বেইজিং ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনার ত্রিশ বছর পূর্তিতে নারী সমাজের অগ্রযাত্রা পর্যালোচনা এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন উপলক্ষে একটি কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে। সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে ইউএন উইমেন- এর সহযোগিতায় আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক কনভেশন সেন্টারে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
কনফারেন্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মডারেট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘নিজেরা করি’– এর সমন্বয়ক খুশি কবির। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএন উইমেন বাংলাদেশের রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জলি সিং, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব দিলারা বেগম।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘আমরা জানি আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের কয়েক দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। এই দিবস পালনের মূল বিষয় সমতা প্রতিষ্ঠা ও অগ্রযাত্রাকে উদযাপন করা। অর্জনের উদযাপন, আগামী যাত্রার শপথ গ্রহণ এবং বিশ্বব্যাপী নারী সমাজের শপথ গ্রহণকে সামনে রেখে এই দিবস আমরা পালন করে থাকি। তবে বিশ্বজুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতা থাকলেও পাশাপাশি নারীর শক্তি আজ দৃশ্যমান। এই শক্তিকে এগিয়ে নিতে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে, নারীর অপ্রচলিত পেশার সাথে যুক্ত হওয়া ও সফলতা অর্জন ও নারীবান্ধব বহুমুখী এজেন্ডা বাস্তবায়নে ইউএন উইমেন গঠন নারী আন্দোলনের একটি অর্জন। আমরা ৮ মার্চকে উদযাপন করছি তবে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় আমাদের এখনো অনেক পথ হাঁটতে হবে। এখনো সমাজে নারীবিদ্বেষ আছে, নারীবিদ্বেষী ষড়যন্ত্রকে বিনাশ করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে, পাশাপাশি পারিবারিক, রাজনৈতিক, সামাজিকভাবে নারীর অধিকারহীনতাকে দূর করতে শক্তিশালী নারী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’
কনফারেন্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মডারেটরের বক্তব্যে খুশি কবির আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে নারী আন্দোলনকর্মী, বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যত বৈশ্বিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে বেইজিং সম্মেলন অন্যতম। বেইজিং সম্মেলন কেবল অঙ্গীকার না, এটি নারীর অগ্রযাত্রার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের একটি প্ল্যাটফর্ম। নারীর অগ্রযাত্রার পথে আমরা কতটুকু হাঁটতে পেরেছি, আরও কত পথ হাঁটতে হবে সে বিষয়ে পর্যালোচনার জন্য আজকের সভার আয়োজন করা হয়েছে।’
ইউএন উইমেন বাংলাদেশের রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জলি সিং বলেন, ‘নারী আন্দোলন নারী ও কন্যার ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় অন্যতম ভূমিকা পালন করছে। বেইজিং ঘোষণা জেন্ডার সমতা ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি ভিশনারি এজেন্ডা। এই ঘোষণার ৩০ বছর পর এসেও নারীর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনো নারীর প্রতিনিধিত্ব কম। এই সময় ন্যায্যতা ও সমতাপূর্ণ পৃথিবী গড়তে বেইজিং ঘোষণার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন পর্যালোচনায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করতে হবে, নারীর ও কন্যার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে, কিশোরীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে, সম্মানজনক কাজ নারীর জন্য নিশ্চিত করতে হবে, প্রযুক্তিতে নারীর সমান অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি সুযোগ ও অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব দিলারা বেগম বলেন, ‘এবারের ৮ মার্চ পালনকালে বেইজিং ঘোষণার ৩০ বছর পূর্তি হচ্ছে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বেইজিং ঘোষণা একটি মাইলফলক দলিল। বেইজিং ঘোষণার আলোকে আমাদের অনেক অর্জন আছে তবে নারীর অগ্রযাত্রার পথে এখনো পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা আছে। নারীর বাল্য বিয়ে একটি জাতীয় সমস্যা। পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতার হার এখনো কমেনি। প্রায় ৭০ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে তার ইন্টিমেট পার্টনারের দ্বারা সহিংসতার শিকার হন। এমতাবস্থায় নারী দিবস পালন আরও সোচ্চার ভাবে করতে হবে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সামাজিক পরিবর্তন করতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে সম্মিলিতভাবে নারীবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সামগ্রিকভাবে চলমান কর্মসূচিকে মূল্যায়ন করে প্রযুক্তিকে ব্যবহারের মাধ্যমে নারীর জীবনমান পরিবর্তন ও অধিকার প্রতিষ্ঠা আরও কার্যকর করতে প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মডারেটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাগ্রস্বরের ফওজিয়া খোন্দকার ইভা, অংশ নেন আদিবাসী নারী প্রতিনিধি চন্দ্রা ত্রিপুরা, নারী কৃষক মমতাজ বেগম, দলিত নারী মনি রানী দাস, সম্পূর্ণার প্রতিষ্ঠাতা জয়া শিকদার, বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন নারী শারমিন আকবরী, শিক্ষার্থী শারমিন মিতু, গার্মেন্টস কর্মী সুমি আক্তার ও নারী উদ্যোক্তা বগুড়ার তাহমিনা পারভিন শ্যামলী।
পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং মানবাধিকার ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বিষয়ে দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মডারেটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. নাসিম আখতার হোসেন ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সিউতি সবুর। বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুইডেন দূতাবাসের উন্নয়ন সহযোগিতা প্রধান মারিয়া স্ট্রিডসম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. জারীনা রহমান খান, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি মনিরা বেগম। ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশনের সামাজিক উন্নয়ক বিভাগের উপদেষ্টা তাহেরা জাবীন, একশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, ব্লাস্ট- এর ফরিদপুর শাখার শিপ্রা গোস্বামী।
প্যানেল আলোচনা শেষে মিডিয়া বাজারের উদ্যোগে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র চক্রবুহ্য, লায়লা, ক্রাতি এবং কারমা প্রদর্শন করা হয়। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন শেষে দলীয় কাজ অনুষ্ঠিত হয়। এটি সঞ্চালনা করেন মাল্টি ডিসিপ্লিনারি আর্টিষ্ট দিবারা মাহবুব।
সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহনাজ সুমী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক জনা গোস্বামী, মাল্টি ডিসিপ্লিনারি আর্টিষ্ট দিবারা মাহবুব এবং নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশি কবির। সঞ্চালনা করেন আদিবাসী নারী সংগঠন স্পার্ক- এর ডালিয়া চাকমা।
কনফারেন্সে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সংগঠনের প্রতিনিধি, ইউএন উইমেন বাংলাদেশ, ইউএনডিপি, ইউনিসেফের প্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি ও দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।



