বর্তমানে দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সংসারের তুচ্ছ বা গুরুতর বিষয় নিয়ে আলাদা হচ্ছেন সারা জীবন একসাথে থাকার শপথ নেওয়া দুটো মানুষ। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দুজনের জন্যই বেশ যাতনার। আর তা আরও খচখচে হয়ে ওঠে বিচ্ছেদপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে।
তমাল ও নবনীতা (ছদ্মনাম) ভালোবেসে বিয়ে করেছিল সাত বছর আগে। তারা দুজনেই চাকুরিজীবী। মাস ছয়েক হলো কোনো এক অজানা কারণে দুজনের সম্মতিতেই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।
নবনীতা তার বিচ্ছেদের খবরটা গোপন না রেখে সবাইকে জানায়। যাতে কেউ আড়ালে এটা নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা করতে না পারে। তবে ঘটনা হয়েছে উল্টো, এখন নবনীতাকে তার খুবই কাছের স্বজনদের কাছ থেকে বেশ বিব্রতকর প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে। সেটা হলো– এখন সে কী করবে? বিয়ে নিয়ে তাঁর চিন্তা–ভাবনা কী?
স্বজনদের ধারণা, বিকল্প কোনো পথ হাতে রেখে নবনীতা বিচ্ছেদের পথে হেঁটেছে। তাদের চিন্তা, নবনীতা এখন কি করবে? তাকে তো আর অবিবাহিত নারীদের মতো ঘটা করে ঘটক ডেকে বা পাত্র দেখিয়ে বিয়ে দেওয়া যাবে না। তাহলে সে কি করবে? বয়স বেড়ে যাচ্ছে। চেহারায় বয়সের ছাপ পড়ে যাচ্ছে। এরপরে বিয়ে হলে তো সন্তান নিতে সমস্যা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
স্বজনদের এমন প্রশ্নে নবনীতা বেশ বিব্রত। অথচ সব বিবাহ বিচ্ছেদের পেছনে ‘সেকেন্ড চয়েজ’ থাকে না। আর থাকলেও সেটা হয়তো যেকোনো একজনের থাকতে পারে। যে কারণে অন্যজনকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিচ্ছেদের পথে হাঁটতেই হয়।
আমাদের দেশে বিবাহ বিচ্ছেদকে সহজভাবে দেখা হয় না। যেহেতু আমাদের সমাজ নারীবান্ধব নয়, সেহেতু সমাজে যে নারীর বিবাহ বিচ্ছেদ হয় তাঁকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না প্রায় সময়ই। আত্মীয়স্বজনেরা তাঁর দিকে অন্যভাবে তাকান। অনেক সময় তাঁকে বিব্রতকর প্রশ্নও করেন। এখানে বিবাহ বিচ্ছেদের পর মেয়ে পক্ষ দোষ খুঁজতে শুরু করে ছেলে পক্ষের, আর ছেলে পক্ষ খোঁজে মেয়ে পক্ষের। অথচ বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যাপারটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একতরফা হয় না। দুজনেরই দোষ থাকে। দোষ না থাকলেও নিদেনপক্ষে কাহিনি এটাই হয় যে, দুজনের বনিবনা হচ্ছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস–২০২২ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২১ সালে নারীদের সাধারণ বিবাহ বিচ্ছেদের হার ছিল ২–এর সামান্য কম। সেটা পরের বছর বেড়ে ৩ দশমিক ৬–এ দাঁড়ায়। একইভাবে পুরুষের ক্ষেত্রে হারটি ২০২১ সালে ছিল ২–এর সামান্য বেশি। পরের বছর তা বেড়ে ৩ দশমিক ৮–এ দাঁড়ায়। ২০২২ সালে দেশে তালাকের স্থূল হার বেড়ে হয়েছে প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৪টি। ২০২১ সালে এই হার ছিল প্রতি হাজারে ০ দশমিক ৭টি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে সংসার ভাঙার পুরো দায়টা চাপানোর চেষ্টা করা হয় নারীর ওপর। একদিকে ঘর ভাঙার বেদনা, অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চিন্তা নারীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। বিচ্ছেদের পরবর্তী সময়ে নানা কারণে নারীদেরকে পুরুষের তুলনায় বেশি ট্রমার মুখে পড়তে হয় বলে মনে করেন মনোবিদ ও আইনজীবীরা।
চিকিৎসক ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া মনে করেন, বিবাহ বিচ্ছেদের পরবর্তী সময়ে পুরুষের তুলনায় নারীকে মানসিকভাবে অনেক বেশি অসামাজিক আঘাতের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কারণ পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে সংসার রক্ষার দায়টা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। বাংলা একটি প্রবাদ আছে, "সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে।" এটুকু সবখানে উল্লেখ করা হলেও এর পরবর্তী লাইন, ''গুণবান পতি থাকে তার সনে'' তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উল্লিখিত থাকে না।
