বিরল খনিজ আসলে কী, ট্রাম্পের এত আগ্রহ কেন

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৫, ০৫:৩০ পিএম

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনকে এত বছর ধরে সহায়তা দেওয়ার বিনিময়ে এবার দেশটির বিরল খনিজ সম্পদ চাইছে মার্কিন প্রশাসন। এ নিয়ে চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে আমেরিকা ও ইউক্রেনের মধ্যে। তবে বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেই চুক্তি হয়ে উঠছে না। এ নিয়ে বেশ কোণঠাসা অবস্থানে রয়েছে ইউক্রেন।

গত শুক্রবার এই চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠকে নজিরবিহীন বাগ্‌বিতণ্ডায় ভেস্তে যায় সেই উদ্যোগ।

বৈঠকে ট্রাম্প জেলেনস্কিকে তিরস্কার করেন। বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত দুই নেতার মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে পর্যবসিত হয় এবং ট্রাম্প জেলেনস্কিকে বলেন, ‘হয় আপনি চুক্তি করবেন, নয়তো আমরা বাদ পড়ব। আর যদি আমরা বাদ পড়ি, তাহলে আপনারা লড়াই করবেন এবং আমার মনে হয় না এটা ভালো হবে।’

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর পূর্বপরিকল্পিত যৌথ সংবাদ সম্মেলন বাতিল করা হয় এবং জেলেনস্কিকে চলে যেতে বলা হয়। কিছুক্ষণ পরই জেলেনস্কি হোয়াইট হাউস ছেড়ে চলে যান। পরে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, খনিজ সম্পদ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

যদিও পরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি লন্ডনে গিয়ে জানিয়েছেন, তিনি এই চুক্তি করতে রাজি।

একটা যুদ্ধ, সেই যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের তোড়জোড়, একের পর এক বৈঠক, দুই প্রেসিডেন্টের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় কিংবা চুক্তির ব্যাপারে জেলেনস্কির মাথা নত করা–এই সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে এখন বিরল খনিজ।

বিরল খনিজ আসলে কী, কোন কাজে লাগে?
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, বিরল খনিজ আসলে ১৭টি ধাতু। এসব ধাতুকে একসঙ্গে বিরল মৃত্তিকা মৌলও বলা হয়ে থাকে। এসব মৌল ব্যবহার করে ম্যাগনেট (চুম্বক) বানানো হয়। আর সেসব চুম্বক ইলেকট্রিক গাড়ি, মোবাইল, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জামে ব্যবহার করা হয়। এই বিরল খনিজের কোনো বিকল্প আসলে নেই।

যার সঙ্গে ট্রাম্প বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছেন, সেই চীনে সবচেয়ে বেশি বিরল খনিজ উৎপাদন হয়। এ ছাড়া চীনে আরও কিছু খনিজ পাওয়া যায়। বিশ্বের ৬০ শতাংশ বিরল খনিজ উৎপাদন হয় চীনে। নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিতে চাওয়া আসলে এসব খনিজের জন্যই। ডেনমার্কের সায়ত্বশাসিত এই এলাকায় অনেক বিরল খনিজ মজুত রয়েছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ৫০টি খনিজকে ক্রিটিক্যাল খনিজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বিরল খনিজ, নিকেল ও লিথিয়াম। ইউক্রেনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চিহ্নিত ৩৪টি খনিজের মধ্যে ২২টি রয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, বিশ্বের ‘গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের’ ৫ শতাংশ রয়েছে ইউক্রেনে। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ টন গ্রাফাইটের সুনির্দিষ্ট মজুত রয়েছে সেখানে। এই গ্রাফাইট বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ইউরোপের মোট লিথিয়াম ভান্ডারের এক-তৃতীয়াংশই রয়েছে ইউক্রেনে। বর্তমানে ব্যাটারি তৈরির মূল উপাদান লিথিয়াম। এদিকে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের ৭ শতাংশ টাইটানিয়াম উৎপাদন হতো ইউক্রেনে। উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র—সবকিছুতে ব্যবহৃত হয় এই হালকা ধাতু।

আরও কিছু খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে ইউক্রেনে। অস্ত্র, বায়ুবিদ্যুতের টারবাইন, ইলেকট্রনিক ও আধুনিক বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় ১৭টি উপকরণের এ বিরল খনিজ। এ ছাড়া ইউক্রেনে রয়েছে উল্লখযোগ্য পরিমাণে কয়লা। তবে ইউক্রেনে খনিজ সম্পদের ভূগর্ভস্থ কিছু মজুত এরই মধ্যে দখল করে নিয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেনের দাবি, বর্তমানে রাশিয়ার দখলে আছে ইউক্রেনের ৩৫ হাজার কোটি ডলারের খনিজ সম্পদের ভান্ডার।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

এই ১৭টি বিরল খনিজ আসলে খুব কম জায়গায় পাওয়া যায়, এমন নয়। সব খনিজই কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগে না। বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র বানাতে যে চুম্বক দরকার হবে তা বানাতে এসব খনিজ কাজে আসছে না। কেননা এ ধরনের খনিজ থেকে চুম্বক বানানোর উপাদান বের করা বেশ জটিল প্রক্রিয়া। এ কারণে সব জায়গায় পাওয়া এসব খনিজ কাজে লাগানো যায় না।

