ঘড়িপ্রেমীদের কাছে ‘প্যাটেক ফিলিপ’ মানেই আভিজাত্য। রাজপরিবার থেকে শুরু করে সংগ্রাহকদের সংগ্রহে থাকা এই সুইস ঘড়ির নাম শুনলেই চোখ চকচক করে ওঠে অনেকের। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার সুযোগ নিচ্ছে নকলকারীরাও। আসল ঘড়ির হুবহু অনুকরণ করে বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে নকল ঘড়ি। দামেও অনেক কম, তাই এই ফাঁদে ঠকে যাচ্ছে অনেকেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল ঘড়ি ধরার কিছু নির্দিষ্ট কৌশল আছে। প্যাটেক ফিলিপের মতো ব্র্যান্ডের ঘড়ি কেনার সময় কিছু সূক্ষ্ম বিষয় খেয়াল রাখলেই প্রতারণা এড়ানো যায়। নিচে তুলে ধরা হলো এমন ৭টি চিহ্ন, যা দেখে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার হাতে থাকা প্যাটেক ফিলিপ ঘড়িটি আসল, না কি নিছকই একটি ভালো কপি।

ডায়াল, ভুল বানানেই ধরা পড়ে অনেক কিছু
প্যাটেক ফিলিপের ঘড়ির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো নিখুঁত ডায়াল। লেখা হবে ঝকঝকে, অক্ষরের দূরত্ব সমান, আর টাইপোগ্রাফি থাকবে পরিচ্ছন্ন। একটু বড় করে দেখলে যদি অক্ষর ঝাপসা লাগে, ডেটের পাশে ফাঁকা জায়গা অস্বাভাবিক মনে হয়। অনেক সময় বানানে ভুল থাকে। যেমন ‘ফিলিপ’ বানানে একটি ‘এল’ কম বা একটি ‘পি’ বেশি থাকতে পারে। তাহলে বুঝতে পারবেন এটা নকল ঘড়ি।
ওজন ও ঘড়ির গঠন, ভারসাম্য আছে তো?
আসল প্যাটেক ঘড়ির ওজন থাকবে ভারসাম্যপূর্ণ। এটা শুধু ভারি নয়, একধরনের নিখুঁত ভারসাম্য থাকে হাতে ধরলেই টের পাওয়া যায়। ঘড়ির কেসে হাত বুলিয়ে দেখুন। মসৃণ না হয়ে রুক্ষ লাগলে বুঝে নিন, সেটি তাড়াহুড়োয় বানানো নকল।
আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখুন, এনগ্রেভিং। আসল ঘড়িতে কেসের ভেতরে খোদাই থাকে। বাইরে যদি সিরিয়াল নাম্বার বা বড় হরফে লেখা থাকে, তাহলে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
মুভমেন্ট, ভেতরের সৌন্দর্যে আছে আসল পরিচয়
সব প্যাটেক ফিলিপ ঘড়ির পিছনে কাচের কভার থাকে না। কিন্তু যেগুলোর থাকে, সেগুলোর ভিতরটা যেন একেকটি মাইক্রোস্কোপিক শিল্পকর্ম। হাতে বানানো গিয়ার, স্ক্রু আর যন্ত্রাংশের নিখুঁত বিন্যাস দেখে বোঝা যায়। এটা এতটাই নিখুঁতভাবে বানানো। নকল ঘড়িগুলোর ভেতরটা সাধারণত একঘেয়ে ও যন্ত্রে বানানো অংশে ভরা।
আরেকটা বড় ক্লু, প্যাটেক ফিলিপ ব্লু রঙের স্ক্রু ব্যবহার করে না। তাই কেউ বলছে ‘এটা স্পেশাল এডিশন’, সেটিও হতে পারে প্রতারণার অংশ।

