২৫ সদস্যের সিন্ডিকেটের কাছে এবারও জিম্মি চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়ার ব্যবসা। ইতোমধ্যে নগরীর কয়েকটি স্পটে ফেলে যাওয়া হাজার খানেক চামড়ার স্থান হয়েছে ভাগাড়ে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিবছরই নানা অজুহাতে কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য করে আড়তদারদের সিন্ডিকেট। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে মৌসুমী ব্যবসায়ীদের অনভিজ্ঞতাকেই দায়ী করছে ব্যবসায়ীরা।
২০১৯ ও ২০২০ সালে দাম না পেয়ে নগরীর রাস্তায় কয়েক হাজার চামড়া ফেলে দিয়েছিল মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। মাঝখানের দুই বছর ফেলে না দিলেও অনেকটা জলের দামেই বিক্রি করতে হয়েছে কাঁচা চামড়া। এসময় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা খুব একটা সক্রিয়ও ছিল না। এতে এই ব্যবসার পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় আড়ৎদাররা। তবে এবার সরকার পরিবর্তনের পর কিছুটা আশান্বিত মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ভেবেছিল পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। সংস্কারের আশাও ছিল। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি। ফলে এবারও নগরীর রাস্তায় গড়াগড়ি খেয়েছে কাঁচা চামড়া, পরে যার স্থান হয়েছে সিটি কর্পোরেশেনের ভাগাড়ে।
রোববার দুপুরে নগরীর বহদ্দারহাট, চৌমুহনী, শুলকবহর এলাকা থেকে হাজার খানেক চামড়া ভাগাড়ে নিয়ে যায় পরিছন্নকর্মীরা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিছন্ন বিভাগের সুপারভাইজার আবদুল করিম বলেন, ‘রাস্তায় পড়ে থাকা এসব চামড়া দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা মানুষের চলাচলে ব্যঘাত করছে। এজন্য আমরা এসব সরিয়ে নিচ্ছি।’
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নগরীর আতুড়ার ডিপো কেন্দ্রিক আড়ৎদারদের সিন্ডিকেটই তাদের সংকটের জন্য দায়ী। নিজেদের লাভের অঙ্ক বাড়াতে প্রতিবছরই ফাঁদে ফেলে ছোট ব্যবসায়ীদের।
হাটহাজারীর বিভিন্ন গ্রাম থেকে আড়াই শ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে আতুড়ার ডিপোতে বিক্রি করতে এনেছেন রফিক উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘প্রতি পিস চামড়া ৪০০-৬০০ টাকা দিয়ে কিনেছি। এখন আড়াই শ টাকা দিতে চায় আড়ৎদার। গত বছরও লোকসান দিয়েছি, এবারও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।’
একইরকম কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে আড়তে বিক্রি করতে এসেছেন ফটিকছড়ির আবদুল করিম। তিনি বলেন, ‘এখানে আড়ৎদাররা কয়েকজন মিলে সিন্ডিকেট। ওরা যে দামে চায়, সেই দামেই আমাদের বিক্রি করতে হচ্ছে। আমাদের কোনো উপায় নেই।’
তবে এই অভিযোগ মানতে নারাজ আড়ৎদাররা। তাদের দাবি, লবণের দাম, শ্রমিক মজুরি আর সংরক্ষণাগারের বাড়তি ভাড়ার অঙ্ক যোগ করতে হয় চামড়ার সাথে। ট্যানারি মালিকদের কাছে বাকি বিক্রির কারণে থাকে মূলধন সংকটও। কাঁচা চামড়ার আড়ৎ এমএ হোসেন লেদারের সত্ত্বাধিকারী মো. আবুল হোসেন বলেন, ‘এছাড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার পরিমাপ বুঝতে পারে না বলেই লোকসানে পড়ে। কারণ সরকার ঘোষিত প্রতি ফুট চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর।’
এদিকে, গত তিন বছর ধরে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে গাউসিয়া কমিটি চট্টগ্রাম। সংগঠনটি প্রতি মৌসুমে এক লাখ করে চামড়া স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করে। এবার পরিস্থিতি আরেকটু ভালো হবার আশাও করেছিল তারা। গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মোসাহেব উদ্দিন বখতেয়ার বলেন, ‘সিন্ডিকেট ভাঙতেই এই উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। আমরা ভালো সাড়াও পেয়েছি। কিন্তু চট্টগ্রামের সব চামড়া তো আমরা সংগ্রহ করতে পারছি না। এজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। চামড়াজাত শিল্প প্রসারে উদ্যোগ নিতে হবে। চট্টগ্রামে যেসব ট্যানারি বন্ধ হয়ে গেছে, সেসব চালু করতে হবে।’
এবার চট্টগ্রামে ৩ লাখ চামড়া সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে আড়ৎদাররা। এর মধ্যে ৮০ ভাগ চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।



