সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দেশজুড়ে সহিংসতার প্রেক্ষাপটে টানা ৫ দিন বন্ধ ছিল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। পাশাপাশি মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ ছিল টানা ১০ দিন। সারা দেশ এতটা লম্বা সময় ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং, ব্যাংকিংসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত, যার মধ্যে রয়েছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পও।
গত মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা চালু হবার পর এবং গতকাল (২৮ জুলাই) মোবাইল ইন্টারনেট চালু হলেও এখনও দেশে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক ও টিকটক ব্যবহারের অনুমতি নেই। এই প্রেক্ষাপটে দেশের ১৪ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর অনেকেই এখন ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফেসবুক ও টিকটক প্ল্যাটফর্ম ২টি ব্যবহার করছে।
এখানে উল্লেখ্য, ফেসবুক ব্যবহারকারীর দিক থেকে বিশ্বে প্রথম কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬ কোটি ৩৯ লাখ ৫৫ হাজার ১০০ জন। এ ছাড়া বাংলাদেশে ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের সিংহভাগই এফ-কমার্স উদ্যোক্তা (ফেসবুক-ভিত্তিক উদ্যোক্তা), ফেসবুকে যাদের বিজনেস পেজের সংখ্যা ৫ লাখের বেশি।
স্বাভাবিকভাবেই ফেসবুক ব্যবহার করতে না পেরে অনেকেই বিপাকে পড়েছেন। আর তাই শরণাপন্ন হয়েছেন ভিপিএন প্রযুক্তির। গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশে ভিপিএন প্রযুক্তির চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫০০ থেকে ৫০১৬ শতাংশ পর্যন্ত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভিপিএন ব্যবহার কতটা নিরাপদ? সম্প্রতি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক ভিপিএন ব্যবহারের ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দিয়ে সবাইকে ভিপিএন ব্যবহার না করার আহ্বান জানান।
ভিপিএন কী?
ভিপিএন বা ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক হচ্ছে ইন্টারনেটে একটি ডিভাইস আর নেটওয়ার্কের মধ্যে এনক্রিপ্টেড কানেকশন। এনক্রিপ্টেড কানেকশন-এর অর্থ হচ্ছে এই কানেকশন ব্যবহার করে আপনি সেইফলি সেনসিটিভ ডেটা আদান-প্রদান করতে পারবেন। অন্য কোনো থার্ডপার্টি এটা এক্সেস করতে পারবে না। সহজ করে যদি বলি, ইন্টারনেটে পরিচয় গোপন রেখে অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনা করার একটি মাধ্যম হচ্ছে ভিপিএন।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ভিপিএন সার্ভিস সাধারণত করপোরেট হাউজগুলো বেশি ব্যবহার করে থাকে। বিশেষ করে কোনো প্রতিষ্ঠানের হেড অফিসের সাথে বিভিন্ন ব্রাঞ্চ অফিসের যোগাযোগের ক্ষেত্রে, বা কোনো কর্মী যখন অফিসের বাইরে থেকে অফিসের নেটওয়ার্কের সাথে ডেটা ট্রান্সফার করেন- এসব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভিপিএন অত্যন্ত কার্যকর একটি প্রযুক্তি।
তবে ব্যক্তি পর্যায়েও ভিপিএন ব্যবহারের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। যেমন আপনি কোনো ওয়েবসাইট ভিজিট করার পর সেই ওয়েবসাইট আপনার ডেটা ট্র্যাক করতে পারবে না এবং ব্যক্তিগত ডেটা বেহাত হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায় ভিপিএনের মাধ্যমে।
তবে, একদিকে এটা যেমন সত্যি যে ভিপিএনের মাধ্যমে ডেটা ট্রান্সফার করাসহ অনলাইন কার্যক্রমের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তেমনি এটাও ঠিক যে, ব্যক্তি পর্যায়ে ভিপিএন ব্যবহারের মারাত্মক কিছু ঝুঁকি রয়েছে।
ভিপিএন ব্যবহারের ঝুঁকি:
প্রথমত ভিপিএন টুলটি ইন্সটল করার পর ভিপিএন সেবাদাতা চাইলে আপনার পার্সোনাল কম্পিউটার বা মোবাইল ডিভাইসে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক্সেস করতে পারবে। পাশাপাশি আপনি যখন ভিপিএন ব্যবহার করে ই-মেইল বা ফেইসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামের মতো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করবেন, তখন আপনার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ভিপিএন সেবাদাতার কাছেও চলে যাবে। কারণ এই সংবেদনশীল তথ্যগুলো ভিপিএন সেবাদাতার মাধ্যমেই নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কে পৌঁছায়। এখন আপনার ভিপিএন সেবাদাতা এই সংবেদনশীল তথ্যগুলো নিরাপদ রাখবে কিনা, সেটাই হলো প্রশ্ন।
আপনি ভিপিএন ব্যবহার করছেন যাতে করে আপনার অনলাইন অ্যাক্টিভিটিস সম্পর্কে তৃতীয় পক্ষ (থার্ডপার্টি) কেউ জানতে না পারে। কিন্তু এখন যদি ভিপিএন সেবাদাতাই আপনার ‘সেনসিটিভ ডেটা’ অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, অথবা কোনো থার্ডপার্টি বা হ্যাকারের কাছে আপনার ডেটা বিক্রি করে দেয় বা শেয়ার করে, তাহলে কিন্তু বিষয়টা ‘সর্ষের মধ্যে ভূত থাকার’ মতোই হবে। বিশেষ করে আপনি যদি ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের পিন-এর মতো সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার করে ভিপিএন এর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন করেন তাহলে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীনও আপনি হতে পারেন।
নকল বা ভুয়া ভিপিএন বলে কি কিছু আছে? এর মাধ্যমে কি ফিশিং, স্ক্যামিং এগুলো হতে পারে?
