সরকারি চাকরি বর্তমানে এ দেশের সবচেয়ে লোভনীয় বস্তু। প্রায় বছর দশেক ধরেই এ দেশের তরুণ-তরুণীরা সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল। এর জন্য প্রস্তুতিরও শেষ নেই। ঠিক এমন এক কালেই দেশের সরকারি কর্মচারীদের একের পর এক দুর্নীতির বিষয় সামনে আসছে। তার মাত্রা এতটাই যে, সরকারি গাড়ির চালকেরও কোটি কোটি টাকার সম্পদের হদিস মিলছে! এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, সরকারি ড্রাইভারেরই এত, তবে অন্যদের কত?
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আওতাধীন ক্যাডার ও নন-ক্যাডারসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সংস্থাটির দুজন উপপরিচালক ও গাড়ি চালক সৈয়দ আবেদ আলীসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ১৭ জনের মধ্যে ৬ জনই পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এঁদের মধ্যে সৈয়দ আবেদ আলী পিএসসির গাড়িচালক ছিলেন। তাঁর বাড়ি মাদারীপুরে। সেখানকার স্থানীয়রা বলছেন, দরিদ্র পিতা-মাতার সন্তান আবেদ অভাবের কারণে মাত্র ৮ বছর বয়সেই ঢাকায় যান। বিভিন্ন সময় কুলির কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। একসময় গাড়ি চালানো শিখে চাকরি নেন পিএসসিতে। অভিযোগ আছে, গাড়ির চালকের চাকরির পাশাপাশি আবেদ আলী জড়িয়ে পড়েন পিএসসির প্রশ্নফাঁস চক্রের সাথে এবং এভাবেই বানিয়েছেন বিপুল সম্পদ।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আবেদ আলীর সম্পদের রোয়াব অনেক। এরই মধ্যে তার অনেক নিদর্শন দেখাও গেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে যে, দামি বাড়ি-গাড়িতে বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন আবেদ আলী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। আবেদ আলীর কোটি কোটি টাকার বহুতল বাড়ি, ফ্ল্যাট, গাড়ি–অনেক কিছুর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে আলোচনাও চলছে বেশ। একে কিন্তু বাঙালির পরশ্রীকাতরতার পরিচয় হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ নেই। আগে দেখা দরকার, আবেদ আলীর বেতন আসলে কত ছিল! আর সেই বেতনের কত শতাংশ জমালে বা পুরোটা জমালেও কি এত ধন-সম্পদ করা সম্ভব?
সরকারি চাকরির বেতনকাঠামো বিশ্লেষণ করলে এতটুকু স্পষ্ট যে, আবেদ আলীর পক্ষে ৩০ বছর সরকারি চাকরি করলেও শুধু বেতন দিয়ে এত ধন-সম্পদ অর্জনের কোনো সুযোগ নেই। একেবারেই নেই। তাঁর যে উত্তরাধিকার সূত্রে ধন-সম্পদ লাভ হয়নি, সেটিও স্পষ্ট। তাহলে, সরকারি গাড়িচালক আবেদ আলীর এত সম্পদ এল কোত্থেকে? অবশ্যই আবেদ পরিশ্রম করেই এই সম্পদ উপার্জন করেছেন। তবে সৎ পথে হয়নি বলেই অভিযোগ পুলিশের। আর সেই অসৎ পথটি হলো, প্রশ্নফাঁস।
পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের ইতিহাস এ বঙ্গে অনেক পুরোনো। এখনও মনে আছে, আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে এ দেশের এসএসসি বা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষাতেও নকলের মহোৎসব হতো। এরপর সরকার আন্তরিক হওয়ার সাথে সাথে সেই নকল কমে এসেছে অনেক। তাও যে হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। পরিমাণে অল্প হলেও হচ্ছে। আর এ দেশে আমরা মেডিকেল-বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া থেকে শুরু করে বিসিএসের প্রশ্নপত্রও ফাঁস হতে দেখেছি। এর জন্য বিসিএসের পরীক্ষা বাতিলও হয়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, এই ফাঁস হওয়া থেকে কারও কারও জীবনে সৌভাগ্য বয়ে এনেছে। সেটা যেমন অযাচিত প্রতিষ্ঠানে পড়ার বা চাকরির সুযোগ পেয়ে, তেমনি ধন-সম্পদ অর্জনেও।
শিক্ষা বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এভাবে প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে আসলে আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থার প্রাথমিক ভিত্তিতেই বৈষম্যের সৃষ্টি করা হচ্ছে। সুযোগ পাওয়ার নয়, তারপরেও পেলে তা অসাম্য তৈরি করে বৈকি। এবং একবার পুলসিরাত পার হয়ে গেলে, সেই অসাম্য কিন্তু দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়ে। অসততার মাধ্যমে পরীক্ষার পুলসিরাত পার করে আর ন্যায়অন্যায়ের মাত্রাজ্ঞান কারও থাকার কথা নয়। যদিও এভাবে অন্যের সুযোগ ছিনিয়ে নেওয়া ছিনতাইকারীরাই কেবল এই দেশে দুর্নীতি করেন, বিষয়টি তা নয়। অন্যরাও করেন, স্বভাব হয়তো নষ্ট হয় পরে। কিন্তু যারা প্রক্রিয়ার শুরুতেই ছিনতাইকারী বনে যান, তারা যে সহজে শুদ্ধ হন না, সেটি নিশ্চিত। কারণ প্রবাদই আছে–‘কয়লা যায় না ধুলে, স্বভাব যায় না মলে’।
ভিডিও দেখুন:যাক গে, চলুন আবার সৈয়দ আবেদ আলীর দিকে নজর দেওয়া যাক। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে। একই অভিযোগে আবেদের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের কয়েকজন উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালককেও আটক করা হয়েছে। অনৈতিক সুবিধা বিক্রি করে আবেদ আলীর ঠাঁটবাট দেখেই আমরা আপাতত স্তম্ভিত। চোখ কপালেও উঠে গেছে বলা যায়। এখন তাঁর কয়েক ধাপ ওপরে চাকরি করা উপ বা সহকারী পরিচালকদের সম্পদ তাহলে কত? এই হিসাবটি বের করতে পারলে হয়তো আমরা বুঝতে পারব, এ দেশে বৈষম্যের শিকড় কতটা বিস্তৃত এবং অবৈধ উপায়ে আয় করা আসলে কতটা সহজ!
অবশ্য এ দেশে তো ইস্যুর অভাব হয় না। কখনো টক অব দ্য কান্ট্রি হয় লাখ টাকার ছাগল, কখনো কোটি টাকার গরু, আবার কখনো শত শত কোটির মানুষ। এসব ইস্যু কখনো তরতাজা থাকে, কখনো চুপসে যায়। মানুষ ভুলেও যায় সেসব। আর এই অবসরেই হয়তো জন্ম হয় নতুন কোনো অনিয়মের। কারণ সমস্যার মূলোৎপাটন যে এ দেশে বিরল। তাই সৈয়দ আবেদ আলীর ঘটনাটি কতদিন তাজা থাকে, সেটিই এখন দেখার!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


কুলি থেকে কোটিপতি আবেদ আলী
প্রশ্নফাঁস: পিএসসির দুই উপপরিচালক ও গাড়ি চালক আবেদ আলীসহ গ্রেপ্তার ১৭