বিচ্ছেদের পর অনেক নারীর ক্ষেত্রে ট্রমা কাজ করে। এ সময় নারীকে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ট্রমার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এ বিষয়ে ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, 'বিবাহ বিচ্ছেদের পর মানসিকভাবে নারী শক্ত থাকতে চাইলেও চারপাশের পরিবেশ কিন্তু তাকে শক্ত থাকতে দিতে চায় না। নারীকে বারবার প্রশ্ন করা হয়, কি কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হলো? সন্তান সাথে থাকলে তো তাঁর রেহাই থাকে না। অথচ এই প্রশ্ন যে কত অস্বাভাবিক তা অনেকের ধারণার মধ্যে থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে তালাক প্রাপ্ত নারীর সঙ্গে তাঁর কাছের বান্ধবীরাও সম্পর্ক রাখে না। যদি সে নারীর প্রতি বান্ধবীদের স্বামীরা অনুরক্ত হয়ে পড়েন সেই ভয়ে।'
হ্যাঁ, স্বাভাবিকভাবেই বিবাহ বিচ্ছেদের পর দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারটা চলেই আসে। প্রথম স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পর যে দ্বিতীয় বিয়ে, সেটার ব্যাপার সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদের পর নতুন করে আবার বিয়ে করার বিষয়টি কিন্তু একেবারেই অন্যরকম।
বিবাহ বিচ্ছেদের পর দ্বিতীয় বিয়ের জন্য নানা রকমের কথা নারীকে শুনতেই হয়। কী হলো, কেন হলো, কীভাবে হলো—এসব প্রশ্ন না চাইলেও কানের কাছে এসে বিড়বিড় করে। একই সঙ্গে সইতে হয় নানা রকমের দোষারোপ। আবার যদি তাদের মধ্যে অর্থাৎ স্বামী বা স্ত্রীর কেউ একজন যদি এরই মধ্যে আবারও বিয়ে করে সংসার করে শুরু করে, তাহলে তো কথাই নেই। অপরজনকে অবধারিতভাবে নিতে হয় সংসার ভাঙার সকল দায়ভার!
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তান্ইয়া নাহার বলেন, 'আমাদের সমাজব্যবস্থা মূলত পুরুষতান্ত্রিক। আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য, নারীরা নানাভাবে নিগৃহীত, বঞ্চিত এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থানের হবেন। তাই বিয়ে এ সমাজব্যবস্থায় নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থানের সম্পর্ক না হয়ে, বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হয়ে থাকে। পাশাপাশি বিবাহ বিচ্ছেদের পুরো দায়ভারও নারীর ওপর বর্তায়। কারণ, আমাদের সমাজে নারীকে দোষারোপ করা সবচেয়ে সহজ এবং ফলপ্রসূ ব্যাপার। নিশ্চয়ই নারীটি ভালো না বা তার এমন কোন দোষ আছে, যার কারণে সংসার টেকেনি। এ ধরনের মনোভাব দেশের অনেক নারী-পুরুষ মনে পুষে রাখেন। এতে বিচ্ছেদের পর নারীর চলার পথ অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।'
সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবীর মতামত, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে সবার আগে প্রয়োজন পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিলোপ এবং নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
আইনজীবী তান্ইয়া নাহার মনে করেন, এ দেশে বিবাহিত নারীদের অধিকাংশই কোন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকেন না। তাদের এক বা একাধিক সন্তান থাকে। এমন অবস্থায় স্বামীর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, যৌতুক দাবি বা অন্য কোন কারণে নারীরা বিবাহ বিচ্ছেদের শিকার হলে চরম অসহায় অবস্থায় মধ্যে পড়েন। এই অবস্থায় নারীর যথেষ্ট মানসিক দৃঢ়তা ও কর্মক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক অবস্থানের কারণে ঘুরে দাঁড়ানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র যদি সংবেদনশীল ও ন্যায়ানুগ হতো, তাহলে পরিস্থিতি যাই হোক, নারীর সামলে ওঠাটা কঠিন হতো না।


বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে, দায় কি শুধুই নারীর?
মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদে যা জানা জরুরি
বিবাহবিচ্ছেদে দোষারোপ নয়
