প্রায় ২০ বছর পর গতকাল বৃহস্পতিবার দিল্লির ১০ জনপথ রোডে যাওয়ার সময় পেলেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি। এই ঠিকানায় বাস করেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী ও তাঁর ছেলে রাহুল গান্ধী। বিগত লোকসভায় এক তুচ্ছ মামলায় সাজা দিয়ে রাহুল গান্ধীর সংসদ সদস্য পদ খারিজ করা হয়েছিল। এরপর রাতারাতি তাঁকে দিল্লির সরকারি বাংলো থেকে উচ্ছেদ করে নরেন্দ্র মোদি সরকার। তখন থেকেই মায়ের সাথে ১০ জনপথ রোডের বাড়িতে থাকেন রাহুল।
সবাই জানে, আগের রাহুল আর এখনকার রাহুল এক নন। তিনি লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা। তিনি কথা বলতে শুরু করলে কেঁপে ওঠে সরকার। প্রধানমন্ত্রী মোদিসহ বিজেপি নেতারা পাল্টা যুক্তি খুঁজে না পেয়ে বালকবুদ্ধি বা মানসিক প্রতিবন্ধী বলে খোঁচা দেন তাঁকে। সেই সমালোচনা ফিরে আসে বুমেরাং হয়ে। এহেন রাহুল গান্ধীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন মোদির ঘনিষ্ট বন্ধু বলে পরিচিত ভারতের সেরা ধনী মুকেশ আম্বানি। উপলক্ষ, ছেলের বিয়েতে দাওয়াত দেওয়া।
এই উপলক্ষকে ঠিক পাত্তা দিতে নারাজ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশ। তাদের বক্তব্য এর আগে বেশ ঘটা করে ছেলে আকাশ ও মেয়ে ইশাকে বিয়ে দিয়েছেন। তখন দাওয়াত দেওয়ার সময় পাননি। এখন একেবারে বাড়ি গিয়ে দাওয়াত দেওয়া–একটু অবাক করার মতোই। মোদির বন্ধু মুকেশ আম্বানির এই পদক্ষেপে রাজনীতির গন্ধ পাচ্ছেন অনেকে। বলছেন, ভারতের রাজনীতি ও ক্ষমতার পরিমণ্ডলে যে পরিবর্তনের আভাস শুরু হয়েছে আম্বানির এই ১০ জনপথ রোডে তারই ইঙ্গিত। তাদের মতে, কোনো দেশের ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রথম আভাস পান সে দেশের শীর্ষ শিল্পপতিরা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইকোনোমিকস টাইমস বলছে, মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলে অনন্তর বিয়ে। পাত্রী রাধিকা মার্চেন্ট। শিল্পপতি বীরেন মার্চেন্টের মেয়ে। আগামী ১২ জুলাই মহা-সমারোহে এই বিয়ে হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বিবাহ পূর্ববর্তী অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে সেই ১ মার্চ থেকে। গুজরাটের জামনগরে অনুষ্ঠিত ১ মার্চের অনুষ্ঠানে কে আসেননি! অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, আমির খান, সালমান খান থেকে শুরু আরও অনেক তারকা এই আসরকে আরও ঝলমলে করে তুলেছিলেন। মার্কিন গায়িকা রিহানা নাচ–গানে মাতিয়ে দিয়েছিলেন অনন্ত-রাধিকার বিবাহ-পূর্ব ওই অনুষ্ঠানকে। বিভিন্ন সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মুকেশ ও তাঁর স্ত্রী নীতা তাঁদের ছোট ছেলের বিবাহ পূর্ব অনুষ্ঠানে বারো শ কোটি রুপি খরচ করেছেন। এবার মূল অনুষ্ঠানে কত খরচ হবে তা সবার কল্পনার বাইরে। ১২ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানে গান গাইবেন জাস্টিন বিবার।
বিবাহ পূর্ব অনুষ্ঠানের জন্য এত খরচ দেখে অবাক হওয়ার কারণে নেই। ২০১৮ সালে মুকেশ আম্বানি তার মেয়ে ঈশার বিয়েতে খরচ করেছিলেন ১০ কোটি ডলার।
বন্ধু নরেন্দ্র মোদি কাছে যিনি ‘বালকবুদ্ধি’ সম্পন্ন সেই রাহুল গান্ধী ১২ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানে থাকলে যে বিয়ের জৌলুসে নতুন পালক যুক্ত হবে এটা ভালোই বুঝেছেন মুকেশ। আর একই সাথে তিক্ত সম্পর্কটাও কিছুটা হলে শোধরানো যাবে। ২০০৪ সালে কংগ্রেস লোকসভা নির্বাচনে জেতার পর মুকেশ আম্বানি গিয়েছিলেন ১০ জনপথে, সোনিয়া গান্ধীর সাথে দেখা করতে। কারণ সোনিয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদ নিতে অস্বীকার করায় এক রাজনৈতিক সংকট শুরু হয়েছিল। জানা যায়, বিকল্প হিসেবে তখন ড. মনমোহন সিং-এর নাম প্রস্তাব করেছিলেন মুকেশ আম্বানি, রতন টাটাসহ ভারতের শিল্পমহল। এরপর ২০ বছর আর কোনো খোঁজ ছিল না।
মুকেশ ১০ জনপথ রোডের বাড়িতে গেলেও দেখা পাননি রাহুল গান্ধীর। কারণ ঘণ্টা খানেক আগেই রাহুল চলে গিয়েছিলেন বাড়ি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে দিল্লির গুরু তেগ বাহাদুর কলোনিতে। সেখানে কাজ করছিলেন রাজমিস্ত্রিরা। রাহুল সেখানে তাদের কথা শোনেন। তাদের সাথে কাজে হাত লাগান। হয়তো রাহুলের মনে হয়েছে, বাড়িতে মা সোনিয়া গান্ধী তো আছেন। আর মুকেশ আম্বানির সাথে দেখা করার চেয়ে এই হত-দরিদ্র শ্রমিকদের সাথে সময় কাটানো অনেক জরুরি। কারণ এরাই তো ভারত।
রাহুল গত ১০ বছর ধরে নরেন্দ্র মোদি ও তার দুই ব্যবসায়ী বন্ধু মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানি নিয়ে কথা বলছেন। বারবার তুলেছেন নানা অভিযোগ। এবারের নির্বাচনী প্রচারে তো আম্বানি ও আদানি টেম্পো ভর্তি করে কংগ্রেসকে টাকা পাঠিয়েছেন বলে পাল্টা অভিযোগ করেছিলেন মোদি। তবে ওই একবারই। এরপর আর বন্ধুদের নিয়ে কোনো কথা বলেননি তিনি। কিন্তু রাহুল পুরো নির্বাচনী প্রচারে এই তিনজনের বিরুদ্ধে তোপ দেগে গেছেন।
সে কারণে ছোট ছেলের বিয়ে উপলক্ষে মুকেশ আম্বানির গান্ধী পরিবারে যাওয়া যেমন অর্থবহ, তেমনি মুকেশ আম্বানির সাথে রাহুলের দেখা না করাটা অন্যরকম বার্তা দিচ্ছে।



