরজায় এসে ঠকঠক করে ফিরে গেছে – ফাইনালে গিয়ে টাইব্রেকারে যে হেরে গেল ইংল্যান্ড! এবার কী থাকছে ইংলিশদের অপেক্ষায়?
গ্রুপে সঙ্গী যারা
একেবারে জলের মতো সহজ গ্রুপ ইউরোতে কোনোটিকেই বলা যায় না। মহাদেশটাতে সব দলই তো কাছাকাছি ঢংয়ের ফুটবলই খেলে – টিম গেইম, পাস, রান, শুট…। যে কারণে মানের পার্থক্য আঠার-বিশ না হলে মাঠে দুই দলে প্রতিদ্বন্দ্বীতা হয় দারুণ, ইউরো তাই হয়ে ওঠে ‘তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ’ টুর্নামেন্ট। ইংল্যান্ডের গ্রুপটাও তাই একেবারে সহজ নয়, আবার খুব কঠিনও বলা যাচ্ছে না। ডেনমার্ক সব সময়ই ডার্ক হর্সদের একটি, সার্বিয়ার প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছে অনেক, স্লোভেনিয়াও এখন আর হেলাফেলা করার মতো দল নয়। আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় সার্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ফলই বেঁধে দিতে পারে ইংল্যান্ডের ইউরোর সুর।
ফর্ম
হারের অভিজ্ঞতা নিয়েই ইউরোতে নামছে ইংল্যান্ড – কথাটা এভাবে বললে যতটা শঙ্কার মতো শোনায়, ইংল্যান্ডের ফর্ম অতটা খারাপ মোটেও নয়। সর্বশেষ প্রস্তুতি ম্যাচে আইসল্যান্ডের কাছে হারটাকে চোখ বন্ধ করে ‘গুরুত্বপূর্ণ নয়’ ফাইলে রেখে দিতে পারেন ইংল্যান্ড সমর্থকেরা। প্রস্তুতি ম্যাচে আবার ফলকে অত গুরুত্ব দেয় কে, তারওপর সেখানে তো পরীক্ষা-নিরীক্ষাই বেশি করেছেন কোচ। গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হারের পর থেকে আইসল্যান্ড ম্যাচের আগ পর্যন্ত ১৩ ম্যাচে ইংল্যান্ডের হার মাত্র একটি – ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে। অবশ্য এই ১৩ ম্যাচে সে অর্থে বড় দল বলতে শুধু ইতালি আর বেলজিয়ামের সঙ্গেই খেলেছে ইংল্যান্ড – ইতালিকে দুবারই হারিয়েছে, বেলজিয়ামের সঙ্গে করেছে ড্র। ফর্ম দেখে তাই ইংল্যান্ডকে বোঝার উপায় নেই।
সম্ভাব্য একাদশ
কেইন, বেলিংহ্যাম, রাইস – তিনটি নামের কথা তো আগেই বলা হলো। তবে ইংল্যান্ড কেমন একাদশ নিয়ে নামতে পারে, সেটার একটা ধারণা সম্ভবত সর্বশেষ কয়েকটি ম্যাচ দেখলে হয়ে যাওয়ার কথা।
৪-৩-৩ ছকে মাঝমাঠে রাইস-বেলিংহ্যামের পাশে প্রতিপক্ষের সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে নামার জন্য গ্যালাঘারকেই রাখতে পারেন সাউথগেট। আক্রমণে কেইনের দুই পাশে সাকা আর ফোডেনকেই খেলানোর সম্ভাবনা বেশি। যদিও প্রতিপক্ষ বিবেচনায় লেফট উইংয়ে বদল আসতে পারে। গোলপোস্টে পিকফোর্ডের ওপরই বেশি ভরসা করেন সাউথগেট।
তবে রক্ষণ সাজাতে একটু ঘেমে নেয়ে উঠবেন ইংল্যান্ড কোচ। তাঁর ভরসার সেন্টারব্যাক হ্যারি ম্যাগুয়ার নেই চোটের কারণে। লেফটব্যাক একজনকেই রেখেছেন একাদশে, কিন্তু সেই লুক শ আবার চোটের কারণে মৌসুমের বেশিরভাগেই মাঠে ছিলেন না। রাইটব্যাকে কাইল ওয়াকার, সেন্টারব্যাকে জন স্টোনসের পাশে মার্ক গেহি আর লেফটব্যাকে ‘রাইটব্যাক’ কিয়েরান ট্রিপিয়েরকেই খেলাতে পারেন সাউথগেট।
ইংল্যান্ড যখন বড় টুর্নামেন্টে
