ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ গৌরবময় ইতিহাসে যোগ হতে যাচ্ছে আরও একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। মেক্সিকোর মনটেরি স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘এফ’-এর ম্যাচে আজ রোববার মুখোমুখি হচ্ছে জাপান ও তিউনিসিয়া। এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক হাজারতম ম্যাচ। ফলে প্রায় এক শতাব্দী ধরে তৈরি হওয়া ফুটবলীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য সাক্ষী হতে যাচ্ছে এই দুই দল।
বিশ্বকাপের এবারের আসরে বাছাইপর্বে ২০৯টি দেশ অংশ নিয়ে মূল পর্বের টিকিট পেয়েছে ৪৮টি দেশ। আজ গ্রুপ পর্বে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচ খেলবে জাপান ও তিউনিসিয়া। নিজেদের প্রথম ম্যাচে ডালাসে নেদারল্যান্ডসের সাথে ২-২ গোলে ড্র করে ১ পয়েন্ট নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে জাপান। অন্যদিকে, তিউনিসিয়াকে তাদের প্রথম ম্যাচে সুইডেনের কাছে ৫-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে। ফলে মাইলফলকের এই ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় চ্যালেঞ্জ আফ্রিকান এই দলটির সামনে।
উল্লেখ্য, তিউনিসিয়া দলটি এই নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। অন্যদিকে, ১৯৯৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত টানা ৮টি আসরে অংশ নিচ্ছে জাপান।
যেভাবে এলো ১,০০০তম ম্যাচ
ঠিক ৯৬ বছর আগে ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপের আসর বসেছিল মাত্র ১৩টি দল নিয়ে। সেবার একই সময়ে দুটি উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার একটিতে বেলজিয়ামকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরপর কালের বিবর্তনে দলের সংখ্যা বেড়ে আজ তা ৪৮-এ দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের কিছু মাইলফলক ম্যাচ এর আগেও বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিল। এই যেমন, বিশ্বকাপের ২০০তম ম্যাচটি ছিল ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল, যেখানে ইংল্যান্ড তাদের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপটি জয় করে।
এছাড়া বিশ্ব ফুটবলের এই সর্বোচ্চ আসরের ৯০০তম ম্যাচটিও ছিল একটি ফাইনাল। ২০১৮ বিশ্বকাপের সেই ফাইনাল জিতে ফ্রান্স দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়। এছাড়া ৩০০তম ও ৫০০তম ম্যাচগুলোর ক্ষেত্রে একই সময়ে একাধিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে ১,০০০তম ম্যাচের ক্ষেত্রে আজ একটিই ম্যাচ হবে। ফলে জাপান-তিউনিসিয়া ম্যাচটি এককভাবে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবে।
১,০০০তম ম্যাচটি ঘিরে বিশেষ আয়োজন
এই ঐতিহাসিক ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ম্যাচের দায়িত্বে থাকা মাঠের চারজন রেফারি এমন এক বিশেষ জার্সি বা কিট পড়বেন যাতে সোনালী রঙের নকশা, স্ট্রাইপ এবং ১,০০০ সংখ্যা ও ট্রফির লোগো সংবলিত একটি বিশেষ প্যাচ থাকবে। এছাড়া রেফারিদের জার্সিতে থাকবে 'ম্যাচ ১০০০' লেখা প্যাচ।
ম্যাচটি পরিচালনা করবেন রোমানিয়ার রেফারি ইস্তভান কোভাকস। তাকে সহায়তা করবেন দুই সহকারী রেফারি মিহাই মারিকা ও ফেরেঙ্কজ তুনয়োগি। চতুর্থ অফিশিয়াল হিসেবে থাকবেন কোস্টারিকার হুয়ান কালদেরন।
২০০২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনাকারী কিংবদন্তি রেফারি এবং বর্তমানে ফিফার রেফারি কমিটির চেয়ারম্যান পিয়েরলুইজি কোলিনা এই ঐতিহাসিক ম্যাচ সম্পর্কে বলেন, 'আমরা এই ম্যাচটি উদযাপন করতে একটি বিশেষ ম্যাচ কিট তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি দেখতে বেশ চমৎকার, যেখানে সোনালী রঙের ডিটেইলের ছাড়াও স্ট্রাইপ এবং ট্রফি ও ১,০০০ সংখ্যা সংবলিত একটি প্যাচ রয়েছে।'
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে গ্যালারিতে উপস্থিত থাকবেন জাপানের রাজকুমারী তাকামাদো এবং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
ফুটবলার ও কোচেদের প্রতিক্রিয়া
এই অনন্য রেকর্ডের অংশ হতে পেরে উচ্ছ্বসিত তিউনিসিয়ার মিডফিল্ডার ও অধিনায়ক এলিস স্কিরি। তিনি বলেন, 'বিশ্বকাপের ১,০০০তম ম্যাচে অংশ নিতে পারাটা সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ (প্রতীকী)। এটি আপনাকে এই প্রতিযোগিতার পুরো ইতিহাসকে উপলব্ধি করতে বাধ্য করবে— সেই সেরা ম্যাচগুলো, এবং সেই সেরা খেলোয়াড়দের যারা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অধ্যায়গুলো রচনা করেছেন।'
ঐতিহাসিক এই ম্যাচ নিয়ে জাপানের কোচ হাজিমে মরিয়াসু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, 'বিশ্বকাপ ইতিহাসের ১,০০০তম ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়াটা অত্যন্ত সম্মানের। আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে এটি যেন একটি চমৎকার ম্যাচ হয়, যা এই ১,০০০তম ম্যাচের মর্যাদার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।'
এক নজরে বিশ্বকাপের কিছু চমকপ্রদ তথ্য:
১। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে মাত্র ১৩টি দল অংশ নিলেও এই টুর্নামেন্টের বাছাইপর্বে রেকর্ড ২০৯টি দল অংশ নিয়েছে, যার মধ্য থেকে ৪৮টি দল মূল পর্বে খেলছে।
২। বিশ্বকাপের এবারের আসরে আফ্রিকা এবং এশিয়া অঞ্চল থেকে সম্মিলিতভাবে ১৭টি দল সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। এছাড়া আরও ২টি প্লে-অফ স্থান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এই দুই মহাদেশকে।
৩। ফিফার ইতিহাসে এই প্রথম ওশেনিয়া অঞ্চলকে সরাসরি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার টিকিট দেওয়া হয়েছে।
৪। ফুটবলের সার্বিক উন্নয়নে ২০১৬ সালে চালুর পর থেকে ফিফার ‘ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ ফুটবল উন্নয়নে ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে।
জিনেদিন জিদানের সেই ঢুঁসো, ডিয়েগো ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অব গড', ১৯৬৬ সালের জুলে রিমে ট্রফি চুরি এবং ফিরে পাওয়া, কিংবা ২০২২ সালে লিওনেল মেসির ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মতো অসংখ্য মহাকাব্যিক ঘটনার স্মৃতিবিজড়িত ৯৯৯টি ম্যাচ পেরিয়ে আজ তিউনিসিয়া ও জাপানের হাত ধরে ১,০০০তম ম্যাচের নতুন অধ্যায় রচিত হবে বিশ্বকাপের আসরে।