ক্রাউন ও বোতাম, শুধু সৌন্দর্য নয়, কার্যকারিতাও জরুরি
ঘড়ির ক্রাউন বা বোতামগুলো শুধু দেখানোর জন্য নয়। আসল ঘড়িতে এগুলো পুরোপুরি কার্যকর এবং নিখুঁতভাবে বসানো থাকে। যদি ক্রাউন ঢিলা লাগে বা বোতাম টিপলে কোনো কাজ না হয়, তাহলে ঘড়িটা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
আরেকটি বিষয় মনে রাখবেন, প্যাটেক ফিলিপ সাধারণত ঘড়ির সামনের দিকে ট্যুরবিলন বা ব্যাল্যান্স হুইল দেখায় না। যদি সেটি দেখা যায়, বিশেষত ক্যারাট্রাভা মডেলে, তবে সেটা অবশ্যই সন্দেহজনক।
স্ট্র্যাপ ও ব্রেসলেট, স্টাইলেই ধরা পড়ে স্ট্যান্ডার্ড
প্যাটেক ফিলিপ ঘড়ির চামড়ার স্ট্র্যাপ হয় নরম, বিলাসবহুল ও সূক্ষ্মভাবে তৈরি। প্লাস্টিকের মতো চটচটে অনুভূতি থাকলে সেটি নকল। স্ট্র্যাপের ভেতরে প্যাটেক ফিলিপের লোগো ও ‘কালাত্রাভা ক্রস’ চিহ্ন থাকা উচিত। না থাকলে, সন্দেহ করতে পারেন।
ধাতুর ব্রেসলেট হলে সেটি গহনার মতো ভারি, জোড়াগুলো নিখুঁতভাবে বসানো। ক্ল্যাপে যদি কোনো খামতি থাকে, খোদাই যদি অসমান হয়, তাহলে সেটি আসল নয় বলেই ধরে নেওয়া যায়।
হিরে ও খোদাই, ছোট ছোট ক্লুতে ধরা পড়ে বড় ভুল
প্যাটেক ফিলিপ ঘড়িতে যদি হিরে বসানো থাকে, তবে তা হবে সমান আকারের, স্পষ্ট ও সঠিকভাবে বসানো। মাঝখানে ছোট হিরে, বিশেষ করে কিছু প্লাটিনাম ঘড়িতে ৬টার ঘরে ছোট হিরে থাকে। যা নকল ঘড়িতে নেই বা খুবই নিম্নমানের।
আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পিপিসিও হলমার্ক, যা মূলত মূল্যবান ধাতুতে তৈরি ঘড়িতে বাধ্যতামূলকভাবে থাকে। না থাকলে, আসল ঘড়ি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
কাগজপত্র, সার্টিফিকেট ও বিক্রেতা
প্যাটেক ফিলিপ ঘড়ির সঙ্গে থাকে একটি বিশেষ সার্টিফিকেট। এতে মুভমেন্ট নম্বর, বিক্রির তারিখসহ সব তথ্য থাকে। এই সার্টিফিকেট নকল করাও সম্ভব। তাই যদি ঘড়ির সঙ্গে থাকা কাগজ নিয়ে সন্দেহ হয়, কোনো বিশ্বস্ত বিক্রেতা বা বিশেষজ্ঞকে দেখান।
যদি সার্টিফিকেট হারিয়ে যায়, তবে ১০ বছরের পুরনো ঘড়ির জন্য ‘একস্ট্র্যাক্ট ফ্রম দ্য আর্কাইভস’ চাওয়া যায় প্যাটেকের কাছ থেকে। তার জন্য ফি দিতে হয় ৫০০ সুইস ফ্রাঁ। এটি মূল সার্টিফিকেট নয়, তবে নকল চেনার ক্ষেত্রে অনেক কাজে আসে।
ঘড়ি নয়, বিক্রেতা দেখুন
বিশেষজ্ঞরাও নকল ঘড়ির ফাঁদে পড়েন। তাই ঘড়ি কিনতে গেলে নামীদামি, বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকেই কিনুন। একটি প্যাটেক ফিলিপ ঘড়ি শুধু বিলাসবহুল পণ্য নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার মতো ঐতিহ্যের প্রতীক। ভুল করে নকল কিনে ফেললে শুধু অর্থের ক্ষতি নয়, হারাতে পারেন ঘড়ির আসল সৌন্দর্য।
২০১৯ সালে এক বিশেষ মডেল ‘প্যাটেক ফিলিপ গ্র্যান্ডমাস্টার চাইম রেফারেন্স ৬৩০-এ-০১০’ নিলামে বিক্রি হয়েছিল ৩১ মিলিয়ন ডলারে! এটিই এখনও বিশ্বের সবচেয়ে দামি ঘড়ি। আর হ্যাঁ, এটিকে নকল করবার চেষ্টা অনেকেই করেছে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে সবাই।


রোলেক্সকে টপকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ঘড়ি ‘প্যাটেক ফিলিপ’
লাবুবু না লাফুফু? ভাইরাল পুতুলটি আসল নাকি নকল বুঝবেন যেভাবে