বিশ্বকাপ ইংল্যান্ড একবারই জিতেছে, ইউরো একবারও নয়। বড় টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের শিরোপাখরা নিয়ে আলোচনা তো আর এমনি এমনি হয় না! ইউরোতে তিনবার সেমিফাইনাল বা এর চেয়ে এগিয়েছে, গতবারই সবচেয়ে কাছে গেছে শিরোপার। ১৯৬৮ ইউরোতে সেমিফাইনাল খেলেছিল, সেটি আয়োজিত হয়েছিল ইতালিতে। এর বাইরে ১৯৯৬ ইউরোতে ঘরের মাঠে সেমিফাইনাল খেলেছে ইংল্যান্ড। আর সর্বশেষ ইউরো তো হয়েছেই ইউরোপজুড়ে ১২ ভেন্যুতে, ফাইনাল হয়েছিল লন্ডনে, সেখানে ফাইনাল খেলেছে ইংলিশরা।
রাস্তা কতটা মসৃণ
গ্রুপ 'সি' থেকে সেরা হয়ে পরের রাউন্ডে যেতে পারলে দ্বিতীয় রাউন্ডে ইংল্যান্ড সামনে পাবে গ্রুপ ডি, ই বা এফ-এর তৃতীয় সেরা দলটিকে। সেটি চেক প্রজাতন্ত্র, রোমানিয়া বা অস্ট্রিয়া হতে পারে। সে বাধা পেরোলে কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালির সামনে পড়তে পারে ইংল্যান্ড। সেখানে জিতলে সেমিফাইনালে ফ্রান্স বা বেলজিয়ামের মুখোমুখি হতে পারে। আর ফাইনালে উঠলে সামনে পেতে পারে জার্মানি, পর্তুগাল বা স্পেনকে।
কেন শিরোপা জিততে পারে
স্প্যানিশ লিগের সেরা বেলিংহ্যাম, জার্মান লিগের সেরা কেইন, ইংলিশ লিগের সেরা ফিল ফোডেন - তিনজনই ইংল্যান্ডের। প্রতিভায় ফ্রান্সের পাশাপাশি ইংল্যান্ডকেই এই মুহূর্তে ইউরোপে - তর্কসাপেক্ষে বিশ্বেও - সেরা মানেন বিশ্লেষকদের অনেকে। একটা সময় ইংলিশ ঘরানার ফুটবল স্পেন-পর্তুগাল-ইতালি-ফ্রান্সের মতো বল পায়ে তুলনামূলক বেশি দক্ষ দল কিংবা জার্মান যন্ত্রের সামনে পড়লে ভুগত, বেলিংহ্যাম-ফোডেন-সাকাদের ইংল্যান্ড সে সমস্যা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। শিরোপা জিতলে প্রতিভার জোরেই জিতবে ইংল্যান্ড।
কেন জিতবে না
রক্ষণ অনেকটাই অগোছালো ইংল্যান্ডের। ম্যাগুয়ার না থাকায় স্টোনসের পাশে কাকে খেলাবেন সাউথগেট সেটি একটি বড় প্রশ্ন। স্টোনসের সঙ্গে লিভারপুলের জো গোমেজের 'প্রোফাইল' জুটি বাঁধার মতো নয়, দুজনই আগ্রাসী ডিফেন্ডার। সাউথগেট মূলত গেহি-কনসাকেই খেলাচ্ছেন স্টোনসের পাশে, তাঁরা প্রিমিয়ার লিগে চেনা নাম হলেও এমবাপ্পে-ইয়ামাল-রোনালদো-ভার্টশদের বিপক্ষে কেমন করেন, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
রাইটব্যাক ওয়াকারের বয়স হয়েছে। লেফটব্যাক একজনকেই শুধু সাউথগেট একাদশে রেখেছেন, সেই লুক শ-র ফিটনেস নিয়েও সংশয় আছে। রক্ষণ ইংল্যান্ডকে মোটেও এগিয়ে রাখতে দেয় না।
সাউথগেট - সমাধান না সমস্যা?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তরটা ট্রলের পর্যায়ে চলে গেছে। বেলিংহ্যাম, কেইন, ট্রেন্ট, পালমার, ফোডেন, সাকা, মাইনো - অসাধারণ প্রতিভাধরদের ছবি দিয়ে 'এই দলের ইউরো জেতা ঠেকাবে কে?' প্রশ্ন রেখে পোস্ট হচ্ছে অনেক একাউন্ট থেকেই, উত্তরে নিয়মিতই চোখে পড়ে - সাউথগেট!
অসাধারণ অনেক প্রতিভা থাকলেও সাউথগেট তাঁদের কাছ থেকে সেরাটা বের করতে পারছেন কি না, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
ইংল্যান্ডের 'অমুক ক্লাব' 'তমুক ক্লাব'- এ বিভক্ত ড্রেসিংরুমে একতা আনার কৃতিত্ব তাঁকে দেয় ইংলিশ মিডিয়া, তবে সাউথগেটের কৌশল 'অতি সাবধানী' বলে সমালোচনা আছে। ট্রেন্ট, ফোডেনদের মতো প্রতিভাবানদের সেরাটা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তাঁর কৌশল তৈরি করে দিতে পারেনি। তাঁর 'ইন-গেইম ম্যানেজমেন্ট' বা ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে খেলোয়াড় বা কৌশল বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়েও সমালোচনা অনেক।