এখানে ভিপিএন পরিষেবা ভুয়া বা নকল কিনা তার থেকেও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ভিপিএন সেবা যিনি বা যারা দিচ্ছেন তারা কতটা সততার সাথে দিচ্ছেন, এই সেবা দেয়ার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য কী?
অবশ্যই তারা মুনাফা অর্জন করতে চাইবেন, তবে মুনাফাটা তারা কীভাবে করছেন সেটাই হলো প্রশ্ন। তারা যদি সাবস্ক্রিপশন ফি-এর বিনিময়ে এই সেবা দিয়ে মুনাফা অর্জন করেন তাহলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় ভিপিএন সেবা দেওয়ার মাধ্যমে গ্রাহকদের সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়া এবং সেগুলো ব্যবহার করে অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করা, তাহলে কিন্তু গ্রাহকরা বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। যারা এই ধরণের অসৎ উদ্দেশ্যে ভিপিএন সেবা দেন তাদেরকেই নকল বা ভুয়া ভিপিএন বলা হয়ে থাকে এবং তারাই এই তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্ন স্ক্যাম করে থাকে।
ব্যক্তি পর্যায়ে যারা ভিপিএন ব্যবহার করেন তাদের বেশিরভাগই কিন্তু ফ্রি ভিপিএন সেবা ব্যবহার করেন। এখন ফ্রি-ভিপিএন সেবা যারা দিচ্ছে তারা ব্যহারকারীর নিরাপত্তা বিধানে কতটা যত্নশীল এটা নিয়ে সংশয়তো থেকেই যায়। আবার কোনো কারনে যদি ভিপিএন-এ ব্যবহৃত সার্ভার ঠিকভাবে মেইনটেইন করা না হয় তাহলে কিন্তু সেটা হ্যাক হবারও সম্ভাবনা থেকে যায়। এখন তার মানে এটাও নয় যে, পেইড ভিপিএন সার্ভিস হলেই ব্যবহারকারীর তথ্য বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আসলে পুরো বিষয়টিই নির্ভর করে ভিপিএন সেবাদান প্রতিষ্ঠানের সততার ও সদিচ্ছার ওপর।
বিস্তারিত জানতে ভিডিও দেখুন:
ভিপিএন ব্যবহার করলে স্বাভাবিকের চেয়ে ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়ার আশংকা থাকে কি?
না, ভিপিএন ব্যবহার করলে ইন্টারনেটের গতি কমে যায়, বিষয়টা আসলে তেমন না। ইন্টারনেটের গতি একই থাকে। তবে ভিপিএনের মাধ্যমে ডেটা ট্রান্সফার বা ব্রাউজিংয়ের গতি স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়। এর কারণ দুটি। প্রথমত, ভিপিএন প্রযুক্তিতে এমন সার্ভার ব্যবহার করা হয় যেটা তৃতীয় পক্ষ কেউ সহজে অ্যাক্সেস করতে না পারে। অর্থাৎ ভিপিএনের সার্ভারগুলো অনেকটাই দুর্গম বা ইনঅ্যাক্সেসিবল হয়ে থাকে।
দ্বিতীয়ত. ভিপিএন দিয়ে ডেটা পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রথমে সেটা ‘এনক্রিপ্ট’ করা হয়, তারপর নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠানো হয়। ফলে ভিপিএন প্রযুক্তিতে সাধারণ ব্রাউজিং ও ডেটা ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে গতি অনেকটাই কমে যায়। তবে তার মানে কিন্তু এই নয় যে ভিপিএন ব্যবহারের কারনে আমরা ইন্টারনেটের গতি কম পাচ্ছি।



