আজ আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। শুধু দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী ঘটছে নারী নির্যাতনের ঘটনা। সেসব ঘটনার কিছু হয়তো দেশ‑বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু অনেক ঘটনা থাকছে দৃশ্যপটের আড়ালে। সেসব ঘটনা মাটিতেই চাপা পড়ে থাকে।
বিশ্বব্যাপী নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। নারীর প্রতি বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনা তার ইঙ্গিত প্রদান করে। কন্যা ও নারীর প্রতি সহিংসতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধ। কিন্তু এই অপরাধ প্রবণতা কোনোভাবেই কমছে না। আফগানিস্তান, ইরান, লেবানন, গাজা, ইসরায়েল, ভারতসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের নারীরা আজ নির্যাতন‑নিপীড়নের শিকার। ফলে দেশে দেশে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গড়ে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসের উৎপত্তি। ১৯৮১ সালে লাতিন আমেরিকায় নারীদের এক সম্মেলনে ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালনের ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে দিবসটিকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ দিবসটি পালনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস উদযাপন কমিটি ১৯৯৭ সাল থেকে এই দিবস ও পক্ষ পালন করে আসছে।
এই দিবসের সূত্রপাত ঘটেছিল লাতিন আমেরিকায়। ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর লাতিন আমেরিকার ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য প্যাট্রিয়া, মারিয়া তেরেসা ও মিনার্ভা মিরাবেল নামের তিনজনকে হত্যা করে। সেদিনের তিনজন ছিলেন বোন। তাঁদের স্মরণে ১৯৮১ সাল থেকে এই দিনটি আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিবাদ দিবস হিসেবে পালিত হয়।
এবার আসি দেশের পরিস্থিতির প্রসঙ্গে। এ দেশে ঘরে‑বাইরে, পথেঘাটে ও অফিস-আদালতে নারীরা হরহামেশাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এ দেশে নারীর অধিকারের দাবিতে সোচ্চার থাকে বিভিন্ন নারীবাদী সংগঠন। নারীবাদী সংগঠনের বাইরে ও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনও নারীর অধিকার চায়। কিন্তু রাস্তাঘাটে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না। বরং নারীদের পথেঘাটে নির্যাতনের শিকার হতে হয় । নারী নির্যাতনের এসব ঘটনা নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মানবাধিকার প্রতিবেদন (অক্টোবর) ২০২৪ থেকে জানা যায়, গত অক্টোবর মাসে ধর্ষণের (১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব) ২২টি, যৌন নির্যাতনের ১৪টি, ধর্ষণের পর হত্যা ২টি, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা ১টি, পারিবারিক সহিংসতার ৪৩টি এবং নারীর প্রতি অন্যান্য সহিংসতার ৬৮টি এবং অ্যাসিড নিক্ষেপের ২টি ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অক্টোবর মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২২ জন নারী ও ২৩ জন শিশু।
আবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নারী ও কন্যা নির্যাতন বিষয়ক প্রতিবেদন (অক্টোবর, ২০২৪) থেকে জানা যায়, চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ৭৪ জন কন্যা এবং ১২৬ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩০ জন কন্যাসহ ৪৪ জন। তার মধ্যে দুজন কন্যাসহ ৮ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এক কন্যাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭ কন্যাসহ ৯ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ৭ কন্যাসহ ৯ জন। দুই কন্যাসহ চারজন উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছে। এসিডদগ্ধের শিকার হয়েছে ২ জন, যার মধ্যে একজনের এসিডদগ্ধের কারণে মৃত্যু হয়েছে। তিনজন অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়েছে, যাদের দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
এ দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে রয়েছে আইন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আইন থাকার পরও কমছে না নারীর প্রতি সহিংসতা। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তান্ইয়া নাহার বলেন, ‘নারীর প্রতি নির্যাতনমূলক অপরাধসমূহ কঠোরভাবে দমনের উদ্দেশ্যে ২০০০ সালে একটি বিশেষ আইনও প্রণয়ন করা হয়। আইনটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ নামে অভিহিত। দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আরও আছে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭, বাল্যবিবাহ নিরোধ বিধিমালা ২০১৮, ডিএনএ আইন ২০১৪, ডিএনএ বিধিমালা ২০১৮, যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮, এসিড সন্ত্রাস দমন আইন ২০০২, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০‑সহ নারীনীতি ও নানা বিধিমালা।’
এই আইনজীবী মনে করেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইন থাকলেও দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন বেড়েই চলেছে। এ থেকে উত্তরণের উপায় হলো আইনের সঠিক প্রয়োগ। আর প্রয়োজন সঠিক প্রয়োগের জন্য ব্যাপক গণসচেতনতা।
তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে মানুষ অনেকভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কমছে না নারী নির্যাতনের মাত্রা। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র–কোথাও নারীরা নিরাপদে নেই। এই নির্যাতনের শেষ কোথায়? এ বিষয়ে শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী সঙ্গীতা ইমাম বলেন, ‘রাস্তাঘাটে, কর্মক্ষেত্রে কোথায় না নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন? পথে হাঁটতে গেলে পোশাক নিয়ে আগে তো শুধু মুখে কটূক্তি করত, এখন তো গায়ে হাত তুলছে। থুতু দিচ্ছে। চুল কেটে দিচ্ছে। আবার পথেঘাটে কিংবা কর্মক্ষেত্রে নানা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলে নারীকে অসম্মানিত করছে হরহামেশাই। নারী বস হলে পিয়নও তাকে হেয় করে মওকা বুঝে। তাই এ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, শিক্ষিত নারী, কর্মজীবী নারী, খেলোয়াড় নারী–এসব ঘটনার শিকার হন না। একজন খেলোয়াড় মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ জানতে চায়, তিনি নারী নাকি পুরুষ? দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা নারীকেও পোশাকের জন্য নানা বাক্যবাণে জর্জরিত হতে হয়।’
সঙ্গীতা ইমামের মতে, ‘আসলে শিশুর শিক্ষা হয় ঘর থেকে। শিশু যখন তার মাকে নির্যাতিত হতে দেখে, তখন সে শেখে বড় হয়ে নারীকে এভাবে মারা যায়, তুচ্ছ‑তাচ্ছিল্য করা যায়। আমরা দুই পা এগোচ্ছি, তো তিন পা পিছিয়ে সেই অন্ধকার যুগেই পড়ে রয়েছি। নানা অনুশাসনের লেবাসে নারীদের নির্যাতনকে জিইয়ে রাখা হচ্ছে। দু‑চারজন যারা আওয়াজ তোলেন, তাঁরা সমাজদ্রোহীসহ নানা ট্যাগ বয়ে বেড়ান। তাই আর মুক্তি মেলে না নারীর। তবু বলি, অধিকার কেড়ে নিতে হয়, অধিকার লড়ে নিতে হয়। লড়াকু হয়ে উঠুক বাংলার নারীরা।’


কন্যাশিশুর সমঅধিকার পরিবার দিলেই সমাজ দেবে
সব ধরনের অসমতার বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার হোক