এসব খনিজে ট্রাম্পের এত আগ্রহ কেন?
কানাডাভিত্তিক ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি পরামর্শদাতা সেকডেভের প্রধান রবার্ট মুগাহ বিবিসিকে বলেন, একুশ শতকের অর্থনীতির ভিত্তি হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ। এসব সম্পদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামরিক শক্তি ও শিল্প অবকাঠামোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূরাজনীতি ও অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ভূমিকা পালন করে এসব খনিজ।

জিওলজিক্যাল ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ বলছে, চীন বিশ্বের বিরল খনিজ ভান্ডারের ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এসব খনিজে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় আমেরিকা। কেননা এরই মধ্যে শুল্কের খড়্গ চীনের ওপর দিয়েছেন ট্রাম্প। এবার চীন থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বিপাকে পড়বে আমেরিকা।

এ কারণে ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের জন্য চুক্তি করতে আগ্রহী তারা। ট্রাম্প এ মাসের শুরুতে বলেছিলেন, ইউক্রেনে মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলার। আর এর বিনিময়ে তিনি ইউক্রেনের খনিজ সম্পদে সমমূল্যের প্রবেশাধিকার চান।

তবে জেলেনস্কি বলেছেন, এখন পর্যন্ত আমেরিকা প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছে। কিয়েভ আরও জোর দিয়ে বলেছে, তারা এ পর্যন্ত যে সহায়তা পেয়েছে তা ঋণ নয়, বরং অনুদান ছিল। তাই ইউক্রেনের কোনো কিছু ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি যেকোনো চুক্তিতে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান বলেও জানা গেছে।

কিন্তু চুক্তির একটা খসড়া এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের হাতে। এই খসড়া বিশ্লেষণ করে সিএনএন বলছে, তাতে কিয়েভের জন্য কোনো আশার বার্তা নেই। নেই কোনো নিশ্চয়তাও। শুধু খনিজ সম্পদের এখতিয়ারই চাইছেন ট্রাম্প। এতে ইউক্রেনের কোনো লাভই হবে না।

সিএনএনের এ–সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে প্রতিবেদক ইভানা কোতাসোভা বলছেন, এ নিয়ে রাশিয়া রয়েছে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর রাশিয়ার প্রতি মার্কিন প্রশাসনের মনোভাব পাল্টে গেছে। সম্প্রতি সৌদি আরবে বৈঠক করেছেন দুই দেশের প্রথম সারির কর্মকর্তারা। তাতে ইউক্রেনের কাউকেই ডাকা হয়নি।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ছবি: রয়টার্স

এরপর ট্রাম্প বলেছেন, তিনি যুদ্ধ বন্ধ করার ব্যাপারে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করছেন। এ ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক চুক্তি করতে চাইছেন তিনি। তাতে বিরল খনিজের কথাও উল্লেখ করেন এই নেতা। আর তাতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সম্মতই। অন্তত তাঁর কথাবার্তাতে এমনই মনে হচ্ছে।

আপাতত মনে হচ্ছে, বন্ধু রাষ্ট্র ও শত্রু শিবিরের ‘রাজনৈতিক খেলার’ বলি হতে যাচ্ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। একদিকে যুদ্ধের রসদ কমে যাচ্ছে, সহায়তার নিশ্চয়তা আর নেই। অন্যদিকে নিজেদের সম্পদও হারানোর পথে ইউক্রেন। সামনে কোনো পথই হয়তো খোলা পাবেন না তিনি। ইউরোপের মিত্ররা এখন পাশে থাকার কথা বললেও তারা কতদিন এই সহায়তামূলক অবস্থান ধরে রাখেন, সেটিই দেখার বিষয়।

তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর শান্তি চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর...
হরমুজ প্রণালীতে ধৈর্য্যহারা যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের সৈন্যরা। তারা সংঘাতে লিপ্ত হওয়ায় আরও চড়ছে উত্তেজনার পারদ। ফুটো হয়ে যাচ্ছে শান্তি চুক্তির আশার বেলুন! হরমুজ প্রণালী ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সময় শুরু...
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কি এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই? কারণ, একের পর এক যেভাবে রাশিয়া, চীন আর ইরান একই লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেছে, তাতে আন্তর্জাতিক মহলে উঠছে বড় প্রশ্ন—আমেরিকার...
প্রায় ছয় দশক পর ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। উৎপাদন কোটা নিয়ে অসন্তোষ, নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার লক্ষ্যকে এই...
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ম্যাচ খেলতে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে জাতীয় দলের দায়িত্বের...
গত বছরের ২৭ মে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। আরও গ্রেপ্তার হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ, শ্যুটার আরাফাত ও শরীফ। ২৪ এর ৫ আগস্টের পর একের পর এক হত্যাকাণ্ডে...
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী...
সংবাদ সম্মেলনে মেজর ফারহান মাহমুদ মোক্তাদা জানান, চক্রটি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম-ছবি ব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা আদায়ের অপচেষ্টা চালাচ্ছিল। গ্রেপ্তারকৃতের কাছ থেকে ১টি মাইক্রোবাস, ৭টি মোবাইল...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর