কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্রমশ প্রকাশমান উৎকর্ষতার প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি বিশ্বে বিগত দু’বছরে বড় ধরণের বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে এআই চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির আগমনের মধ্য দিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে জেনারেটিভ এআই টুলের উত্থান ঘটে। এআই চ্যাটবটের জনপ্রিয়তায় প্রাথমিকভাবে অনেকেই প্রচলিত সার্চ ইঞ্জিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তবে দিন যত গড়িয়েছে বিষয়টি মোড় নিয়েছে অন্য দিকে। এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এআই সার্চ ইঞ্জিন।
গুগল, মাইক্রোসফটের দেখানো পথে এবার সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটাও হাঁটতে চলেছে এআই সার্চ ইঞ্জিনের বাজারে। প্রযুক্তি জগতের শিল্প-সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দ্য ইনফরমেশন এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটা এবার নিজস্ব এআই সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করতে যাচ্ছে। মূলত গুগল, মাইক্রসফটের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যেই মেটা এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মেটার মালিকানাধীন ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রাম প্ল্যাটফর্ম দুটিতে ব্যবহৃত মেটা এআই বট (বা চ্যাটবট) বর্তমানে সার্চের ক্ষেত্রে গুগল ও মাইক্রোসফটের বিং সার্চ ইঞ্জিনের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু চিত্রটা অচিরেই বদলে যেতে পারে। নিজেদের এআই সার্চ ইঞ্জিন তৈরি হয়ে গেলে মেটা এআই বটকে সাপোর্ট দিবে মেটারই তৈরি এআই সার্চ ইঞ্জিন। নতুন এই সার্চ ইঞ্জিনটি মেটা এআই বটের বিভিন্ন ইভেন্টের এআই-জেনারেটেড সার্চ সামারি তৈরি করে দিতে সক্ষম হবে।
দ্য ইনফরমেশনের সূত্রমতে, বিগত প্রায় ৮ মাস ধরে মেটার একটি টিম তাঁদের চ্যাটবটের জন্য তথ্যবহুল একটি ডেটাবেজ তৈরির জন্য কাজ করে আসছে। মেটার ওয়েব ক্রলারকে তাই বিভিন্ন সাইট চষে বেড়াতে দেখা গেছে সাম্প্রতিক সময়ে।
উল্লেখ্য, ওয়েব ক্রলার বা স্পাইডার হচ্ছে এক ধরণের বট যেটা সাধারণত গুগল ও বিং এর মতো সার্চ ইঞ্জিনগুলোতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ওয়েব ক্রলারের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইন্টারনেটজুড়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইটের কনটেন্ট চিহ্নিত বা তালিকাভুক্ত করা (ইনডেক্স করা) যাতে করে উক্ত ওয়েবসাইটের কনটেন্টগুলো সার্চ ইঞ্জিন রেজাল্ট পেজে দেখতে পাওয়া যায়।
মেটা ইতোমধ্যেই লোকেশন ডেটা তৈরির কাজও করেছে যেটা গুগল ম্যাপস এর সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। এদিকে গত মাসে ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, অ্যাপল তাঁদের নিজস্ব এআই সার্চ ইঞ্জিন টুল তৈরি করেছে যেটা গুগল সার্চের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে প্রস্তুত। অন্তত অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরে প্রদর্শিত সার্চ টুলগুলো সেদিকেই ইঙ্গিত করছে বলে দাবী করেছে ব্লুমবার্গ।
এদিকে সম্প্রতি মেটা বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাথে কয়েক বছর মেয়াদী এক চুক্তি সম্পাদনের কথা জানিয়েছে। চুক্তি অনুসারে, মেটার চ্যাটবট এখন থেকে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে রয়টার্সে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অ্যাক্সেস ও ব্যবহার করতে পারবে।
রয়টার্সের সাথে চুক্তির বিষয়টি মেটা আনুষ্ঠানিকভবে ঘোষণা করলেও নিজেদের এআই সার্চ ইঞ্জিন তৈরি প্রসঙ্গে এখনও কিছু জানায়নি মার্ক জাকারবার্গের প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে এআই গবেষণার বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই সম্প্রতি নিশ্চিত করেছে যে, তাঁরা সার্চজিপিটি নামে একটি এআই সার্চ ইঞ্জিন তৈরির কাজ করছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই প্রযুক্তি বিশ্বে আলোচনা হচ্ছিল, কিন্তু আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা এতোদিন আসেনি ওপেনএআই-এর তরফ থেকে। মেটাও হয়তো নিজেদের কৌশলগত সময়ে নিজেদের এআই সার্চ ইঞ্জিন তৈরির বিষয়টি ঘোষণা করবে।
মেটার মতো প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো এআই সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করছে, যাতে সার্চের ক্ষেত্রে গুগল, মাইক্রোসফটের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে না হয়। তাহলে কি এআই খাতের নতুন ট্রেন্ড হতে চলে এআই সার্চ ইঞ্জিন, এই প্রশ্নটি এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। জেনারেটিভ এআই-ভিত্তিক চ্যাটবট আর এআই সার্চ ইঞ্জিনের মিলিত শক্তিই কি তবে এআই বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারের নতুন পথ? উত্তরটা না হয় সময়ের হাতেই ছেড়ে দেওয়া যাক।
তথ্যসূত্র: দ্য ইনফরমেশন, দ্য ভার্জ, রয়টার্স



